শোক-স্তব্ধ ক্রীড়াঙ্গন

ভেতরে ভেতরে চলছিল বছর খানেক ধরে। বোমা ফাটল ঠিক ভারত সফরের আগে। ম্যাচ পাতানোর প্রস্তাব পাওয়ার পর তা আইসিসিকে না জানানোয় দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছেন সাকিব আল হাসান। বড়সড় ধাক্কায় শোক-স্তব্ধ ক্রিকেটাঙ্গন।

অনেকে বিস্মিত, অনেকে বেদনাহত। কেউ কেউ আহাজারি করছেন সাকিবের বোকামি নিয়েও। তবে বাংলাদেশের জার্সিতে ৩৬টি ম্যাচে দেখা যাবে না সাকিবকে। যা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে ভক্তদের।

ফলে আইসিসির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মাগুরাসহ দেশের অনেক জায়গায় পালিত হয়েছে প্রতিবাদ কর্মসূচি। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনও বাদ যাচ্ছেন না এই ইস্যুতে। প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বিসিবি প্রেসিডেন্টের পদত্যাগও দাবি করা হয়েছে।

গোটা দেশে যেন সাকিব মাতম চলছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কারো কারো মতে, শাস্তি কম হয়েছে সাকিবের। এদের মধ্যে রয়েছেন মাইকেল ভন, স্কট স্টাইরিশরা। আবার সাকিবের এত বেশি শাস্তিতে বিস্মিত হয়েছেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড়।

তবে সাকিবের সতীর্থরা এমন ঘটনায় রীতিমতো বাকরুদ্ধ। পাশাপাশি ভীষণ আবেগও ছুয়ে যাচ্ছে সবার হূদয়।

বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা যেমন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘দীর্ঘ ১৩ বছরের সহযোদ্ধার আজকের ঘটনায় নিশ্চিতভাবেই কিছু বিনিদ্র রাত কাটবে আমার। তবে কিছুদিন পর এটা ভেবেও শান্তিতে ঘুমাতে

 পারব যে, তার নেতৃত্বেই ২০২৩ সালে আমরা বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলব। কারণ নামটি তো সাকিব আল হাসান…!!!।’

গতকাল ভারতের উদ্দেশে দেশ ছেড়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। সাকিবের অবর্তমানে টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহর কণ্ঠেও নিরন্তর ভালোবাসার আবহ, ‘সবাই ওর জন্য ব্যথিত। জানি সে আমাদের দলের জন্য, দেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সে একটা ভুল করেছে, অপরাধ করেনি। ওর প্রতি আমাদের সমর্থন থাকবে। তাকে আগের মতোই ভালোবাসব।’ মুশফিকের মতে, ‘সাকিবের বিকল্প নেই। অবশ্যই তাকে মিস করব। সে আমাদের নাম্বার ওয়ান খেলোয়াড়। আমরা দোয়া চাই। শুধু দলের জন্য নয়, সাকিবের জন্যও। আমরা ওর পাশে আছি।’

সাকিবের নিষেধাজ্ঞার পেছনে বিসিবির হাত রয়েছে। এমন গুঞ্জন আমজনতার মধ্যে। যদিও তার খুব একটা ভিত্তি নেই। তবে একটি বিষয়ে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনকে একহাত নিয়েছেন ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী। তার প্রশ্ন বিসিবির ভূমিকা নিয়ে। পাপন এসব বিষয় আগে থেকেই জানতেন। যদিও পাপন তা অস্বীকার করেছেন। পাপনের মতে, সব কার্যক্রম হয়েছে আইসিসির আকসু ও সাকিবের মধ্যে।

কিন্তু সাবের হোসেন টুইটারে লিখেছেন, ‘আমি মনে করি, বিসিবি সবই জানত। দুঃখের সঙ্গে বলছি, পাপন যখন বলছেন, তার কোনো ধারণা ছিল না, তিনি সত্য বলছেন না। ২২ অক্টোবরের সংযুক্ত ভিডিও ক্লিপ দেখে মনে হচ্ছে, পাপন অধৈর্য হয়ে আইসিসির (ঘোষণার) জন্য অপেক্ষা করছেন।

আরো এক টুইটে তিনি ক্ষোভ ঝেড়েছেন দেশের ক্রিকেট বোর্ডের ওপর। বিসিবির একটি টুইট শেয়ার করে তিনি বোর্ডের আচরণকে ভণ্ডামি ও দ্বিমুখী বলে মন্তব্য করেছেন। সাবের হোসেন চৌধুরীর তৃতীয় টুইটেও ছিল বিসিবির কড়া সমালোচনা।

তিনি লিখেছেন, বিসিবির উচিত ছিল (সাকিবের) শাস্তির মেয়াদ কমানোর চেষ্টা করা। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এ বিষয়ে সাকিবের পাশে দাঁড়ায়নি, এখন আবার মায়াকান্না করছে।’

