দেড় কোটি কলের ১ কোটি ১৯ লাখ ভুয়া

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ডা. জাকির হোসেনের নির্যাতন সইতে না পেরে ৩০ নভেম্বর স্ত্রী ডা. ফাতেমা জাহান বারী ট্রিপল নাইনে (৯৯৯) ফোন করেন। ফোন পেয়ে রাজধানীর রমনার বেইলি রোডের ১৮ সুপিরিয়র সরকারি কোয়ার্টার থেকে ডা. ফাতেমাকে উদ্ধার করে পুলিশ। আটক করে নির্যাতনকারী স্বামী ডা. জাকিরকে। ১২ সেপ্টেম্বর বিকালে ১৪ নাবিক নিয়ে বঙ্গোপসাগরের পায়রা বন্দরের কাছে ১৫২টি কনটেইনার বহনকারী জাহাজ ডোবার ঘটনা ঘটে।

তাজিম আহমেদ নামে ওই জাহাজের এক নাবিক ট্রিপল নাইনে ফোন করে সহায়তা চান। এর কিছু সময় পরই নৌবাহিনীর জাহাজ সাঙ্গু ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। তারা ১৪ নাবিককে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করে।
পরে নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা নাবিকদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেন।
৭ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার বাড্ডা থেকে এক ব্যক্তি ট্রিপল নাইনে ফোন করে জরুরি পুলিশ সেবা চান। তিনি জানান, মধ্য বাড্ডার লুৎফুন টাওয়ার থেকে একটি ছেলে অপহরণ করে আদর্শনগরের একটি বাসায় আটকে রাখা হয়েছে। এর পরই বাড্ডা থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। মাত্র ১ ঘণ্টা ২০ মিনিটের মধ্যে কুমিল্লা হোমনা থানার বাসিন্দা অপহৃত সেই যুবক হাসিবকে উদ্ধার করে পুলিশ।

