লক্ষ্মীপুরে সরকারি হাসপাতালে ঔষধ কোম্পানীর প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্য

রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি :

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে কর্তৃপক্ষের বিধি নিষেধ অগ্রাহ্য করে বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানীর সেলস-রিপ্রেজেনটেটিভদের অনাকাঙ্খিত জটলার কারনে সাধারণ রোগীর চিকিৎসা কার্যক্রম মারাত্মক ভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। তারা হাসপাতালের ভিতরে গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে রুগীদের কাছ থেকে ডাক্তারী ব্যবস্থাপত্র কেড়ে নিয়ে ছবি তুলছে। সরকারি অফিস সময়ের বেশীর ভাগ (সকাল ৯-৫টা) কর্তব্যরত চিকিৎসকদের চেম্বার রিপ্রেজেন্টেটিভদের দখলে থাকায় চিকিৎসা সেবা প্রত্যাশী সাধারণ রুগীদের ঘন্টার পর ঘন্টা বাইরে অপেক্ষার বিড়ম্বনায় প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে ।

রবিবার সকাল ১১টায় সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা হাসপাতালে রোগীর চেয়ে ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের ভীড় অনেক বেশী। হাসপাতালের কড়িডোর, কর্তব্যরত চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে ও গেইটের সামনে কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভদের জটলা। রোগীদের বসার সীট দখল করে বসে থাকে রিপ্রেজেন্টেটিভ গেটে দাড়িয়ে হাসপাতালের একজন কর্মচারী রুগীদের ভীড় সামলাচ্ছেন। ভিড়ে বৃদ্ধ, শিশু ও মহিলা রোগীরা রীতিমতো নাকাল হচ্ছেন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার প্রহর কাটিয়ে কেউ ডাক্তারের চিকিৎসা পত্র নিয়ে বের হলেই ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা ছোঁ-মেরে প্রেসক্রিপশন নিয়ে যান-চলে ফটোসেসন। প্রেসক্রিপশনে কি কি ঔষধ দিয়েছে, তাতে নিজ কোম্পানির প্রোডাক্ট আছে কিনা তার প্রমাণ পেতে রীতিমতো প্রতিনিধিদের কাড়াকাড়ি লেগে যায়। এতে উটকো বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন রুগী ও তাদের স্বজনরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের একজন কর্মচারী জানান, প্রতিদিন সকাল থেকে বহির্বিভাগ খোলা থাকা পর্যন্ত রিপ্রেজেন্টেটিভদের ভিড় লেগে থাকে। ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিয়ে রোগীরা বেরিয়ে এলেই প্রেসক্রিপশন দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন কোম্পানির লোকেরা। প্রতিদিন সকাল ১০টার সময় ডাক্তারের চেম্বারে ভিজিট শুরু করে রিপ্রেজেন্টেটিভরা। এতে করে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা এবং হয়রানীর শিকার হচ্ছে রোগী ও তার স্বজনরা। নিয়মানুযায়ী সকাল সাড়ে ৯ টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত রিপ্রেজেনটেটিভদের হাসপাতালে প্রবেশ নিষেধ থাকলেও তারা নিয়ম অমান্য করে সকাল থেকেই প্রতিদিন হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করে ও হাসপাতালে প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে শুরু করে।
এ ছাড়াও হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে রোগীদের প্রেসক্রিপশন নিয়ে তাদের কোম্পানির ওষুধ লেখা আছে কি না তা দেখতে রোগীদের ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েন তারা।

বহি:বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা কাঞ্চনপুর গ্রামের বাসিন্দা শিউলী আক্তার (৩০) জানান, সকাল ১০টায় হাসপাতালে আসলেও ভীড়ের কারনে ডাক্তারের রুমে ঢুকতে পারিনি। প্রায় ৩০ মিনিট বসে থেকে ডাক্তার দেখানোর পরে কোম্পানীর লোকেরা প্রেসক্রিপশন নিয়ে বিভিন্ন জনে ছবি তোলায় আরও ১০মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে।
চরবংশী গ্রাম থেকে আসা বৃদ্ধ জয়নাল আবদীন সহ কয়েকজন রুগী ও তাদের স্বজনদেরও একই অভিযোগ। রুগীর সাথে আসা কলেজ ছাত্রী মনিরা আক্তার বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, অফিস সময়ে রিপ্রেজেন্টেটিভদের চেম্বার ভিজিটের অনুমতি দেয়ায় সাধারণ রুগীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এটি বন্ধ হওয়া দরকার।

অপসন কোম্পানীর রিপ্রেজেনটেটিভ মেহেদী হাসানসহ কয়েকজন রিপ্রেজেনটেটিভ জানান, আমরা এভাবে রুগী বা রুগীর আত্বীয়-স্বজনদের ভোগান্তী দিতে চাই না। চিকিৎসক আমাদের ওষুধ লিখলো কি না সেটার বাস্তব প্রমান কোম্পানীকে দেখানোর নির্দেশনার কারনে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফটো তুলতে হয়। আর এই ফটো কোম্পানীতে না পাঠালে মাসিক সভায় বসদের গাল-মন্দ খেতে হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জাকির হোসেন জানান, সরকারি সময় সূচী অনুযায়ী ওষুধ কোম্পানীর সেলস রিপ্রেজেনটেটিভদেরকে ডাক্তারের চেম্বার ভিজিটের সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তারপরও কেন তারা রোগীদের সাথে এ আচরন করছেন, তাদেরকে ডেকে সতর্ক করে দেওয়া হবে। তাছাড়া রোগীদেরকেও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) (ভারপ্রাপ্ত ইউএনও) আখতার জাহান সাথী জানান, সকালে কোন ঔষধ কোম্পানির রিপ্রেজেনটেটিভ হাসপাতাল চত্বরে ফটো সেশন বা ডাক্তারের চেম্বারে ভিজিট করতে পারবে না। নিয়মানুযায়ী সপ্তাহে দুদিন বা হাসপাতালের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চিকিৎসকের সাথে ভিজিট করতে হবে। সকালে ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেনটেটিভ হাসপাতাল চত্বরে প্রবেশ করতে পারবে না। কেউ প্রবেশ করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Print Friendly, PDF & Email