তখন আমি ক্লাস ফাইভ কী সিক্সে পড়ি

জান্নাতুল ফেরদৌস :

আমার ছোটবেলার কয়েকটা ঘটনা দিয়ে শুরু করি। তখন আমি ক্লাস ফাইভ কী সিক্সে পড়ি।  গ্রীষ্মকালীন ছুটি চলছিলো। একদিন দুপুর বেলা বসার ঘরে সোফায় পা দুলিয়ে টিভি দেখছি। হঠাৎ মা এসেই আমার বাম কানটা জোরে টেনে ধরে খিটমিট করে বললেন, “কতবার করে লবনের বোয়মটা চাইলাম আর উনি এখানে বসে বসে টিভি দেখছেন।” জোরে বললে ভুল হবে, আমার মনে হচ্ছিল কানটা ছিড়ে যাবে; তবুও খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললাম, “মা তুমি মনে হয় বৃষ্টিকে বলেছো; আমি মেঘ।” আমার কথা শুনে মা এক ঝটকায় আমার কান ছেড়ে দিলেন। একটু পর কাচুমাচু মুখ নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। অকারনে আমার কান ধরার অপরাধের চেয়ে নিজের সন্তানকে চিনতে না পারার অপরাধবোধ তার চোখে মুখে স্পষ্ট দেখতে পেলাম সেদিন।

ও আচ্ছা, আগে আমার পরিচয়টা দেই। আমি মেঘ; আমার ছয় মিনিটের ছোট বৃষ্টি। বাবার কাছে শুনেছি, আমি জন্ম নেয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আকাশে প্রচণ্ড মেঘ জমেছিল। ছয় মিনিট পরেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হয়। আর ঠিক তখনি আমার যমজ বোনের জন্ম হয়। তাই বাবা আমার নাম মেঘ আর আমার যমজ বোনের নাম বৃষ্টি রাখেন। হয়ত ছয় মিনিটের বড় হওয়ার জন্যই আমার মধ্যে বড় বোনের একটা দায়িত্ববোধ কাজ করতো। সাধারণত যমজদের ক্ষেত্রে চেহারায় সামান্য কিছু পার্থক্য থাকে। কিন্তু আমাদের দুজনার চেহারায় কোন পার্থক্য ছিলো না। দুজনকে আলাদাভাবে চেনার একমাত্র উপায় ছিলো বৃষ্টির কপালের ডান পাশে একটা কালো জট। কিন্তু বৃষ্টি তার মাথার সামনের দিকের কিছু চুল দিয়ে খুব যত্ন করে সেই জটটা ঢেকে রাখতো যাতে আমাদের দুজনকে কেউ আলাদাভাবে চিনতে না পারে। এটা করে ও খুব মজা পেতো। আর আমিও ওর কিছু কর্মকাণ্ডের শাস্তি নিজের কাঁধে নিয়ে ভাবতাম, এটাই বুঝি আমার দায়িত্ব।

একদিন স্কুলে টিফিনের সময় স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমার সামনে এসে বললেন, “হাত দে।”

-কেন স্যার?”

-আগে হাত দে, তারপর বলছি।”

আমি বুঝতে পারলাম নিশ্চয়ই বৃষ্টি কিছু করেছে। কথা না বাড়িয়ে আমার ডান হাত বাড়িয়ে দিলাম। অমনি স্যার ঠাস ঠাস করে বেত দিয়ে তিনটা বারি দিয়ে বললেন, “স্কুলের পুকুর পাড়ে যাওয়া নিষেধ তুই জানিস না? তারপরও গেলি কেন?” আমার হাতে বেতের বারির তিনটা লাল রেখা পরে গেলো। আমি ছলছল চোখে বললাম, স্যার আপনি বৃষ্টিকে পুকুর পাড়ে দেখেছেন। আমি এখানেই ছিলাম। আমার কথা শুনে স্যারের হাত কেঁপে বেতটা মেঝেতে পড়ে গেলো। আমি বেতটা উঠিয়ে স্যারের দিকে এগিয়ে দিলাম। তিনি কাঁপা কাঁপা হাতে বেতটা নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যান।

