ই-পাসপোর্ট নিয়ে প্রস্তুতি নেই পাসপোর্ট অফিসে

মাত্র একদিন আগে গত ২২ জানুয়ারি (বুধবার) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম। অনেকেরই ধারানা ছিলো, পরের দিন থেকেই সম্ভব হবে এই ই-পাসপোর্টের আবেদন করা। কিন্তু পাসপোর্ট অফিসে দেখা গেলো তেমন কোনও প্রস্তুতিই নেই এখানে।

বৃহস্পতিবার (২৩ জানুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১২টা। রাজধানীর আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে গিয়েই চোখে পড়ে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে দেড় শতাধিক মানুষ। কথা বলে জানা গেলো অনেকেই এসেছেন ই-পাসপোর্ট এর আবেদন করতে। তবে ব্যর্থ হয়ে এখন পুরোনো মেশিন রিড্যাবল পাসপোর্ট (এমআরপি) করতেই লাইনে দাঁড়িয়েছেন। ভেতরে ১০১, ১০২ ও ১০৩ নম্বর কক্ষের কর্মকর্তাদেরও দেখা গেলো এমআরপি ফরম নিয়ে ব্যস্ত।

এ সময় লাইনের কেউ কেউ কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করলে, তারা বলছেন এখনই তাদের কাছে কোনও তথ্য নেই। একজন কর্মকর্তা বললেন, ‘হেল্পডেস্ক থেকে জেনে নেবেন।’

আবার লাইনে দাঁড়ানো অনেকেই বললেন, তারা ই-পাসপোর্ট করার প্রত্যাশা নিয়েই এসেছিলেন, কিন্তু পরিস্থিতি দেখে আর জরুরি প্রয়োজন থাকায় তারা এমআরপির আবেদনই জমা দিচ্ছেন।

লাইনে দাঁড়ানো স্বপ্না রাণী তাদেরই একজন। তিনি বলেন, ই-পাসপোর্টের আবেদনপত্র অনলাইনে খুঁজে পাইনি। ভেবেছিলাম হয়তো পাসপোর্ট অফিস থেকে পাওয়া যাবে। কিন্তু না এখানেও নেই। তাতে হাল ছাড়েন স্বপ্না রাণী।

এদিকে, এমআরপির জন্য ফরম পূরণ করে আইডিবি ভবনের পাশে ঢাকা ব্যাংকের অনলাইন শাখায় টাকা জমা দিতে গেলে ব্যাংক কর্মকর্তা তাকে জানিয়েছেন, ই-পাসপোর্ট সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনাই দেওয়া হয়নি ব্যাংকে। এই প্রতিবেদকও ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাছে একই তথ্য পান।

এছাড়া, খোদ পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তারাও ই-পাসপোর্ট নিয়ে কোনো তথ্য দিতে পারছিলেন না। কেউ কেউ হেল্প ডেস্কে দেখিয়ে দিলে, সেখানে গিয়েও এ সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা মিললো না। কবে নাগাদ ই-পাসপোর্টের আবেদনপত্র নেওয়া হবে এবং কবে নাগাদ ই-পাসপোর্ট করা যাবে তাও কেউ বলতে পারছেন না। ‘হয়তো হবে, তবে আরও সময় লাগবে,’ উত্তর একজন কর্মকর্তার।

ই-পাসপোর্ট করতে আসা সানজানা ইসলাম ইকরা  বলেন, ই-পাসপোর্ট-এর আবেদন করতে এসেছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এই পাসপোর্ট সাধারণের হাতে পৌঁছাতে সময় লাগবে। যে পাসপোর্ট কর্মকর্তার কক্ষে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন, সেই কর্মকর্তার কাছে বিভিন্ন অফিসের উচ্চ পদস্থরাও ফোন করে জানতে চাইছিলেন, ই-পাসপোর্টের কী অবস্থা। তিনি শুনেছেন, জবাবে ওই কর্মকর্তা বলছিলেন, স্যার ই-পাসপোর্ট তো অনেক দেরি হবে। এটার অনেক কাজ বাকী আছে এখনো। অন্তত ছয় মাসের মতো সময় লাগতে পারে।

