রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ছাড়াই এক বীর মুক্তিযোদ্ধার চিরবিদায়ের দুঃখ

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবন বাজি রাখা নিঃশব্দচারী এক মুক্তিযোদ্ধা রঞ্জু। এই বীর গত ২০ জানুয়ারি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। কিন্তু তার বিদায় বেলায় জোটেনি কোন গান-স্যালুট বা রাষ্ট্রীয় সম্মান। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র না পাওয়ায় জীবদ্দশায়ও ছিলেন সরকারি ভাতাসহ যাবতীয় সুযোগ সুবিধার বাইরে।

মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব দেখানো রঞ্জুর এ করুণ বাস্তবতাকে সামনে রেখে লজ্জার বিষয়টি সামনে এনেছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শান্ত রহমান। মুক্তিযোদ্ধা রঞ্জুকে নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি। পাঠকের জন্য সেই স্ট্যাটাস হুবহু তুলে ধরা হলো।

ছন্নছাড়া ছেলেটি, আমার থেকে ২/৩ বছরের ছোট। গত ২০ জানুয়ারি ২০২০ ওর মৃত্যু হয়েছে। এ দেশেরই এক মুক্তিযোদ্ধার জীবনাবসান হলো। ছোট্ট গাইবান্ধা শহরের নিঃশব্দচারী এক মুক্তিযোদ্ধা কোন সহায়তা, কোন ভাতা, কোন সহৃদয়তা, কোন গান-স্যালুট ছাড়াই কবরে চলে গেলো। ওর নাম রঞ্জু। আম্মা আদর করে রঞ্জু পাগলা বলে ডেকেছে, সেটা ছিলো আদরের ডাক। ছোট্ট বাচ্চা ছেলে মুক্তিযোদ্ধা, যে কোন মা’ই এভাবে আদর করে ডাকবে। খুব স্বাভাবিক। সে তো সেই ’৭২ এর কথা। অনেক বছর পরে দেখা গেলো সবাই তাকে ‘রঞ্জু পাগলা’ বলে ডেকে অভ্যস্ত। এতে অবশ্য ওর মাঝে কোন ভাবান্তর নেই। ছিলো না। অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো রঞ্জু নিজেও।

রঞ্জুকে নিয়ে নিজের কৌতুহল তুলে ধরে তিনি লিখেছেন: সেই জানুয়ারী ১৯৭২ এর কথা। ‘শরণার্থী জীবন’ থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে এসেছি। বাসায় সবসময় নানা মানুষের ভীড়, অধিকাংশই সাঘাটা-ফুলছড়ি এলাকার। অনেকের কাঁধে অস্ত্র, একদিন রঞ্জুকেও দেখলাম। অনেকের ভীড়ে বাসায় সম-বয়সী এক ছেলের আসা-যাওয়া, প্রায় প্রতিদিন। আসছে, যাচ্ছে, আব্বার সাথে কথা বলছে, আম্মার সাথে কথা বলছে, আম্মা আদর করে খাইয়ে দিচ্ছে, আব্বা অনেক স্নেহ দিয়ে কথা বলছে। দেখে আমার মনে অনেক প্রশ্ন, জিজ্ঞেস করা হয়নি।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা শান্ত রহমানের সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা রঞ্জু

এরপরই শান্ত রহমানের লেখায় উঠে এসেছে রঞ্জুর বীরত্বের কাহিনী। লিখেছেন: পরে আম্মার কাছেই শুনেছি ও মুক্তিযোদ্ধা। পাকিস্তান আর্মি ক্যাম্পে যেয়ে কলা-ফল-সিগারেট ফেরি করে বিক্রী করে তাদের অবস্থানের খবর নিয়ে আসা, পথ-ঘাট দেখে আসা, কমান্ডারের পরিকল্পনায় সহায়তা করা, আবার রাতের অপারেশনে অস্ত্র হাতে নিয়ে সেই কমান্ডারের সাথে থেকে পথ চিনিয়ে নিয়ে যাওয়া, আক্রমনে অংশ নেয়া– এসবই ছিলো ওর কাজ। সম্ভবত ‘রঞ্জু’ই তৎকালীন গাইবান্ধা মহকূমার কনিষ্টতম মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭২ সাল থেকে আমি যেমন জানি, তেমনি আমাদের সেই ছোট্ট শহরের সবাই জানে–সে একজন মুক্তিযোদ্ধা।

রঞ্জুর স্মৃতিচারণায় শান্ত রহমান লিখেছেন: যখনই গাইবান্ধা যাই, ও চলে আসবে, সুন্দর করে স্যালুট করবে, বসে গল্প করবে, চা খাবে, তারপরে ওর ভাঙ্গা সাইকেল চালিয়ে চলে যাবে। বেশিদিন হয়নি, গত ২০১৯ এর কুরবানী ঈদের সাক্ষাতে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলামঃ জীবন কেমন চলছে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতা এবং অন্যান্য কী কী সহায়তা সে পাচ্ছে। উত্তর শুনে থমকে গেলাম, ও ‘মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র’ পায়নি। আমি আঁতকে উঠেছি ওর উত্তর শুনে! ওর ভাষায়, “চাচা-চাচী মারা যাওয়ায় আমি আসলেই এতিম হয়ে গেছি! সিনিয়র মুক্তিযোদ্ধা নেতা-ভাইদের নাম ধরে ধরে জিজ্ঞেস করলাম–কেন তাদেরকে বলেনি, অনেক প্রশ্ন করে আরো অনেক তথ্য পেয়ে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। ছন্নছাড়া এই ছেলেটির জীবনের চাহিদা এতো কম ছিলো যে কী করে কী পেতে হবে, মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র দিয়ে কী হবে– এসব বৈষয়িক চিন্তা-ভাবনা ওর মাথায় কখনোই ছিলো না, কখনোই আসেনি। কয়েকজন সিনিয়র মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলেছিলাম, রঞ্জুকে বাদ দিয়ে আপনারাই বা কিভাবে সনদপত্র নিয়েছেন?

শেষ পর্যায়ে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা লিখেছেন: পাগলা রঞ্জু, ছন্নছাড়া রঞ্জু’র আর সনদপত্রের দরকার নেই। নীরবে, নিভৃতে সে চলে গেলো না ফেরার দেশে। রেখে গেছে ওর ভাঙ্গা সাইকেল। কোন হৈ-চৈ ওঠেনি, কোন কন্টিনজেন্ট ‘গান স্যালুট’ দিয়ে বিদায় জানায়নি, কিছুই না। শুধু মনে পড়ে গেলো, এই শহরেই অনেকেই ‘ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা’ সেজে, সনদপত্র নিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিয়মিত ভাতা নিয়ে জীবন যাপন করছে। নিশ্চয় তাদের মনে সামান্য হলেও লজ্জ্বা লেগেছে, তাই না?

Print Friendly, PDF & Email