আ.লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হলে ‘কঠোর সাংগঠনিক’ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে দল। কেউ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ‘বিদ্রোহী’ হলে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়ে শিগগিরই ঘোষণার কথাও ভাবছেন নীতিনির্ধারকরা।

‘বিদ্রোহীদের’ সুযোগ দিতে এবার কোনো ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদ উন্মুক্ত রাখা হচ্ছে না।

চলমান শুদ্ধি অভিযানের মধ্যে অনুষ্ঠেয় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে কোনো নেতার দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী আচরণকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় না দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল। দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশও আছে।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ে নানা তৎপরতা থাকলেও নির্বাচন সামলানোর জন্য এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো কমিটি দলটির পক্ষ থেকে করা হয়নি।

তবে দু’একদিনের মধ্যে দলীয় কোনো বৈঠকে কমিটি চূড়ান্ত করা হবে। তখন নির্বাচনে দলের ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হলে তার বিরুদ্ধে ‘কঠোর সাংগঠনিক’ ব্যবস্থা কী হতে পারে, তাকে একটা ‘নির্দিষ্ট সময়’, নাকি ‘আজীবনের জন্য’ দল থেকে বহিষ্কার করা হবে—এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বলে সরকারি দলের নীতিনির্ধারক সূত্র জানায়।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর তিনজন সদস্য জানান, মূলত দুটি প্রধান কারণে এবার দলের ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’র বিষয়ে কঠোর শীর্ষ নেতৃত্ব।
প্রথমত, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আগামী ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে মর্যাদার লড়াই হিসেবে দেখছে ক্ষমতাসীন দল। ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চান তারা। এমন পরিস্থিতিতে দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়ানোর আশঙ্কা আছে ‘বিদ্রোহী প্রার্থীদের’।

ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির নির্বাচনে কোনোভাবেই হারা যাবে না, এমন পরিকল্পনা সামনে রেখে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে মাঠে নামতে নির্দেশ আছে দলীয়প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। দুই সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে কোনো ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ না থাকলেও কাউন্সিলর পদে শতাধিক ‘বিদ্রোহী’ এখনো সক্রিয়।

গত সময়ে জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারের কয়েকটি নির্বাচনে ‘বিদ্রোহীদের’ শাস্তি না হওয়ায় এবারো দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হলে কিছু হবে না, এমনটা কোনো প্রার্থীর মনে করার সুযোগ এবার কোনোভাবেই রাখতে চায় না দল।

দ্বিতীয়ত, চলমান শুদ্ধি অভিযানের মধ্যেও কেউ ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হলে আর তার বিরুদ্ধে ‘কঠোর সাংগঠনিক’ ব্যবস্থা না নিলে অন্য নেতাকর্মীদের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছাতে পারে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু হলে আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত দুই সিটি করপোরেশনের বেশ কয়েকজন কাউন্সিলরের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দুর্নীতির তথ্য উঠে আসে। তাদের এবার মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।

ভোটের আগমুহূর্তে মনোনয়নজনিত কোন্দল যেন মাথাচাড়া দিতে না পারে, সেই আশঙ্কা থেকেও দলের আগাম নানা সতর্কতা থাকছে। কাউন্সিলর পদে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা এবং দল সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ী করতে সাংগঠনিক নির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

এ জন্য ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগসহ সব সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশও দেন তিনি। গত শনিবার রাতে গণভবনে অনুষ্ঠিত দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ ও উপদেষ্টা পরিষদের মুলতবি যৌথসভায় তিনি ওই নির্দেশ দেন।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড সূত্র বলছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডেই দলের একক প্রার্থী নিশ্চিতের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। আগামী ৯ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। এর আগেই ‘বিদ্রোহী প্রার্থীদের’ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করানোর চেষ্টা চলছে। ঢাকা মহানগরের দুই অংশের নেতারা ‘বিদ্রোহীদের’ সঙ্গে কথা বলছেন।

নির্বাচন সমন্বয়ের জন্য দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমুকে ডিএসসিসির আর উপদেষ্টা পরিষদের আরেক সদস্য তোফায়েল আহমেদকে ডিএনসিসির প্রধান করে গঠিত সমন্বয় কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারাও ‘বিদ্রোহী প্রার্থীদের’ সঙ্গে কথা বলছেন।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও দলের স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ফারুক খান গত রোববার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘নির্বাচনের শুরুতে আওয়ামী লীগের মতো জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে একাধিক প্রার্থী থাকতে পারেন। এটা নতুন কিছু নয়, যেকোনো নির্বাচনের আগে দেখা যেতে পারে।

এবার ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে যারা দলের সমর্থন পাননি, তাদের মধ্যে অনেকে প্রার্থী হয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত তারা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন বলে দল আশা করে। কাউন্সিলর পদে দলীয় সমর্থনে পরিবর্তন আসার আর তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই।’

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন না পেয়ে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হতে পারেন অনেকে, এমন শঙ্কা আছে শীর্ষ নেতৃত্বের। কাউন্সিলর পদে গত ২৯ ডিসেম্বর দলীয় সমর্থনের তালিকা প্রকাশের পর এখন পর্যন্ত দুই সিটি করপোরেশনের বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী পরিবর্তন করেছে আওয়ামী লীগ।

এ অবস্থায় ‘বিদ্রোহীদের’ অনেকে মনে করছেন, দলের ঘোষিত তালিকাই চূড়ান্ত নয়। দলীয় সমর্থন বদলাতে পারে। পর্যালোচনা করে ‘অধিকতর যোগ্য’ প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়ার সুযোগ এখনো রয়েছে।

আবার ‘বিদ্রোহীদের’ কেউ কেউ বলছেন, কয়েকটি ওয়ার্ডে প্রার্থিতা উন্মুক্ত করে দিতে পারে আওয়ামী লীগ।

নেতাকর্মীদের অভিযোগ, অতীতে জাতীয় সংসদসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে দলের বিরুদ্ধে না যেতে ও ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ না হতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়। শাস্তির কথাও বলা হয়। তবে দলের সিদ্ধান্ত না মেনে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হিসেবে অংশ নেওয়া নেতারা এখন দলেই আছেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ ও পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ‘বিদ্রোহী’ অধিকাংশ নেতার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কঠোর বার্তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মুখে ও চিঠিতে সীমাবদ্ধ থাকে বলেও তাদের অভিযোগ।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কয়েক নেতা জানান, জাতির পিতা ও সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের আয়োজন চলতি বছরের মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে।

বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে তার জন্মশতবর্ষের আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগে অনুষ্ঠেয় সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হোক বা দলীয় মনোনয়ন না পাওয়াকে কেন্দ্র করে কোনো কোন্দল ছড়িয়ে পড়ুক—এমনটা ক্ষমতাসীনরা চান না।

রাষ্ট্রের স্থপতি ও বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন হবে সার্বজনীনভাবে, সে লক্ষ্যেই প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার। ফলে দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবার অনেক সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে।

এবারের নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির ‘অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক’ সৃষ্টির বিষয়েও ক্ষমতাসীন দল সতর্ক থাকবে।

Print Friendly, PDF & Email