হ্যাঁ, আমরাও পারি

আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া :

তখন ঘড়ির কাঁটায় ঠিক ৮টা। টানটান উত্তেজনা। চোখের পলকে অনুভব করলাম বুকের ছাতি ৩২ থেকে ৪২ ইঞ্চিতে উঠে গেছে। আর শরীরের উচ্চতা! মনে হলো প্রায় ১০ ফুট। অনুভূতিটা শুধু আমারই ছিল না। ছিল গোটা বাঙালি জাতির। সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে ঘটে গেল বাঙালি জাতির অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের টাইগাররা প্রতিষ্ঠিত করল এক নতুন ইতিহাস। শুধু শক্তিশালী ভারতকে পরাজিত করেই নয়, দুটি বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টি করে চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি ছিনিয়ে আনল বাংলাদেশের যুবারা। খেলায় উত্তেজনা উপর্যুপরি ওঠানামা করছিল পারদের মতো। ভারতকে ১৭৭ রানে গুটিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। পরে বাংলাদেশ যখন ব্যাট হাতে মাঠে নামল, তখন সে কী তাণ্ডব! প্রথম ৫০ রান এলো কোনো উইকেট ছাড়াই। রানরেট ৬-এর উপরে। হঠাৎ করেই নাটকীয় বিপর্যয়। ৭০-এর কোঠায় যেতে না যেতেই পাঁচ পাঁচটি উইকেটের পতন। আবার ঘুরে দাঁড়ানো। ৪৩তম ওভারে ১ রান হাঁকলেন রকিবুল। সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়ল গোটা স্টেডিয়াম। সেই বিজয় উল্লাসের তরঙ্গ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল ৫৪ হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশে। একই সঙ্গে বিশ্বের যে প্রান্তে

বাংলাদেশিরা অবস্থান করছিল, সবাই প্রাণের জোয়ারে ভাসল অবলীলায়। গোটা ক্রিকেটপ্রেমী বিশ্ব বাঘের হুংকারে প্রকম্পিত হলো- প্রশংসায়, আবেগে আপ্লুত করল বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের। বিশ্বকাপ জয়ের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমার অনুভূতির রাজ্যে ভিড় জমালো আমার স্কুল-কলেজের সেই রঙিন দিনগুলো। খেলার কথা উঠলেই আমরা মনমরা হয়ে যেতাম। বড় একটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ খেলা হলেই আমাদের মুখ শুকিয়ে যেত। কারণ একজন বাঙালিও পাকিস্তান ক্রিকেট টিমে স্থান পেত না। আমরা নাকি চাষাঘুষার দল। আমরা কী ক্রিকেট খেলব? পশ্চিম পাকিস্তানিরা কুলীনের জাত। পাকিস্তান টিম তাদের জন্যই। এমনকি ফুটবলেও একই চেহারা। আমি তখন বিএম কলেজের ছাত্র। শুনলাম ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে আরসিডি ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ। আরসিডি ছিল পাকিস্তান, তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে ‘রিজিওনাল কো-অপারেশন ফর ডেভেলপমেন্ট’ নামের আঞ্চলিক সহযোগী সংস্থা। আমরা বিএম কলেজ থেকে দল বেঁধে বিশাল বাহিনী (টাকাপয়সা ধারদেনা করে) নিয়ে ঢাকায় এলাম। পল্টন ময়দানে খেলা হচ্ছিল। তুরস্ক তখন পাকিস্তানের সঙ্গে ১১-০ গোলে এগিয়ে। আমরা আল্লাহ রসুলের নাম নিতে শুরু করলাম। আমরা জানতাম ১১-এর বেশি গোল খেলে সেই দলের খেলোয়াড়দের জার্সি খুলে নেওয়া হয় মাঠের মধ্যেই। পাকিস্তানের খেলোয়াড়রা ডানদিকে বল মারলে বামদিকে দৌড়ায়। আবার গ্রাউন্ডের শট মারলে আকাশের দিকে ছুটে যায়। এই যখন দুরবস্থা, তখন আমাদের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঘা বাঘা খেলোয়াড় নীরবে সাইডলাইনে বসে সেই তামাশা দেখছিল। একই সঙ্গে তাদের হূদয়ে রক্তক্ষরণ চলছিল। কেবল বাঙালি বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হয়ে তারা পাকিস্তানের টিমে স্থান পায়নি।

পরে আমরা যখন স্বাধীন বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল নাগরিক হিসেবে নিজেদের ক্রিকেট টিম, নিজেদের ফুটবল টিম, নিজেদের হকি টিম প্রভৃতি গঠনের সুযোগ পেলাম। পাকিস্তানসহ গোটা বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে দেখল ‘বাঙালি মাথা নোয়াবার নয়’।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে মহান বিজয় অর্জনের পর একজন মুক্তিযোদ্ধা  হিসেবে আনন্দে, উল্লাসে, গর্বে, উত্তেজনায়, অহংকারে একাকার হয়ে গিয়েছিলাম। ঠিক অনুরূপ উত্তেজনা-অহংকারে ফেটে পড়েছিলাম সেই দিন যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানকে পরাস্ত করেছিল। আজ আমাদের মেয়েরাও পাকিস্তানসহ পৃথিবীর বহু নামিদামি দেশের ক্রিকেট টিমকে হারিয়ে অবলীলায় মেডেল নিয়ে, পুরস্কার নিয়ে মাথা উঁচু করে দেশের মাটিতে ফিরে আসে।

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারতই মোড়ল। পরিসংখ্যান তা-ই বলে। চারবার তারা এই ট্রফি নিজেদের ঘরে তোলে। বাংলাদেশের এটাই ছিল প্রথম ফাইনাল খেলা। ভারতকে গুঁড়িয়ে দিয়ে চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি ছিনিয়ে আনল যুব টাইগাররা। অবশ্য ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট সৌরভ গাঙ্গুলি আগের দিনই এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, পরিসংখ্যান যা-ই হোক এবার বিজয় হবে বাংলাদেশের।

বাংলাদেশ আজ সুবর্ণরেখায়। আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর হিরণ্ময় অনুষ্ঠান। আমাদের জন্য অপক্ষো করছে মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। জাতি অহংকার নিয়ে পালন করতে যাচ্ছে মুজিববর্ষ। অনূর্ধ্ব-১৯ যুব টাইগাররা এই আনন্দ-উচ্ছল মাহেন্দ্রক্ষণে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে জাতিকে দিল মুজিববর্ষের সেরা উপহার। আর সারা পৃথিবী জানল- হ্যাঁ, বাঙালিরাও পারে। হ্যাঁ, আমরাও পারি।

 লেখক : সাংবাদিক

Print Friendly, PDF & Email