৩০টি ডিম থেকেই কোটি টাকার খামার!

ভিনদেশী পাখি হলেও বাংলাদেশের বহু গ্রামের মতো কর্ণফুলীতেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে টার্কি পালন। খাবার হিসেবে মাংসের চাহিদা বাড়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে এই ভিনদেশী পাখির বাণিজ্যিক খামার। গৃহপালিত পাখির মধ্যে টার্কি আমাদের দেশে এখন ব্যাপক সম্ভাবনাময়। কারণ টার্কি পালনে তুলনামূলক লাভ অনেকটা বেশি। ফলে খামারের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অনেকেই স্বনির্ভর হয়ে উঠছেন।এমনি এক প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার ইছানগরের ‘ডিভাইন এগ্রো খামার’। মূলত এটি ফোর এইচ গ্রুপের একটি খামার প্রকল্প। ২০০৫ সালের দিকে টার্কি পালনের শখে প্রতিষ্ঠানের এমডি গাঁওহার সিরাজ জামিল নগরীর পতেঙ্গা থেকে ৩০টি টার্কির ডিম নিয়ে শুরু করেন এই খামার। পরে ইনকিউবিটর মেশিনের সাহায্যে ওই ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানো হয়। এরপরই শুরু হয় টার্কি লালন-পালন, সঙ্গে নানা ধরনের প্রাণি। বর্তমানে এই খামারে রয়েছে প্রায় বিভিন্ন জাতের ১৪শ টার্কি, তিতির, সিল্কি মুরগি, সোনালী, কাদারনাত, রাজহাঁস, কোয়েল পাখি, কবুতর, ফাইটার মুরগিসহ দেশি প্রজাতির বহু রঙের মোরগ-মুরগি।

তবে, ২০০৬ সালে বর্তমান সময়ের এই ডিভাইন এগ্রো ফার্মটি শুরু হয়েছিল কর্ণফুলী ডেইরি ফার্ম নামে। এর পরের বছরে কর্ণফুলী ডেইরি ফার্ম এন্ড পোলট্রি ফার্ম নামে এটি পরিচিত ছিল। বর্তমানে সাড়ে আট একর জমি জুড়ে এর বিশাল খামার বাড়ি। এছাড়া ধীরে ধীরে লাখ টাকা ছাড়িয়ে এখন কোটি টাকার ব্যবসায় পরিণত হয়েছে এই খামারটি।যদিও স্থানীয়ভাবে সবাই জানে ফোর এইচ গ্রুপে টার্কি পালন হয় শুধুমাত্র শখের বশে। কিন্তু এখন আর শখ নয়। পুরাপুরি এটি একটি পূর্ণাঙ্গ খামারে পরিণত হয়েছে। শুরুতে কেনা হয়েছিল শুধুমাত্র টার্কি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই খামারে এখন যুক্ত হয়েছে মাছ, মুরগিসহ দেশি-বিদেশি ছোট-বড় সাইজের প্রায় ৯০টি গরু। যার মধ্যে ৩৭টি দুগ্ধজাত গরু।সরেজমিনে এই খামার পরিদর্শনে গেলে কথা হয় ২০০৮ সালে খামারে যোগদান করা কর্মী নুরুন্নবী ফরায়েজীর সঙ্গে। তিনি জানান, ‘বর্তমানে প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে টার্কি কিনতে আসেন শৌখিন সব ক্রেতারা। তাদের কাছে দাম যা-ই হোক, টার্কি পাওয়া গেছে এটাই বড় বিষয়।টার্কি পালন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘একটানা ২২টি পর্যন্ত ডিম দেয় টার্কি। পরবর্তীতে মেশিনে ডিম রাখার ২৮ দিন পর ফুটে এর বাচ্চা। আর হ্যাচারি মেশিনে দৈনিক ৫০টি বাচ্চা উৎপাদন করা হয় এ খামারটিতে।’দানাদার খাদ্য ছাড়াও টার্কি কলমি শাক, বাঁধাকপি ও সবজি-জাতীয় খাবার খায়। চার মাস পর থেকে প্রতিটি টার্কি খাওয়ার উপযোগী হয়। ছয় মাসে এ পাখির ওজন হয় প্রায় ছয় থেকে সাত কেজি। ঠিকভাবে লালন-পালন করা গেলে টার্কির ওজন প্রায় ৩০ কেজি পর্যন্তও হয়ে থাকে।এই খামারে প্রতি কেজি টার্কির মাংস ৩শ টাকা। আর দুগ্ধজাত গাভির দুধ বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৬৫ টাকা দরে। এছাড়া টার্কির দেড় মাস বয়সী বাচ্চা জোড়া হিসেবে বিক্রি করা হয় ৫শ টাকায় এবং ১৫ দিন বয়সী বাচ্চার জোড়া প্রতি মূল্য ৪শ থেকে ৪৫০ টাকা।এ দিকে, কৃষিবিদরা জানিয়েছেন, মুক্ত অবস্থায় বা খাঁচায় উভয় পদ্ধতিতে টার্কি পালন করা যায়। মানসম্মত পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করলে এর মাংস ও ডিমের উৎপাদন বাড়ে। একটি মেয়ে টার্কির ওজন সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় কেজি আর পুরুষ টার্কির ওজন হয় আট থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত।টার্কির প্রথম উৎপত্তিস্থল উত্তর আমেরিকা। ১৭০০ সালে যুক্তরাজ্যে ক্রস ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে এ পাখির নতুন জাত উৎপাদন করা হয়। ইউরোপসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই বর্তমানে এই পাখি পালন করা হচ্ছে। টার্কির স্বাদ অনেকটা খাসির মাংসের মতো। এর মাংসে রয়েছে অধিক পরিমাণে প্রোটিন। চর্বি কম থাকায় এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।নিয়মিত এ মাংস খেলে কোলেস্টেরল কমে যায়। টার্কির মাংসে এমাইনো এসিড ও ট্রিপ্টোফ্যান অধিক পরিমাণে থাকায় এর মাংস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে টার্কি মুরগি পালন দিনে দিনে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। একটুখানি সচেতনতা, সরকারি গবেষণা এবং ক্রেতা-বিক্রেতার পারস্পরিক অংশগ্রহণে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যম এই টার্কি পালনই হয়ে উঠতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি মাধ্যম।টার্কি পালনের ব্যাপারে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কামাল উদ্দীন জানান, ‘টার্কি এখনো মুরগি হিসেবে স্বীকৃত নয়। এটি মূলত নিরীহ প্রকৃতির পাখি। এই পাখির রোগব্যাধি কম হওয়ায় এটি পালনে স্বল্প খরচে এবং কম সময়েই ভালো লাভবান হওয়া যায়।’