মানহীনতায় টেলিভিশন নাটক

বিনোদনের প্রারম্ভিকে প্রথমে এলো রেডিও। তারপর এলো টেলিভিশন। যুক্ত হলো বিনোদনের নানা আয়োজন। কয়েক দশকের পালাবদলে টেলিভিশনের জন্যই নির্মিত হতে লাগল নাটক।

বাংলাদেশে একসময় নাটক মানেই ছিল বিটিভির অন্ধকার সেটে শুটিং, যেখানে দিন-রাতকে আলাদা করার উপায় ছিল না, একই সেটে হতো অনেক নাটকের দৃশ্যায়ন। তবু মানুষ প্রিয় নাটকের জন্য আগ্রহ নিয়ে বসে থাকত।

সেই নাটকগুলোর গল্প দর্শকদের মন ছুঁয়ে যেত। দর্শক নাটকের মাঝে খুঁজে পেতেন নিজের জীবনের কাহিনি। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ভারতের দর্শক বাংলাদেশের নাটক দেখার জন্য অ্যান্টেনা তাক করে থাকতেন।

পড়ার চাপ থাকলে শিক্ষার্থীরা তাড়াতাড়ি পড়া শেষ করে বসে যেত টেলিভিশনের সামনে। কখনো কখনো বাবা-মায়ের বকা খেয়েও তারা মজেছে নাটকের প্রেমে।

সেই সময় টেলিভিশন চ্যানেল ছিল কেবল একটি। আজ যুগের সঙ্গে চলে টেলিভিশনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০-এর কোঠা পেরিয়ে। এত টিভি চ্যানেলে রোজ প্রচারিত হচ্ছে নাটক। এত টিভি চ্যানেল, এত এত নাটক কিন্তু সেই অতীতের সোনালি-রুপালি প্রেম আজ আর নেই। কেন নেই?

আজকের সময়ে নির্মিত নাটকগুলো নিয়ে দর্শক হতাশ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অযৌক্তিক গল্প, অভিনয় শিল্পীদের অদক্ষ অভিনয়, মানহীন নাম দিয়ে নাটক নির্মাণসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত বর্তমান নাটকগুলো। হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘আজ রবিবার’ নাটক কিংবা হুমায়ুন ফরিদী, আসাদুজ্জামান নূর, সুবর্ণা মুস্তফাদের মতো অভিনেতাদের অভিনয় দেখা দর্শক থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মের এক-তৃতীয়াংশ দর্শকের কাছে এই সময়ের নাটকগুলো পেয়েছে মানহীনতার তকমা। ‘রহিম বাদশার ডিজে বউ’, ‘চ্যাতা কাশেম’, ‘ছ্যাকা খেয়ে বেঁকা’, ‘প্লেবয়’, ‘চেলর ট্রিপ’, ‘দুদু মিয়া’, ‘সেন্ড মি নুডস’, ‘বেড সিন’, ‘সেই রকম বাকিখোর’, ‘চুটকি ভান্ডার’, ‘সেলিব্রেটি কাউ’, ‘ফালতু’, ‘ক্রেজি লাভার’, ড্যাশিং গার্লফ্রেন্ড’, ‘বংশগত পাগল’, ‘ছ্যাঁচড়া জামাই’, ‘প্রোটেকশন’সহ নানা অশ্লীল নামে ভরপুর হয়ে আছে টেলিভিশন নাটক।

নাটকের নাম বিড়ম্বনা ও মানহীন নাটক নির্মাণের বিষয় সালাহ উদ্দিন লাভলু জানান, ‘বর্তমান সময়ে যারা নাটক লিখছে, প্রযোজনা করছে এবং নির্মাণ করছে তাদের বেশির ভাগেরই আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নেই। যার ফলে তারা যাচ্ছেতাই নাম দিয়ে নাটক নির্মাণ করে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে। বাজে, মানহীন কন্টেন্টে নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রেও একই বিষয়। নাটক নির্মাণ করতে এসেছেন কিন্তু দর্শকের প্রতি, শিল্পের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তাহলে মানহীন গল্পে নাটক নির্মাণ কেন হবে না?’

মানহীন নাম, গল্প ছাড়াও যুক্ত হয়েছে বিজ্ঞাপনী এজেন্সিগুলোর নাটক নির্মাণে হস্তক্ষেপ। লেখক কী ধরনের গল্প লিখবে, সে গল্পে কোন অভিনেতা-অভিনেত্রী অভিনয় করবে, নাটকের শুরু আর শেষ হবে কীভাবে সবকিছুই ঠিক করে দিচ্ছে এই বিজ্ঞাপনী এজেন্সিগুলো।

যার ফলে যেসব তরুণ মেধাবী নাট্য নির্মাতা রয়েছেন, যারা ভালো মানের নাটক নির্মাণ করতে চান কিন্তু বাজারে টিকে থাকার জন্য বাধ্য হচ্ছে মানহীন কন্টেন্ট নিয়ে নাটক নির্মাণে। এছাড়া টিভি চ্যানেলগুলো বিজ্ঞাপন এজেন্সির কাছে জিম্মি হয়ে দায়সারাভাবে নির্মাণ করছে নাটক।

এ বিষয়টি নিয়ে নির্মাতা ও ডিরেক্টর গিল্ডস সভাপতি বলেন, ‘টিভি চ্যানেলগুলোর বিজ্ঞাপন কমে যাওয়ার জন্য তারা বিজ্ঞাপনী এজেন্সিগুলোর কাছে জিম্মি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সাধারণ ব্যবসা আর শিল্প-সংস্কৃতিকে গুলিয়ে ফেললে তো হবে না!

চ্যানেলগুলো বিজ্ঞাপন পেতে নিজেদের সঙ্গে সঙ্গে শিল্প-সংস্কৃতিকে বিক্রি করে ফেলছে। যার ভুক্তভোগী হচ্ছি আমরা, সাধারণ দর্শকরা। ব্যবসায়ীরা ঠিকই তাদের স্বার্থ হাসিল করে যাচ্ছেন।’

ডিজিটাল যুগে ইউটিউব বিনোদনের একটি অন্যতম মাধ্যম। সে মাধ্যমকে আমাদের নাট্য নির্মাতারা কাজেও লাগাচ্ছে। প্রতিনিয়ত ইউটিউবে প্রচার হচ্ছে তাদের নির্মিত নাটকগুলো।

Print Friendly, PDF & Email