লক্ষ্মীপুরে বড় ভাইয়ের করুণ মিনতি : ছোট ভাই শিকলে বন্দি

নিজস্ব প্রতিবেদক :

লক্ষ্মীপুরে ৩২ বছর ধরে শারিরীক প্রতিবন্ধী হয়ে এক বিছানায় পড়ে করুণ মিনতি করছে বড় ভাই খোরশেদ। আর ৫ বছর মানসিক রোগী হয়ে শিকলে বন্দি রয়েছে ছোট ভাই মোরশেদ।

জানা যায়, জন্ম থেকে খোরশেদ আলম (৩২) শারিরীক ও তাঁর ছোট ভাই মোরশেদ আলম (২১) দীর্ঘ ৭ বছর বয়স থেকে মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ে রয়েছে।

এ দুই প্রতিবন্ধীকে নিয়ে কষ্টকর জীবন-যাপন করছেন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার হতদরিদ্র আজাদ হোসেনের পরিবার।

খোরশেদের জন্মের পর থেকেই পরিবারটি স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে অন্যরা যেখানে আনন্দ করে, তারা তখন ঘরের দরজা বন্ধ করে কান্না করে। তাদের চিকিৎসার জন্য সরকারসহ সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা চেয়েছেন পরিবারটি।

এদিকে প্রায় ৮ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পেয়ে আজাদ রিকশা চালানোর ক্ষমতা হারায়। এখন তিনি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চররুহিতা ইউনিয়নের ইছাগো তেমুহনী বাজারে খুচরা পান বিক্রেতা।

প্রতিদিনের আয়ে জোড়াতালি দিয়ে কোনরকম সংসার চলে তার। কিন্তু অসুস্থ ছেলেদের চিকিৎসার খরচ চালানোর সাধ্য নেই। এরমধ্যে তার দুই মেয়ে স্কুল-কলেজে অধ্যয়নরত।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মানসিক প্রতিবন্ধী মোরশেদের পায়ে তিন ৪-৫ ফুট শিকল দিয়ে ঘরের চৌঁকাঠের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিলে ছেলেটিকে মা খুরশিদা বেগম একটি প্লাস্টিকের পাত্র এনে দেন। আর বড় ছেলে খোরশেদ বিছানায় শুয়ে চিৎকার করছে। জন্মের পর থেকে তিনি একদিনের জন্যও উঠে বসতে পারেনি। কথাবার্তা স্বাভাবিক থাকলেও বিছানায় দিন কাটছে তার। খরচ বহন করার সাধ্য না থাকায় কোন চিকিৎসকের কাছেও নেওয়া হচ্ছে না তাদের।

জানা গেছে, ছেলে-মেয়েদের নিয়ে আজাদ সদর উপজেলার কামানখোলা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতো। পরে স্থানীয়দের সহযোগীতায় উপজেলার চররুহিতা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড চরলামচি গ্রামে চার শতাংশ জমি কেনে। সেখানে একটি টিনশেট ঘরে তারা বসবাস করে।

খোরশেদ ও মোরশেদের মা খুরশিদা বেগম বলেন, বড় ছেলেটি একটিবারের জন্য শোয়া থেকে উঠে বসতে পারেনি। কোলে করে তুলে এনে অনেক কষ্ট করে তাকে গোসল করাতে হয়। ছোট ছেলেটি জন্মের পর ৭ বছর পর্যন্ত ভালো ছিল। হঠাৎ করে প্রায় ১৪ বছর আগে ছেলেটি মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বিভিন্নস্থানে চলে গিয়ে ফিরে আসতে পারে না। এ কারণে অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে গত ৫ বছর তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। মোরশেদ যখন মা ডাকে তখন আনন্দে মনটা ভরে উঠে। কিন্তু আবার যখন অন্য নামে ডাকে তখন কান্না চলে আসে।

জানতে চাইলে তাদের বাবা আজাদ হোসেন বলেন, অসুস্থ ছেলেদের নিয়ে আমাদের অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে আশপাশের মানুষ আনন্দ করে। কিন্তু ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমাদের ঘরে বসে কান্না করতে হয়। ভাইয়েরা আনন্দ করতে পারে না বলেই আমার মেয়ে দুটিও ঈদে কোথাও যায় না। ছেলেদের চিকিৎসার জন্য সরকারসহ সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

জানতে চাইলে চররুহিতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির পাটওয়ারী বলেন, পরিবারটির খোঁজ নেওয়া হবে। তাদেরকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য উদ্যোগ নেয়া হবে।

এ বিষয়ে সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুর রেদোয়ান আরমান শাকিল বলেন, সরকারিভাবে ঐ দুই ভাই প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। তবে তাদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সহ ভবিষ্যতে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

Print Friendly, PDF & Email