মনির হোসেন ই-পাসপোর্ট করতে আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে এসেছেন বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায়। ই-পাসপোর্ট করতে না পেরে তিনি অনেক কষ্টে এমআরপি আবেদন জমা দিয়েছেন। মনির হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ই-পাসপোর্টের কথা যাদেরকেই জিজ্ঞাসা করেছি, তারাই আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়েছেন। তার মানে বুঝতে পারলাম, ই-পাসপোর্ট পেতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।

এদিন ই-পাসপোর্ট করতে আসা সামান্তা নাসরিন শিলা বলেন, গত তিন চার বছর থেকে ই-পাসপোর্ট সম্পর্কে এত শুনেছি যে আমার মতো অনেকের এটাতে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। করতে এসে দেখছি, আরও সময় লাগবে। সবকিছু দেখে ও জিজ্ঞাসাবাদ করে মনে হয়েছে, ই-পাসপোর্ট পেতে আরও সময় লাগবে। কারণ এখনো পাসপোর্ট অফিস এজন্য প্রস্তুত হয়নি। আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের সামনের সড়কে সত্যায়ন সীল নিয়ে ঘুরছেন আব্দুস সামাদ নামে এক দালাল। ই-পাসপোর্ট সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বলেন, সেটা আরও অনেক দূর।

এছাড়া পাসপোর্ট অফিসের আনসার সদস্য আল আমিন বলেন, স্যার ই-পাসপোর্ট নিয়ে তোড়জোড় কাজ চলছে। কবে নাগাদ এটি শুরু হবে তা জানি না। তবে আরও কিছু দিন সময় লাগতে পারে।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) আবুল আসাদ বলেন, ই-পাসপোর্ট নিয়ে কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে তা সকলের জন্য উম্মুক্ত করা হবে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য তিনি প্রকল্প কর্মকর্তার কাছে জানার জন্য অনুরোধ করেন।

 ই-পাসপোর্টের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুর রহমান খান এবিষয়ে বলেন, উদ্বোধনের দিনে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর হাতে ই-পাসপোর্ট তুলে দেওয়া হয়েছে। অফিসিয়ালি একটু সময় লাগছে। বাকী প্রস্তুতি প্রায় শেষের দিকে। দফায় দফায় মিটিং করা হচ্ছে। বিমানবন্দরে ই-গেটও বসেছে। তবে এটি সাধারণের হাতের নাগালে আসতে আরো কিছুটা সময় লাগতে পারে।

জানা যায়, ই-পাসপোর্ট উদ্বোধন হলেও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে এখনো অনেক সময়ের প্রয়োজন রয়েছে। সহসাই সাধারণের হাতে ই-পাসপোর্ট পৌঁছানো সম্ভব নয়। ই-পাসপোর্ট সংক্রান্ত এখনো কোনো নির্দেশনা আসেনি বলেই জানান একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। কারা করবেন ই-পাসপোর্টের কাজ, কোথায় হবে সেই কাজ-এসব ঠিকই হয়নি, বলেন তিনি। তাছাড়া যেসব যন্ত্রপাতি আনা হয়েছে তাও এখনো বসানো হয়নি। গত কিছুদিন থেকে এমআরপি পাসপোর্টের কাজ বাদ রেখে মিটিং করে কর্মকর্তাদের সময় পার হচ্ছে বলেই জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা।

সূত্র আরো জানায়, ই-পাসপোর্ট প্রাথমিক অবস্থায় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সামরিক ও বেসামরিক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারাই পেতে পারেন। এতে তাদের বিদেশে যাতায়াত করতে তেমন কোনো সমস্যাও হবে না। ই-গেট দিয়ে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতেও কোনো ভোগান্তিতে পড়তে হবে না। এরপর ধীরে ধীরে সুবিধাও বাড়বে, একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালেও ই-পাসপোর্ট চলে যাবে।

Print Friendly, PDF & Email