শুধু এই তিনটি ঘটনাই নয়, প্রতিদিনই ট্রিপল নাইনে ফোন করে মানুষ সেবা নিচ্ছেন। দিনে দিনে জনপ্রিয় হচ্ছে পুলিশের সেবা সংস্থা ট্রিপল নাইন। বিগত দুই বছরে ট্রিপল নাইনে প্রায় দেড় কোটি কল এসেছে। তবে এর অপব্যবহারও করছে একটি চক্র। দেড় কোটি কলের মধ্যে সেবা দেওয়ার মতো কল ছিল মাত্র পৌনে দুই লাখ
ট্রিপল নাইন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর চালু হওয়া এ সেবাটির জনপ্রিয়তার পাশাপাশি অপব্যবহারও হচ্ছে। এ সেবাটি চালুর পর থেকে চলতি বছর ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই বছরে ১ কোটি ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ৬৬টি কল এসেছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৫৮৯টি কল সরাসরি সমাধানযোগ্য ছিল। কর্তৃপক্ষ বলছে, মোট কলের ২১ শতাংশ কলের বিপরীতে কোনো না কোনোভাবে সার্ভিস দেওয়া হয়েছে। জাতীয় জরুরি সেবা ট্রিপল নাইনের কর্মকর্তারা জানান, ট্রিপল নাইনে অপ্রয়োজনে অনেকে ফোন করছেন। দিচ্ছেন মিথ্যা তথ্যও। গেল দুই বছরে ট্রিপল নাইনে হয়রানিমূলক বা মিথ্যা তথ্যের কল এসেছে ১ কোটি ১৮ লাখের বেশি, যা মোট কলের ৭৯ শতাংশ। বাকি ৩০ লাখ ৭৮ হাজার ৫১৭টি কল এসেছে সেবা নেওয়ার জন্য, যা মোট কলের ২১ শতাংশ। সেবা সহায়তার এই কলগুলোর মধ্যে আবার সরাসরি সেবা দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৫৮৯টি কলের। এর মধ্যে পুলিশের সেবা নেওয়া হয় ১ লাখ ২৮ হাজার ৪৩৭টি, ফায়ার সার্ভিস ২৬ হাজার ৮২৭টি এবং অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস দেওয়া হয় ২০ হাজার ৩২৫টি। বাকি ২৯ লাখ ২ হাজার ৯২৮টি কল ছিল তথ্য জানার জন্য। ওই কর্মকর্তা বলেন, এই সেবার বিষয়ে প্রচারণার অভাব রয়েছে। এই কার্যক্রমের ব্যাপকতা আরও বৃদ্ধি করা উচিত। কখন কল দেবে, কেন দেবে এ বিষয়ে এখনো সচেতনতা তৈরি হয়নি। উন্নত বিশ্বে ট্রিপল নাইনে সব সেবা মেলে। তাই না জেনে অনেকেই ফোন করেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস কিংবা অ্যম্বুলেন্সই নয়, এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস, ওয়াসাসহ মাঠপর্যায়ে কর্মরত বিভিন্ন সামাজিক ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এ সেবাটি ব্যাপকভাবে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। তথ্যদাতা যে-ই হোক না কেন, তাকে বেশি বিরক্ত করা যাবে না। তার কাছ থেকে একবারই তথ্য নিতে হবে। নইলে পরবর্তী সময়ে তিনি তথ্য দিতে বিমুখ হবেন। অন্যরাও আগ্রহ হারাবে। তথ্য পাওয়া মাত্রই ভুক্তভোগীদের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। সার্ভিস দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। তবেই এ সেবা চালু করার কাক্সিক্ষত সুফল পাবে সাধারণ মানুষ। জাতীয় জরুরি সেবা ট্রিপল নাইনের প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ জানান, ট্রিপল নাইনের মাধ্যমে পুলিশি সেবা নাগরিকদের দোরগোড়ায় দ্রুত সময়ে পৌঁছে দিতে থানায় থানায় ডেসপাস সিস্টেম (টিডিএস) চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে থানা পুলিশের টহল গাড়ি মনিটরিং করতে গাড়িতে যুক্ত করা হয়েছে মোবাইল ডাটা টার্মিনাল (এমডিটি) নামে স্বয়ংক্রিয় ডিভাইস। এতে করে ট্রিপল নাইনে সহায়তা চেয়ে ফোন করলে আগের চেয়ে কম সময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে সেবা নিশ্চিত করতে পারছে পুলিশ। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীনে প্রথমে কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে ট্রিপল নাইন নম্বরে জাতীয় হেল্প ডেস্ক চালু করা হয়। ২০১৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সেখানে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলে। ৮ অক্টোবর ট্রিপল নাইন পূর্ণাঙ্গভাবে পরিচালনার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করা হয়। এরপর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ২৬ অক্টোবর থেকে এর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করে পুলিশ। ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় রাজধানীর আবদুল গণি রোডে পুলিশের ক্রাইম কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারে জাতীয় জরুরি সেবা ট্রিপল নাইনের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। ফায়ার সার্ভিস, জরুরি অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশি সেবা দিতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। মোবাইল ও ল্যান্ডফোন থেকে সম্পূর্ণ টোল-ফ্রি কল করে বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে এই সেবা নেওয়া যাচ্ছে। ইতিমধ্যে দেশের ৯২টি মহানগর এলাকার থানায় পেট্রোল ডিউটি গাড়িতে এমডিটি ব্যবহার করা হচ্ছে। ছয়টি মহানগর এলাকার ২০৪টি থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষে টিডিএস চালু করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ে সেবা নিশ্চিত করতে পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৩০টি থানার পেট্রোল ডিউটিরত গাড়িতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি এমডিটি স্থাপন এবং সব থানায় টিডিএস চালু করা হবে। ট্রিপল নাইনে ২৪ ঘণ্টা সার্ভিস দেওয়া হচ্ছে। শুরুতে ৩৩টি ওয়ার্ক স্টেশনের মাধ্যমে কল গ্রহণ করা হলেও বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০টি। পর্যায়ক্রমে একসঙ্গে ৫৫০টি ওয়ার্ক স্টেশনের মাধ্যমে কল নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email