যখন ক্লাস নাইনে উঠলাম, তখন ফরিদ নামের এক দুঃসম্পর্কের চাচাতো ভাইকে বাসায় লজিন রাখা হলো। ফরিদ ভাই নিজের পড়াশোনার  জন্য আমাদের বাসায় এসেছিলেন। মা তাকে আমাদের পড়াটাও দেখিয়ে দিতে বললেন। তখন সবে মাত্র আমি ফ্রক বাদ দিয়ে কামিজ পরা শুরু করেছি। নিজের ভিতরে কেমন যেন একটা লজ্জা লজ্জা ভাব কাজ করতো। ফরিদ ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে কখনো কথা বলতাম না। ভিষণ লজ্জা লাগতো। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ছাদে উঠে আকাশ দেখতাম আর বাতাসে ওড়নার আঁচল ওড়াতাম। একদিন সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে ছাদে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ করে পিছন থেকে ফরিদ ভাই জড়িয়ে ধরে বললেন, “আমার সোনাটা আমাকে চিঠি দিয়ে ছাদে আসতে বলল কেন?” আমার বুঝতে বাকি রইলো না যে এটা বৃষ্টির শয়তানি।

-ফরিদ ভাই, আমি মেঘ।”

বিদ্যুতে শক খাওয়ার মত ফরিদ ভাই ঝটকা দিয়ে আমাকে ছেড়ে দ্রুত ছাদ থেকে চলে গেলেন। পরের দিন বাড়িতে জরুরী কাজ আছে বলে ফরিদ ভাই সেই যে গেলেন, আর কখনো ফিরে আসলেন না।

মাধ্যমিক পরীক্ষার পর আমি একটা সরকারী কলেজে চান্স পাই। বৃষ্টি চান্স না পাওয়ায় একটা প্রাইভেট কলেজে ভর্তি হয়। ছোট থেকেই বৃষ্টি কারও সাথে খুব একটা কথা বলতো না, নিজের মতই থাক তো। আলাদা কলেজে ভর্তি হওয়ার কারনে দু’জনার মাঝে দূরত্বটা আরো বেড়ে গেলো। আমি পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম আর বৃষ্টি বন্ধু-বান্ধব আর ফেজবুক নিয়ে সময় কাটাতে ব্যস্ত। আমাদের দুজনের একসাথে ঘুমানোর জন্য একটা যৌথ খাট ছিল। কিন্তু বৃষ্টি বাবাকে বলে নিজের জন্য আলাদা করে ছোট একটা খাট বানিয়ে নিলো।

একবার পক্সে আক্রান্ত হয়ে বৃষ্টি খুব অসুস্থ। মুখে হালকা কিছু দাগও পড়ে গেলো। সেদিন রাতে কেন যেন বৃষ্টি আমাদের যৌথ খাটে ঘুমালো। পড়া শেষ করে আমি আস্তে করে ওর পাশ দিয়ে শুয়ে পড়লাম যেন ওর ঘুম না ভাঙে। বাতিটা নেভাতেই বৃষ্টি বলল, “আমার একটা কাজ করে দিবি?” আমি একটু চমকে উঠলাম। ও তো এভাবে কখনো বলে না।

-কী কাজ?”

-কাল একজনের সাথে দেখা করতে হবে।”

-কার সাথে?”

-ওর নাম রিপ্পি। ফেজবুকে আমাদের পরিচয়। কিছুদিন কথা হয়েছে। কথা ছিলো ওর জন্মদিনে আমাদের দেখা হবে। কাল ওর জন্মদিন। কিন্তু আমার চেহারার এই অবস্থায় দেখা করতে চাচ্ছি না।”

-তুই সেজে আমাকে যেতে হবে, তাই তো?”

-হু।”

-ব্যাপারটা কি ঠিক হবে?

-জগতে কি সবই ঠিক হয়? কিছু ব্যাপার বেঠিক না হলে জগৎ থেমে যেত।”

– ছেলেটা যদি বুঝতে পারে?”

-যদি আমাদের আলাদা করে কেউ বুঝতে পারতো তাহলে আমার জন্য ছোটবেলা থেকেই তোকে অহেতুক শাস্তি পেতে হতো না। আর আমি সুস্থ হলে তোকে আর দেখা করতে হবে না। শুরুটা তুই করবি, শেষটা আমি করবো। ব্যাস! কাটাকটি।”

আমি বুঝে উঠতে পারছি না যে কি করা উচিত। বৃষ্টি নাক ডাকা শুরু করেছে। আমার চোখেও যখন তন্দ্রা ভাব ঠিক সেই সময় বৃষ্টি বলে উঠলো- “ফেজবুকে আমার আসল নাম নেই। তুই শুধু নিজের নামটা বৃষ্টি বলিস।”

-তুই ঘুমাসনি?”

