ক্রিকেটামোদী জাতি বিস্মিত

হঠাৎই দেশীয় ক্রিকেট অঙ্গনে উত্তেজনা, যা আমাদের ক্রিকেটামোদী জাতিকে অনেকটা বিস্মিত করেছে। কথা নেই, কোনো বার্তা টের পেলাম না। কী এমন সংকট সৃষ্টি হলো যে, আমাদের ক্রিকেটাররা ধর্মঘটে যেতে বাধ্য হলেন। অনিশ্চিত এখন ভারত সফর। তবু আশা করব, সব সমস্যার সমাধান অচিরেই ঘটবে। আমাদের ক্রিকেটের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অন্ধকার থেকে আলোর সূর্যে হেসে উঠুক, এই কামনা।

এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট যেহেতু একটি দেশের জাতীয় দলভিত্তিক খেলার মাধ্যমেই প্রচলন শুরু হয়েছে, সে হিসেবে নিজ দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা যে কোনো ক্রিকেটারেরই স্বপ্ন থাকে। এ স্বপ্ন পূরণ করেছেন হাজার হাজার ক্রিকেটার; আবার জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন পূরণ না করেই বহু ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার থেমে গেছে। যাদের মধ্যে অনেকেই আছেন দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলেছেন জাতীয় দলের বাইরে। আবার বহু ক্রিকেটার আছেন যারা জাতীয় দলে খেলার সুযোগ করে নিলেও ভালো খেলতে না পারায় জাতীয় দলের হয়ে ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করতে পারেননি।

ক্রিকেটে ভালো খেলা দেশগুলোতে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ক্রিকেট লিগ হয় নিয়মিত। যেখানে খেলছে দেশ-বিদেশের বহু ক্রিকেটার। উইন্ডিজ, আফগানিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, আফ্রিকাসহ আরো কয়েক দেশের বহু ক্রিকেটার জাতীয় দলে খেলার আগেই বিদেশি লিগ খেলে অর্থকড়ি কিংবা জনপ্রিয়তা অর্জন করে পরে জাতীয় দলে খেলাসহ সারা বিশ্ব দাপিয়ে বেড়ায় ক্রিকেট খেলার মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বেলাতেই পরিস্থিতি ভিন্ন। ক্রিকেট সহজলভ্য হওয়ার যুগেও বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ধ্যান-ধারণা পড়ে আছে এখনো টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট আবির্ভাবের আগে তথা শুধু জাতীয় দলকে ঘিরেই। এর ফলে একজন ক্রিকেটার জাতীয় দলে সুযোগ করে নিয়ে বাদ পড়ে গেলে পুনরায় ফিরে আসতে না পারলেই ক্যারিয়ারের শেষ দেখে ফেলেন। ৩০ বছর বয়সের আগেই ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়া ক্রিকেটারের সংখ্যাই বাংলাদেশে বেশি।

পেশাদার ক্রিকেট খেলাটাই মুখ্য বিষয়। নিজ দেশের হয়ে, নাকি ভিনদেশি লিগে, নাকি শুধুই দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে, তা বড় ব্যাপার নয়। কিন্তু বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের চিন্তা শুধু জাতীয় দলকে ঘিরে হওয়ার কারণে একসময় যখন মনে হয় জাতীয় দলে আর ডাক পাওয়া হবে না, তখনই তারা বিদায় নেন ক্রিকেট থেকে। ২০১০ সালের মধ্যে বা তার পরে অভিষেক হওয়া বহু ক্রিকেটার ছেড়ে দিয়েছেন ক্রিকেটাঙ্গন। মূল কারণ জাতীয় দলে আর সুযোগ পাওয়া হবে না, এই ভাবনায় অনুশীলন ছেড়ে দেওয়া, এক কথায় অলসতা ও সুদূরপ্রসারী ভাবনা না থাকাই এর বড় দুর্বলতা। যদিও ২০১০ সালের আগে অভিষেক হওয়া বহু ক্রিকেটারও আজো খেলে চলেছেন। হতাশ না হয়ে নিজেদের ফিট রেখে নিয়মিত পারফর্ম করে যাওয়া ক্রিকেটারও কম নন, যাদের মধ্যে জুনায়েদ সিদ্দিকী, মোহাম্মদ আশরাফুল, শাহরিয়ার নাফীজ, নাইম ইসলাম, ফরহাদ রেজা, জিয়াউর রহমান, এনামুল হক জুনিয়র, অলক কাপালি, শাহাদাত হোসাইনসহ আরো ক্রিকেটারের নাম করা যাবে; যারা সর্বশেষ পাঁচ বছর ধরে জাতীয় দলে না থাকলেও ঘরোয়া ক্রিকেটের অন্যতম সেরা পারফর্মার তারা। জাতীয় দলে সুযোগ না পাওয়া নাবিল সামাদ, ফরহাদ হোসেন, মনির হোসেনসহ আরো বহু ক্রিকেটার আছেন, যারা জাতীয় দলে না খেলেও ঘরোয়া ক্রিকেটের দুর্দান্ত পারফর্মার হিসেবে খেলছেন নিয়মিত, যার মাধ্যমে পেশাদারিত্বের স্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ কম। ভিনদেশি লিগে শুধু সাকিব আল হাসানই দাপটের সঙ্গে খেলছেন। সেই সঙ্গে মোস্তাফিজ, তামিম, রিয়াদ, মুশফিক, আশরাফুল, মাশরাফি, লিটন দাশসহ হাতেগোনা কিছু ক্রিকেটার অনিয়মিত খেলছেন, তবে এ সংখ্যাটা খুবই নগণ্য। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স ভালো নয়, এটি একটি বড় কারণ হলেও আরো একটি কারণ হলো বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের স্বপ্নটা এখনো শুধু জাতীয় দলকে ঘিরেই রয়েছে। জাতীয় দলে খেলতে না পারলে আশাহত হয়ে হাল ছেড়ে দেওয়া, এটি পেশাদার ক্রিকেটারদের কাজ নয়। পেশাদার ক্রিকেটে খেলাটাই আসল, আইসিসি ও সংশ্লিষ্ট বোর্ডের অনুমোদিত ক্রিকেটে যেখানে খেলে টাকা পাওয়া যায়, সেখানে খেলার চেষ্টাটাই পেশাদার ক্রিকেটে শেষ কথা। যেখানেই হোক, পারফর্ম করলেই সুযোগ আসবে, যারা সেভাবে এগোতে পেরেছে তারাই সফল হয়েছে। উইন্ডিজ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলা জোফরা আর্চার নিজ দেশের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের দলে সুযোগ না পেয়ে ইংল্যান্ডের কাউন্টিতে খেলতে গেছেন শুধু ক্যারিয়ারের কথা ভেবে। তার বাজিতে তিনি সফল, কাউন্টিতে আলো ছড়ানো পারফর্ম করে জায়গা করে নিয়েছেন ইংল্যান্ডের জাতীয় দলে এবং ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য তিনি।