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলেও চলছে সাকিবকে নিয়ে কথাবার্তা। ইংল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার মাইকেল ভন বলেছেন, ‘সাকিব আল হাসানের জন্য কোনো দয়া দেখানোর সুযোগ নেই। সে যেই হোক। বর্তমান সময়ের খেলোয়াড়দের সব সময়ই জানানো হয় যে, তারা কী করতে পারবে আর কী করতে পারবে না। কোনো বিষয়ে সরাসরি রিপোর্ট করতে হবে, সেটাও বলে দেওয়া হয়। দুই বছর একেবারেই যথেষ্ট নয়। অবশ্যই আরো লম্বা শাস্তি প্রয়োজন ছিল।’

নিউজিল্যান্ডের সাবেক অলরাউন্ডার স্কট স্টাইরিসও ভনের সুরে বলেছেন, ‘এক বছর কমিয়ে দেওয়া হলো? কেন? কমপক্ষে দুই বছরের জন্য বিদায় বলা দরকার ছিল।’ পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার রমিজ রাজা সাকিবকে কিঞ্চিৎ খোঁচার সুরে বলেন, ‘সাকিব আল হাসানের এই নিষেধাজ্ঞা ক্রীড়াপ্রেমী এবং খেলোয়াড় সবার জন্য একটা শিক্ষা।’

ভারতের ক্রীড়া বিশ্লেষক হার্শা ভোগলে সাকিবের আচরণে হতভম্ব যেমন হয়েছেন আবার তাকে সৌভাগ্যবান বলে দাবি করেন।

শীঘ্রই আবার মাঠে সাকিবকে দেখতে পাবেন সে আশা রেখে তিনি বলেন, ‘তিন-তিনবার প্রস্তাব পেয়েও সাকিব গোপন রেখেছে যা সত্যিই আশ্চর্যজনক। তবে আমি তাকে সৌভাগ্যবানই বলব। কারণ, তার এক বছরের শাস্তি স্থগিত করা হয়েছে। তবে আমি তার খেলা সব সময়ই উপভোগ করেছি।’

রাহুল দ্রাবিড় কথা বলেছেন অবশ্য সাকিবের হয়েই, ‘অবিশ্বাস্য! সাকিবের শাস্তিটা বেশি কঠোর হয়ে গেল না? সে কি ম্যাচ ফিক্সিংয়ে জড়িত ছিল? আমার মনে হয়, তার অপরাধ হলো আইসিসি এবং আকসুকে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব সম্পর্কে জানায়নি। এজন্য দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা একটু বেশিই কঠিন হয়ে গেছে। আশা করি আইসিসি তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে।’

শ্রীলঙ্কার সাবেক ব্যাটসম্যান রাসেল আর্নল্ড মনে করেন আইসিসির উচিত ফিক্সার্সকে খুঁজে বের করা। তিনি বলেন, ‘প্রস্তাব না জানানোতে সাকিবের মতো আরেকজন খেলোয়াড় শাস্তির মুখে পড়েছে।’

দায় স্বীকার করায় আপিলের সুযোগ নেই সাকিবের। তার মানে একটি বছর মাঠের বাইরে থাকতে হবে। সাকিবকে সব ধরনের সাপোর্ট দিতে প্রস্তুত বিসিবি। নিষিদ্ধ হলেও সাকিবকে ফিটনেস ধরে রাখার জন্য ট্রেনিংয়ের সুযোগ দেবে বিসিবি। আর সেটা অবশ্যই ব্যক্তিগতভাবে।
বিসিবির মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুস বলেছেন, ‘ট্রেনিংয়ের সুযোগ দেওয়া বিসিবির ব্যাপার বলেই আমরা জানি। তো সেই সুযোগ আমরা সাকিবকে দেব। অবশ্যই কোনো দলের সঙ্গে অনুশীলন করতে পারবে না, এখানে আইসিসির নিষেধ আছে। কিন্তু আলাদা করে ট্রেনিং করার সুযোগ সে পাবে। আমরা চাই সে নিজেকে প্রস্তত রাখুক। এক বছর পর যখন নিষেধাজ্ঞা শেষ হবে, তখন যেন সে প্রস্তুত থাকে মাঠে নামতে।’

সাকিব সাহসী। তিনি তো নিজেই ওয়ানম্যান আর্মি। ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপের দিকে তাকালে তা স্পষ্ট হয়। আর তাই সবার প্রত্যাশা সাকিব ফিরবেন আরো শক্তিমান হয়ে। আরেকবার নাম্বার ওয়ান হয়ে, অনেক বেশি পরিণত ও পরিশুদ্ধ হয়ে।