কোন উত্তর না দিয়ে বৃষ্টি আবারও নাক ডাকা শুরু করলো।

পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষের কথা অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা প্রকৃতি দেয়না। বৃষ্টির কথা অগ্রাহ্য করার ক্ষমতাও হয়ত প্রকৃতি আমাকে দেয়নি।

পরদিন রিপ্পির সাথে আমার দেখা হয়। পাতলা ফিনফিনে ফর্সা একটা ছেলে। চোখে মোটা চশমা। দেখেই মনে হয় লাজুক স্বভাবের। বেশ কিছু সময় আমাকে নিয়ে রিক্সায় ঘুরলো। এদিক সেদিক বাদাম, ফুচকা খাওয়া হলো। টুকটাক গল্প গুজবও চললো। মিথ্যে বলার তেমন অভ্যাস আমার নেই । তাই বৃষ্টির কথামত নিজের নামটা আড়াল করতে গিয়েও কখন যেন মনের অজান্তে সত্যি নামটা বলে দিয়েছি।

যখন আমি ওর কাছ থেকে বিদায় নেবো তখন ওর চোখ দুটো টলমল করে উঠলো। আহারে বেচারা! আমার মনের মধ্যে কেমন একটা তোলপাড় শুরু হলো ওর চোখ দেখে। রাতে বাসায় গিয়ে বৃষ্টিকে আর কিছু বলা হলো না। কারন ১০২ ডিগ্রী জ্বর নিয়ে বৃষ্টি তখন হাসপাতালে ভর্তি।

দুদিন পর কলেজ থেকে বের হতেই দেখি রিপ্পি দাড়িয়ে অপেক্ষা করছে। আমাকে দেখে কাছে এসে লাজুক ভঙ্গিতে বলল, “ইয়ে মানে, তোমাকে না বলে আসতে চাইনি। কিন্তু তোমাকে দেখার জন্য মনটা কেমন করছিলো, তাই চলে এলাম।”

বৃষ্টি আস্তে আস্তে আরো অসুস্থ হয়ে পড়লো। পক্স থেকে ম্যালেরিয়া। দিন দিন খুব মরমরা হয়ে যাচ্ছিলো ও। ছাদের চিলেকোঠায় সারাদির দরজা বন্ধ করে শুয়ে থাকে। কারও সাথে কোনো কথা বলে না।

এদিকে রিপ্পি প্রায়ই আমার সাথে দেখা করতে আসে। একসাথে কফিশপে কিছুক্ষণ সময় কাটাই। বৃষ্টি সুস্থ না হওয়া অব্দি এটাই হয়ত আমার মহান দায়িত্ব। আর সত্যি বলতে আমার মাঝেও একটা অন্যরকম ভালো লাগা শুরু হলো। বারবারই মনে হচ্ছিলো, যাক না এভাবে কয়েকটা দিন, মন্দ কি!

সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। কলেজ থেকে বের হয়ে দেখি রিপ্পি ছাতা নিয়ে দাড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই দৌড়ে কাছে এসে আমার হাত ধরে বলল, “চলো তো।”

-কোথায়?”

-রিক্সায় ঘুরবো।”

আমারও মন হয়ত এমন কিছুই চাইছিল বলে আর নিষেধ করতে পারলাম না। রিক্সার হুড উঠিয়ে সামনে পর্দা দিয়ে দুজন বৃষ্টিতে রিক্সায় ঘুরছি। দুজনই চুপচাপ। এক সময় নিরবতা ভেঙে রিপ্পি বলল, “এই, তোমার হাতটা দাও তো।”

আমি চমকে উঠলাম।

-কেন?”

-এতো ভয় পাচ্ছো কেন? দাও।”

কিছুটা জড়তা নিয়ে আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম। রিপ্পি আমার হাতে একটা ব্রেসলেট পড়িয়ে দিয়ে বলল, “তোমাকে হারাতে চাই না।”

আমার বুকের ভিতরটা ধড়াস করে উঠলো। চোখ টলমল করছে। চোখ থেকে আর একটু হলেই পানি গড়িয়ে পড়বে, ঠিক এই সময় রিপ্পি রিক্সার হুড ফেলে দিলো। বৃষ্টিতে ভিজে দুজন একাকার।

-হুড ফেললে কেন?”

