পরিত্যক্ত ফিতায় সফলতার স্বপ্ন বুনছেন লক্ষ্মীপুরের নারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক :

প্লাষ্টিকের ফিতা দিয়ে ঝুঁড়ি, ডালা, খাচি ও কুলায় সফলতার বীজ বুনছেন লক্ষ্মীপুরের শারমিন আক্তার। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্য মোড়ানো প্লাস্টিকের ফিতাগুলো তার উপার্জনের অন্যতম বস্তু। অব্যবহার্য ফিতাগুলো ব্যবহার করেই শারমিনের মতো অনেকেই নতুন নতুন জিনিস তৈরি করছেন। এভাবেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষগুলো আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠছে।

জানা গেছে, লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার বামনী ইউনিয়নের সাগরদী গ্রামের আবদুল কাদের মামুনের স্ত্রী শারমিন আক্তার। গত ২০০১ সালে দিনমজুর মামুনকে বিয়ে করেন নোয়াখালির কোম্পানিগঞ্জের এই নারী। বিয়ের পর থেকেই বসবাস করেছেন চট্টগ্রামে। পরে ২০১১ সালে লক্ষ্মীপুরে চলে আসেন স্বামীর অসুস্থতার কারনে। তখন থেকেই সেলাই আর প্লাস্টিকের ফিতা দিয়ে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। যদিও বতর্মানে তিনি সেলাইয়ের কাজ করছেন না।

শারমিন আক্তার জানান, স্বামীর অসুস্থতার কারনে চট্টগ্রাম থেকে লক্ষ্মীপুরে চলে আসেন। তখন অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালাতে হিমসিম খেতে হয়েছে তাকে। তখন পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরাতে শুরু করেন সেলাইয়ের কাজ। তাতেও অভাব মোচন হচ্ছে না এই নারীর। ফলে প্লাস্টিকের ফিতা দিয়ে ঝাপি, হাঁস-মুরগির খাঁচি, মাছ-তরকারি ধোয়ার ঝাঁকা, ঘরের সিলিং, টুকরি, ঢালা, কুলা সহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা শুরু করেন। পণ্যগুলোর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় সেলাইয়ের কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি। নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলেন কারুকাজের অপূর্ব এ শিল্পের সঙ্গে। আর এখন এ শিল্পের প্রতি পুরোপুরি নির্ভরশীল শারমিন।

কাজের শুরুতে ফিতা সংগ্রহ ও তৈরিকৃত পণ্যগুলো বিক্রিতে সমস্যায় পড়েছেন উল্লেখ করে তিনি জানান, স্থানীয় পাইকার ফিতা না দেওয়ায় অধিক মূল্যে মাহমুদা নামে এক নারীর থেকে সংগ্রহ করেন। তিনিও শারমিনের মতো বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে থাকেন। ফিতায় তৈরিকৃত এই পণ্যগুলো বাজারে বিক্রির সময় পুরুষদের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের শিকার হয়েছেন তিনি। তবুও থেমে যাননি সংগ্রামী এই নারী। একসময় পণ্যগুলো বিক্রির জন্য স্বামীর বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা আবু নাইমকে নিয়ে আসেন। তার মাধ্যমে গ্রামে ফেরি করে পণ্যগুলো বিক্রি ও পাইকারদের কাছে সময়মতো পৌঁছিয়েছেন । এতে পূর্বের চেয়ে বিক্রি ও লাভ দুটোই বেশি হয়েছিলো।

পণ্যগুলো তৈরিতে শারমিনকে শাশুড়ী, স্বামী ও সন্তানরা সহযোগিতা করতেন। তবে চাহিদা বেশি থাকলে গ্রামের অন্যান্য মহিলাদের দিয়ে কাজ করাতেন। বর্তমানে শারমিনের বাবা আবু নাইম নেই। স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে নিজেই এগুলো বিক্রি করছেন। আর হস্তশিল্পের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে চান ৬ সন্তানের এই জননী।

এদিকে শুধু শারমিন আক্তার নয়, গ্রামের আরো অনেকে এ কাজ করে সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাচ্ছেন। কথা হয় কাঞ্চন বেগম ও মাহমুদার সঙ্গে। তারা বলেন,‘এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে প্লাস্টিকের ফিতা ক্রয় করে পণ্য তৈরি করে থাকেন। পরে সেগুলো বিভিন্ন দামে বিক্রি করে থাকেন। বিক্রির টাকায় ঋন শোধ করা, সংসার চালানো সব। তবে এনজিওর ঋণের সুদ বেশি। যদি স্বল্প সুদে সরকারিভাবে ঋণ ও প্রশিক্ষণ পাওয়া যেত, তাহলে এই কুটির শিল্পটিকে আরো সম্প্রসারণ করা যেত।’
আজিজ উল্ল্যাহ নামে একজন পাইকার জানান, ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে ফিতা সংগ্রহ করে লক্ষ্মীপুরে খুচরা বিক্রি করছেন। আবার নিজেও পণ্যাদি তৈরি করে পাইকারি বিক্রি করছেন। এখন ৬০ টাকা ধরে প্রতি কেজি ফিতা ক্রয় করে খুচরা বিক্রি করছেন ৯০ টাকায়। এ কাজটি তিনি ১২ বছরেরও অধিক সময় ধরে করছেন। তাছাড়া প্রতি কেজি ফিতায় ২’শ টাকার পণ্য তৈরি করা যায় বলেও জানান তিনি।

বামনী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন মুন্সি বলেন, ‘প্লাস্টিকের ফিতায় তৈরিকৃত পণ্যাদি দীর্ঘদিনেও নষ্ট হয়না। ফলে প্রতিনিয়ত এটির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।’ তবে তিনি মনে করেন, ফিতাগুলো দেশে তৈরি হলে সহজে সংগ্রহ করা যেতো। আর কম পুঁজিতে ঘরে বসেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী-পুরুষরা নিত্য নতুন পণ্যাদি তৈরি করতে পারতেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গার পাশাপাশি দেশের বেকারত্ব দূর হতো।

শারমিনদের এই পণ্য’র সঙ্গে লক্ষ্মীপুর বিসিক শিল্পনগরীর কর্মচারীরা পরিচিত। তবে ত্রিশ বছর চাকুরির জীবনে পণ্যগুলোর সাথে পরিচিত নয় উপ-ব্যবস্থাপক দেলওয়ার হোসেন। এজন্য তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

Print Friendly, PDF & Email