শেখ হাসিনা মানবিকতার আত্মোৎসর্গী প্রাণ!

সোহেল সানি :

জাতির জনককন্যা শেখ হাসিনা মানবিকতার প্রশ্নে সত্যিই প্রচণ্ড রকমের আত্মোৎসর্গী প্রাণ। “ভালবাসা পেতে হলে ভালবাসতে হয়”- পিতার ওমন অমোঘ মন্ত্রের মধ্যেই যেন শেখ হাসিনার বেড়ে ওঠা।

গতকাল তাকে দেখে এবং তার সুদৃষ্টিসম্পন্ন মনুষ্যবোধের দেখা পেলাম আবারও। অনেক দিন পরে। আহত  সাংবাদিকদের মধ্যে আর্থিক সহায়তাদানে চেক বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিলো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। ঘড়ির কাঁটা যখন সকাল দশটা ছুঁইছুঁই। প্রধানমন্ত্রী এলেন। সাংবাদিকদের কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে ব্যাখ্যা করলেন। বক্তব্যে যোগ করলেন বিরাজমান পরিস্থিতির কিঞ্চিত। আহত সাংবাদিক হিসাবে আমারও উপস্থিতি ঘটলো। তারপর ছোট্টপরিসরের পূরবী হল কক্ষের সভামঞ্চ ত্যাগ করে নিজ নিজ আসনে উপবিষ্ট সাংবাদিকদের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন। আহত সাংবাদিকদের একেক করে ক্রমানুসারে নাম ঘোষিত হলো।
প্রধানমন্ত্রী তুলে দিতে শুরু করলেন।
আমার নামও ঘোষিত হলে লাঠি ভর করে হাঁটিহাঁটি পা করে যেন অগ্রসর হচ্ছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন আগ বাড়িয়ে আমাকে প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি দাঁড় করালেন। অদূর হতেই মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রীর চোখ পড়ে ছিলো আমার ওপর। বিস্ময়ভরা চোখ আর দরদীকন্ঠে শুনলাম তিনি জানতে চাইলেন- “সানি কি অবস্থা তোমার?”
শরীরের কোথায় এখন সমস্যা? প্রধানমন্ত্রীর এমন জিজ্ঞাসায় আমিও অনেকটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম। কোন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছ? আমি শমরিতা ও সেন্ট্রাল হাসপাতালের কথা বলতেই বললেন, ভালো হচ্ছে না কেনো? আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আমার বাম পায়ের প্যাটেলাটি রড দিয়ে কৃত্রিমভাবে স্থাপন করা হয়েছে। চারবার অপারেশন হলেও প্রতীকার পাচ্ছি না। ঠিক এই মূহুর্তে প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপবিষ্ট সাংবাদিক নেতা বিএফইউজের মহাসচিব শাবান মাহমুদ দাঁড়িয়ে বললেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সোহেল সানিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো প্রয়োজন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী হাস্যরসে বললেন, অসুস্থ হলেই তো তোমরা সবাই বিদেশের চিকিৎসা চাও। মূহুর্তে বকলেন, তুমি পঙ্গুতে গেলে না কেনো? বললাম ওখানেই প্রথম চিকিৎসা গ্রহণ করেছি। আচ্ছা আমি দেখবো বললেন তিনি। এবার তিনি জানতে চাইলেন চাকুরি করছি কিনা? অসুস্থতা নিয়ে অফিস কষ্টসাধ্য তাই বাংলাদেশ প্রতিদিন ছেড়েছি – এমনিতে লিখি। তবে আমি ভালো নেই। আপনি তো  সুযোগ দিয়েছিলেন আমি ব্যর্থ হয়েছি। কিভাবে চলি যখন জানতে চাইলেন তখন বললাম আমাদের খালিদ মাহমুদ চৌধুরী (নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী) অনেকটা আমাকে টিকিয়ে রেখেছে। আর আমার দোস্ত শাবান মাহমুদ তো আছেই। মনে হলো এ কথায় তিনি খুশী হয়েছেন। আমার পা একটু পিছলে যাচ্ছিলো। তখন আমাকে প্রীতিমুগ্ধ তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ আমাকে ধরে ঠিক রাখলেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী বললেন, ঠিক আছে যাও দেখি কি করা যায়।
কিচ্ছুক্ষণ পরেই অনুষ্ঠান শেষ। প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে আলাদা একটু সময় বসলেন। কিছু বিষয় নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন, বিএফইউজে সভাপতি মোল্লা জালাল, মহাসচিব শাবান মাহমুদ ও ডিইউজে সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরী কথা বললেন। প্রধানমন্ত্রী চলে যাচ্ছিলেন আমরা অনেকেই দাঁড়িয়ে, যা ভাবিনি তাই ঘটে গেলো। প্রধানমন্ত্রী আমার দিকে অঙ্গুলি প্রদর্শন করে বলেন, তুমি আমার বরাবরে একটা দরখাস্ত নিয়ে সোমবার আসো। তোমার আগে তো চিকিৎসাটা হওয়া দরকার। আমি বিস্মিত হলাম না এই ভেবে যে, পিতা বঙ্গবন্ধুর মতোই তিনি আবেগপ্রবণ হবেন সেটাই তো স্বাভাবিক। তার কারিশমা হচ্ছে তিনি জন্মগতভাবেই অকৃত্রিম। বিচারবোধসম্পন্ন গভীর চিন্তাশীল শাসক হিসাবে উৎকর্ষ অর্জনই যার উদ্দেশ্য তিনি তো এমন হবেনই। সত্যিই শেখ হাসিনা প্রকৃতিসৃষ্ট এক নেতা।

উল্লেখ্য, আমি বহুল বিতর্কিত ওয়ান ইলেভেনের দিনই রাত সাড়ে ১২টায় মালিবাগ থেকে মুখোশধারী দুস্কৃতিকারীরা আমাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে মৃতপ্রায় অবস্থায় শাহজানপুরের একটি ডাষ্টবিনে ফেলে যায়। পরে পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। সেই থেকে আজও আমি অসুস্থ। লাঠি ভর করে পথ চলি।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।