ইভিএম বিতর্কে আ.লীগের সতর্ক জবাব

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ‘ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন’ বা ইভিএমে ভোট নেওয়ার সিদ্ধান্তের শুরু থেকেই সমালোচনা করে আসছে আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি।

আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচার শুরুর দিন থেকেই বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলো নানাভাবে ইভিএমবিরোধী বক্তব্য তুলে ধরছে ভোটারদের কাছে। ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে বিএনপি ও এর নেতৃত্বের ঐক্যফ্রন্টের নেতারাও বিভিন্ন ইস্যু ছাপিয়ে ইভিএম বিতর্ককে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারাও সতর্ক। বিএনপির ইভিএমবিরোধী বক্তব্যের জবাবে তারাও সরব। বিএনপি ‘শুধু রাজনৈতিক কারণে’ ইভিএমের বিরোধিতা করছে বলে আওয়ামী লীগের নেতারাও তাদের বক্তব্য তুলে ধরছেন। কৌশলী জবাব নিয়ে মাঠেও আছেন সরকারি দলের নেতাকর্মীরা।

দলীয় প্রার্থীরা জয়ী হতে না পারলে বিএনপি শেষ পর্যন্ত ইভিএম পদ্ধতিতে ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ এনে নির্বাচনকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ করার পরিকল্পনা করছে বলেও দলটির নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের বক্তব্যে ভোটাররা যেন বিভ্রান্ত না হন, সেদিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচারণা চালাতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীদেরও নির্দেশ দেওয়া আছে।

ইভিএমে বিএনপির শীর্ষ নেতারাসহ দলটির মনোনীত মেয়র ও কাউন্সিল পদের  প্রার্থীরা আপত্তি জানালেও সরকারি দলের শীর্ষ নেতৃত্বসহ প্রার্থীরা কোনো আপত্তি তুলছেন না। তারা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইভিএমে ভোটের পক্ষে।

দলটি বলছে, ইভিএম আওয়ামী লীগেরই দাবি ছিল। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত ইসির সঙ্গে সংলাপে আওয়ামী লীগ যুক্তি, তথ্য-উপাত্ত এবং বিভিন্ন দেশের উদাহরণ তুলে ধরে এসব দাবি জানিয়েছিল। এর আগেও দেশের অন্য সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার হয়েছে।

এ পদ্ধতিতে দ্রুত ভোট নেওয়া, গণনা ও ফল ঘোষণা করা যায়। সিলেটের নির্বাচনে দুটি কেন্দ্রে ইভিএমের ফলে বিএনপিই জিতেছিল। এসব যুক্তি দেখিয়ে আওয়ামী লীগ বলছে, ইভিএম ব্যবহারে বিএনপির আপত্তি থাকার কথা নয়। ইভিএমে নির্বাচন হবে জেনে এবং এতে অংশ নিয়েও এ পদ্ধতির বিপক্ষে অবস্থান বিএনপির প্রার্থীদের।

তবে বিএনপির অভিযোগ, ইভিএমে ভোট নেওয়া মানে ‘প্রযুক্তির মাধ্যমে ভোটাধিকার হত্যার এক নিঃশব্দ প্রকল্প বাস্তবায়নের দুরভিসন্ধি মাত্র’। এতে যন্ত্রের মাধ্যমে কারসাজি করা ও কোনো দলের পক্ষে নির্বাচনি ফল পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকায় এর বিরুদ্ধে ‘দৃঢ় অবস্থান’ নিয়েছে দলটি।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের পর্যবেক্ষণ বলছে, ‘সাংগঠনিক ও নেতৃত্বে দুর্বলতা’সহ ভোটের মাঠে নেমে বিএনপি ইভিএমের বিরুদ্ধে দলীয় অবস্থানের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা করছে। গত ১৫ জানুয়ারি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ইভিএম নিয়ে ‘সমস্যাগুলোর’ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন প্রকাশ করে দলটির সমর্থক একটি সংগঠন।

এরপর ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ইভিএম বাতিলের দাবি জানানো হয়।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিনই প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জানিয়েছিলেন, ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) এবারের নির্বাচন হবে ইভিএমে।’

সূত্র বলছে, ইভিএম নিয়ে আপত্তি জানানোর পাশাপাশি  বিএনপি ইতোমধ্যেই ভোট নিরপেক্ষ হবে না বলে মাঠ গরম করছে। ফলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হলে বিএনপিসহ অন্যরা নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলবেই।

তাই আওয়ামী লীগ ভোটের আগেই জনমনে এমন একটা ধারণা জন্ম দিতে চায়, তারা শুরু থেকেই বেশ গোছালো হয়ে ও পরিকল্পনা নিয়ে দুই সিটির নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।

নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর দিন থেকেই আওয়ামী লীগ নিজ প্রার্থীদের বিষয়ে ব্যাপক প্রচার চালায় এবং ইভিএমের পক্ষে জনমত গড়ে তোলে। নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের সন্দেহ দূর করতে প্রচারে কোনো ঘাটতি না রাখার পরিকল্পনা নিয়েই মাঠে নেমেছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা।

বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর তুলনায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের প্রচার যাতে বেশি হয়, মাঠে নামার আগে তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয় আওয়ামী লীগের পক্ষে।

এ বিষয়ে দলীয়প্রধানের নির্দেশও আছে। এবারের নির্বাচন ঘিরে বিএনপির ‘অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক’ সৃষ্টির বিষয়েও আওয়ামী লীগ সতর্ক থাকবে।

গত নির্বাচনের মতো ভোটের দিন মাঝপথে বিএনপি ভোট ‘বর্জনের’ ঘোষণা দিয়ে এ নিয়ে ‘বিতর্ক’ সৃষ্টি করতে চাইলেও এর যথাযথ জবাব দেওয়ার জন্যও আওয়ামী লীগের নেতারা প্রস্তুত থাকবেন। এ লক্ষ্যে কৌশলও ঠিক করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মনে করেন, ‘বিএনপি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। তাদের বড় লক্ষ্য হচ্ছে, নির্বাচনটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। নিশ্চিত পরাজয় জেনে সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিএনপি আবোলতাবোল বলছে। ইভিএম নিয়ে তারা বিষোদ্গার করছে।

তারা ইভিএমকে বিতর্কিত করে তাদের নির্বাচনে পরাজয়ের যে আভাস, সেটাকে এড়াতে চায়। এ জন্য তারা এই বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করছে। তারা নির্বাচনে জেতার লক্ষ্যের চেয়ে বড় লক্ষ্য হচ্ছে নির্বাচনটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ঢাকার আসন্ন দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পর্কে বিএনপি নেতাদের মন্তব্য হটকারী। নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার বিএনপির প্রচেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। তারা সব সময়ই নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে এবং মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টির লক্ষ্যেই নির্বাচনে অংশ নেয়।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পরিবেশকে ঘোলাটে করার জন্য একটি পক্ষ সক্রিয়। নানা ধরনের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যে প্রক্রিয়া সেই প্রক্রিয়ার অংশ কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে।’

Print Friendly, PDF & Email