আমাদের জাতীয় দলের হয়ে সর্বশেষ ২০১৪ সালে খেলা ফরহাদ রেজাও হাল ছেড়ে দেননি। জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন বাদ দিয়ে শুধু পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে যেখানে সুযোগ পেয়েছেন, পারফর্ম করেছেন। বিগত বছরগুলোতে ঘরোয়া ক্রিকেটের অন্যতম সেরা পারফর্মার ফরহাদ রেজা; ফলাফলও পেয়েছেন দীর্ঘ পাঁচ বছর পর জাতীয় দলে ফিরে ম্যাচ খেলার সুযোগ না পেলেও ভাবনায় আছেন এবং প্রথমবারের মতো আলোচিত টি-টোয়েন্টি লিগে জায়গা করে নিয়েছেন। রেজারও দুই বছর আগে জাতীয় দলে খেলা অর্থাৎ ২০১২ সালে সর্বশেষ জাতীয় দলে খেলা জুনায়েদ সিদ্দিকীও ঘরোয়া ক্রিকেটের অন্যতম সেরা পারফর্মার, তিন ফরম্যাটেই দুর্দান্ত খেলছেন তিনি। সর্বশেষ বিপিএলে ব্যাট হাতে ঝড় তুলে তিনিও জায়গা করে নিয়েছেন টি-টোয়েন্টি লিগে, যার মাধ্যমে জয় হয়েছে পেশাদারিত্বের। টি-টোয়েন্টি লিগে যদি রেজা-জুনায়েদরা খেলতে যান এবং পারফর্ম করতে পারেন, তাহলে ভিনদেশি আরো বহু লিগে জায়গা করে নেবেন তারা, যার মাধ্যমে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের কদর বাড়বে ভিনদেশি লিগে।

জাতীয় দল নয়, পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে স্বীকৃত ক্রিকেটে যেখানে সুযোগ পাওয়া যাবে, সেখানেই খেলতে এবং খেলার সুযোগ করে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে, সে স্বপ্ন নিয়েই খেলতে হবে। এভাবে নিজেকে এগিয়ে নিতে পারলে জাতীয় দলের হয়ে সুযোগ আসবেই। আর পেশাদার ক্রিকেটে জাতীয় দলে ক্যারিয়ার গড়াই শেষ কথা নয়। ক্রিকেট খেলাটাই মুখ্য বিষয়, সেটা মাথায় নিয়েই ক্রিকেটে পা রাখতে হবে তরুণদের।

একইভাবে বলব, পেশাদারিত্ব বজায় রেখে সব দাবি-দাওয়া উত্থাপন করতে হবে। যৌক্তিক পন্থায় আমাদের ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেটারদের আচরণ পরিচালিত হতে হবে। মাথায় রাখতে হবে দেশ ও দশের কথা। আমাদের ক্রিকেটের সাফল্যকে কিছুতেই ম্লান হতে দেওয়া যাবে না। বর্তমান সমস্যা ও সংকট সেই আলোকে বিচার্য হোক, প্রত্যাশা জাতির।

জুবায়ের আহমেদ লেখক : প্রাবন্ধিক