জনসচেতনতা ও করোনাভাইরাস

মানবজীবনে সুখ-দুঃখ যেমন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তেমনি সুখ-অসুখও স্বাভাবিক বিক্রিয়া। একসময় রোগ বা অসুখ হবে আবার তা থেকে মুক্তি মিলবে এটা চিরন্তন সত্য। এর মাঝে জটিল-কঠিন রোগে কিছু সংখ্যক মারা যায় এটাও সত্য। তবে কার কখন মৃত্যু আছে সেটা কি কেউ জানি? আর যা জানি না তা আমার মতে না ভাবাই ভালো। কথায় আছে মরণকে জয় করতে পারলেই বেঁচে থাকা যায়। তাই মরণ থাকলে হবে এই ভেবে শক্তি ও সাহস করলে মনে হয় ইতিবাচক কিছুই হবে। তারপরও কিছু কিছু বিষয় কিন্তু সেই চেতনাকে বিলুপ্ত করে দেয়। দেখা দেয় ঘোর সংকট। হারিয়ে যায় সাহস ও বল। তেমনি একটি ভাইরাসের বিষয় হয়তো কাজ করছে অনেকের মধ্যে। তার নাম হলো করোনাভাইরাস।

আসুন জেনে নিই এই ভাইরাসের জীবনবৃত্তান্ত। করোনাভাইরাসের উৎপত্তি চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে। গত ৩১ ডিসেম্বর চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম করোনাভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত চীন, থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ভিয়েতনাম, হংকং, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নেপাল, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং তাইওয়ানে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। চীনে এই ভাইরাসে ৩০৪ জন মারা গেছে। আক্রান্ত হয়েছে ১৪ হাজারের বেশি মানুষ। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতেও এই রোগ শনাক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের কোনো রোগী এখনো শনাক্ত করা যায়নি। তবে বিদেশফেরত এক যাত্রীকে গত ৩০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার করোনা সন্দেহে বিমানবন্দর থেকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া ইসরায়েলেও এক রোগীর শরীরে করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাণকেন্দ্র চীনের মধ্যাঞ্চলের উহান শহর থেকে শত শত বিদেশি নাগরিককে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং নিহতের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের উহান থেকে সরিয়ে নিচ্ছে। তবে বিস্তার ঠেকাতে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ চীনগামী বিমানের ফ্লাইট বাতিল করছে। এর মধ্যে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, ইউনাইটেড এয়ারলাইনস, এয়ার এশিয়া, ক্যাথে প্যাসিফিক, এয়ার ইন্ডিয়া ও ফিনএয়ার ইতোমধ্যে চীনগামী বিমানের সংখ্যা কমিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে।

চীন থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা করা হচ্ছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার একদম প্রাথমিক লক্ষণ কী বা আদৌ তা বোঝা যায় কি-না তা এখনো অজানা। তবে চীনের বিভিন্ন স্থানে রোগীর মৃত্যুর ধরন থেকে কিছু লক্ষণ ধারণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণে বলা হচ্ছে— এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শুরুতে জ্বর ও শুষ্ক কাশি হতে পারে। এর সপ্তাহখানেক পর শ্বাসকষ্টও দেখা দেয়। অনেক সময় নিউমোনিয়াও হতে পারে। তবে নতুন এই করোনাভাইরাস যথেষ্ট বিপজ্জনক। সাধারণ ঠান্ডা-জ্বরের লক্ষণ থেকে এটি মৃত্যুর দুয়ার পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। এ ভাইরাস থেকে নিউমোনিয়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমতাবস্থায় সংকটের এই সময়ে আতঙ্কিত না হয়ে বরং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে নিজেকে ও আশেপাশের মানুষকে সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকতে সাবান ও পানি দিয়ে ঘন ঘন হাত ধুতে বলা হয়েছে ডব্লিউএইচওর নির্দেশনায়। এছাড়া মাংস ও ডিম অবশ্যই যথাযথ তাপে ও ভালোমতো রান্না করে খেতে বলা হয়েছে। হাঁচি ও কাশির সময় অবশ্যই হাত বা টিস্যু দিয়ে মুখ ও নাক ঢেকে রাখতে হবে। এরপর টিস্যু ফেলে দিতে হবে এবং অবশ্যই হাত ধুয়ে নিতে হবে। যে কোনো অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করার পর হাত ধুতে হবে। কোনো প্রাণীর যত্ন নিলে বা স্পর্শ করলে ও প্রাণীবর্জ্য ধরার পরও হাত ধুতে হবে। শরীরে যে কোনো সংক্রমণ এড়াতে রান্না ও খাওয়ার আগে ও পরে হাত ধুয়ে নিতে হবে। নিজের পাশাপাশি অন্যকে সুরক্ষিত রাখতে করণীয় সম্পর্কে কিছু পরামর্শ দিয়েছে ডব্লিউএইচও। ব্যবহার করা টিস্যু খোলা ঝুড়ি বা ডাস্টবিনে না ফেলে ঢাকনা রয়েছে এমন ঝুড়িতে ফেলতে হবে। হাতে গ্লাভস না পরে বা নিজে সুরক্ষিত না থেকে কোনো অসুস্থ ব্যক্তির মুখ ও দেহ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। একইভাবে গবাদিপশু ও বন্যপশুকে ধরার আগেও নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। রান্নাঘরের কাজেও বিশেষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলছে। কাঁচা মাংস, সবজি, রান্না করা খাবার কাটার জন্য ভিন্ন চপিং বোর্ড ও ছুরি ব্যবহার করতে হবে। কাঁচা মাংস, সবজি ও রান্না করা খাবার হাতে ধরার আগে অবশ্যই প্রত্যেকবার হাত ধুয়ে নিতে হবে। রোগে ভুগে মারা যাওয়া বা অসুস্থ প্রাণীর মাংস একেবারেই খাওয়া চলবে না। তবে রোগের প্রাদুর্ভাব রয়েছে এমন এলাকাতেও উপযুক্ত তাপে ও ভালোভাবে সিদ্ধ করা মাংস খেলে ঝুঁকি নেই। কাঁচা বাজারে গিয়ে কোনো প্রাণী ও প্রাণীর মাংস হাতে ধরলে দ্রুত হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। কাঁচা বাজারে অবস্থানের সময় অযথা মুখে-চোখে স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কাজের জায়গাটি দিনে অন্তত একবার হলেও পরিষ্কার বা জীবাণুমুক্ত করতে হবে। পরিধেয়টি অবশ্যই প্রতিদিন বদল করতে হবে এবং ধুতে হবে। সংক্রমণ এড়াতে হাতে গ্লাভস ব্যবহার করা ভালো।

করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আতঙ্কের মধ্যে ভ্রমণ বিষয়েও সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যদি জ্বর-সর্দি অনুভূত হয়, তাহলে যে কোনো ভ্রমণ বাতিল করাই ভালো। পাশাপাশি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ওষুধ খেতে হবে। জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন এমন কারো সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। যদি মাস্ক ব্যবহার করা হয়, তবে নাক ও মুখ ভালোভাবে ঢেকে রাখতে হবে। একবার মাস্ক পরলে তা বার বার স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। একবার মাস্ক ব্যবহারের পর ফেলে দিতে হবে। মাস্ক ধরার পর হাত ধুয়ে নিতে হবে। যদি ভ্রমণের সময় অসুস্থ বোধ হয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। এর আগে রোগের ইতিহাস থাকলে সেটাও চিকিৎসককে জানাতে হবে। যেখানে-সেখানে বা জনসমাগমের স্থানে থুথু ফেলা যাবে না। অসুস্থ প্রাণী ধরা থেকে সতর্ক থাকতে হবে।

যে কোনো রোগ-ব্যাধিতে নিজেদের যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসটাই বড় বলে মনে হয়। মনে রাখতে হবে, মহা অসুখেও যদি সাহস ও মনোবল থাকে তাহলে সেই অসুখটা অর্ধেক নির্মূল হয়ে যায়। আবার মনোবল দুর্বল হলে ওই অসুখ অর্ধেক বেড়ে যাবে। ঠিক একইভাবে কঠিন অসুখে চিকিৎসক যদি ভালো ব্যবহার করে রোগীকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে তাহলেও রোগ তৎক্ষণাৎই অর্ধেক সেরে যায় বলে কথিত রয়েছে। এমনটি আমরাও বাস্তবে লক্ষ করেছি। তাই করোনাভাইরাস শুধু নয়, অন্য যে কোনো ভাইরাস যে কোনো সময়ে আক্রমণ করতেই পারে; কিন্তু ঘাবড়ে গেল চলবে না। করোনাভাইরাসের সতর্কতাগুলো কিন্তু শুধু এই ভাইরাসের কারণেই নয়, মূলত যে কোনো রোগ থেকে বাঁচার জন্যই করা দরকার। আর করোনা ভাইরাসে চিন্তিত হবার কিছু নেই, প্রয়োজন সতর্কতা ও সচেতনতা। এ দুটি ক্ষেত্রে এখন আমাদের সরকারসহ জাতীয় প্রচারমাধ্যম এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার। সুতরাং আমরা সচেতন থাকি আর অন্যদের সতর্ক করি। নিরাপদ জীবন গড়ি।

গোপাল অধিকারী

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

Print Friendly, PDF & Email