রিপ্পি চিৎকার করে বলল, “কারন বৃষ্টিকে বলতে চাই, আমি মেঘকে ভালোবসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি।”

-পাগল নাকি? এভাবে রাস্তায় বসে চিৎকার করছো, লোকে কি বলবে?”

-লোকে বলবে ছেলেটা বউ পাগল?”

-বউ?”

-হ্যা, তোমাকে আমার অর্ধাঙ্গীনি ভাবি মেঘ।

সেদিন রিপ্পি বুঝতে পারলো না যে আমার গাল বেয়ে শুধু বৃষ্টির পানি না, বরং চোখের পানিও ঝরছে।

ভেজা অবস্থায় বাসায় এসে দেখি বৃষ্টি আমাদের যৌথ খাটে ঘুমিয়ে আছে। শব্দ না করে আস্তে করে ড্রয়ার থেকে কাপড় বের করলাম। চোখ বন্ধ রেখেই বৃষ্টি বলল, “আজ রিপ্পির সাথে দেখা করেছিস, তাই না?” আমার বুকের মধ্যে দপ করে উঠলো। ইতস্তত করে বললাম, “না মানে রিপ্পি নিজেই চলে আসলো তাই……” কথা বলতে গিয়ে যেন জড়িয়ে যাচ্ছিল আমার। কী এক অপরাধবোধ কাজ করছে মনের ভেতর। কাপড় বদলে এসে দেখি বৃষ্টি তার নিজের খাটে গিয়ে ঘুমাচ্ছে। আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে ঘুম ভেঙে দেখি আমার বালিশের পাশে একটা কাগজ রাখা। অজানা এক আশঙ্কায় বুকটা দুরুদুরু করছে। কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠিটা নিলাম।

“আমি জানি, তুই প্রতিদিন মনের সাথে যুদ্ধ করে চলেছিস এবং অবশেষে সেই যুদ্ধে তোর মন জিতে গিয়েছে। তোরা বিয়ে করে আমার চোখের সামেন ঘুরলে আমি সহ্য করতে পারবো না। তাই চলে যাচ্ছি। যেদিন রিপ্পিকে আমি মন থেকে সরাতে পারবো, সেদিন আবার ফিরে আসবো। কারন সেদিন তোদের দেখে আমার আর ঈর্ষা হবে না।

আমি ঠিক একদিন ফিরে আসবো।

ইতি

বৃষ্টি।

আকাশে অনেক মেঘ। যেকোন সময় বৃষ্টি নামবে। আমি ব্যালকনির গ্রীল ধরে আকাশটা দেখছি। ‍পিছন থেকে কেউ আমার শাড়ির আঁচল ধরে টান দিলো। ঘুরে দেখি বর্ষণ আঁচল ধরে আছে।

-মামনি”

-কী মামনিটা?”

-তুমি না বলো আমার মত আরও একটা পরী আছে?”

-হ্যা মামনি”

-সেই পরীটা আসবে কবে?”

-আসবে মামনি। দেখবে তোমার কোনও এক জন্মদিনে পরীটা এসে হাজির হবে।”

ও, আপনাদের তো বলা হয়নি, আমার আর রিপ্পির পাঁচ বছরের সংসার। বর্ষণ আমাদের চার বছরের মেয়ে। ওর কপালের ডান দিকে ঠিক বৃষ্টির মতই একটা জট রয়েছে। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, আমার এই পুচকে মেয়েটা এখনই তার মাথার সামনের দিকের চুল দিয়ে জটটা ঢেকে রাখে। ওকে যতবার দেখি ততবারই যেন বৃষ্টিকে দেখতে পাই। বৃষ্টির কথা ভাবতেই চোখ থেকে কখন যেন টপটপ করে বৃষ্টি ঝরা শুরু করলো বুঝতেই পারিনি। রিপ্পি আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল, “কেন নিজেকে এতো অপরাধী ভাবো তুমি? দেখবে, বৃষ্টি একদিন ঠিকই ফিরে আসবে।”

রিপ্পির কাঁধে আমার মাথা, আর দৃষ্টি আকাশের দিকে। ঘন কালো মেঘ জমে আছে আকাশে। মেঘগুলো যেন বৃষ্টির জন্যই অপেক্ষা করছে। দূর আকাশে মেঘের কাছে কত বৃষ্টি আসে, আমার বৃষ্টি কেন আজও এলো না? ঐ দূর আকাশের মেঘের মতই আমিও আমার বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকবো শেষ অব্দি। (সমাপ্ত)