সুখী ও সফল জীবনের সরল সমীকরণ

মানব জীবনে আমাদের সকল কর্মকাণ্ডই সচ্ছলতা, বিলাস এবং আর্থিক অর্জনের জন্য। আমরা মনে করি যত সচ্ছলতা আসবে, ততই সুখ আসবে। আসলে কি তাই? গল্পে সুখী মানুষের খোঁজে ঘুরতে গিয়ে দেখা গেছে, যে লোকটি সবচাইতে সুখী তার গায়ে কোনো জামা নেই। আধুনিক বা ভোগবাদী সমাজে সুখের যে উপকরণ তা হলো বাড়ি, গাড়ি ও ব্যাংক ব্যালান্স। উল্লিখিত উপকরণগুলো যে সুখের যথার্থ উপকরণ নয়, তা আমরা চারিদিকে একটু বিশ্লেষণী দৃষ্টি দিলেই অনুধাবন করতে পারি। সুখ অর্জনের যে আকাঙ্ক্ষা তা প্রত্যেক মানুষেরই থাকা উচিত। তবে সুখ অর্জনের যে সফলতা তা ন্যায় নিষ্ঠা এবং পরার্থপরতার মাধ্যমে অর্জিত হয়। অন্যথায় সুখের উপকরণ জীবনের জন্য ভার বা বোঝা হয়ে জীবনকে হতাশায় নিমজ্জিত করে।
মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত একটি তথ্যে দেখা গেছে, ২০০৫ সালে আমাদের দেশে মানসিক রোগী ছিল ৪% আর ২০১৭-তে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২%। জীবনধারণের সুখের অনুষঙ্গ হিসেবে শুধু টাকাকে প্রথম ও একমাত্র উপাদান বিবেচনা করলে মানসিক রোগের সংখ্যা দিন দিন বাড়তেই থাকবে, এটা বলাই বাহুল্য। একটি পত্রিকার খবরের শিরোনাম ‘যুক্তরাষ্ট্রে রাইফেল কাঁধে নিয়ে স্কুলে ঢুকবেন শিক্ষকেরা’। খবরে প্রকাশ ২০১২ সালে ফ্লোরিডার স্যান্ডি হুক ইলেমেন্টারি স্কুলে এক ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হয় ২০ শিশু। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এমন শিক্ষানীতি চালু করতে যাচ্ছে দেশটি। পৃথিবীর সর্ববৃহত্ অর্থনৈতিক বাজেটের দেশে যেখানে প্রত্যেক বেকারকে ১২০০ ডলার বেকার-ভাতা দেওয়া হয়, সেখানে এমন ঘটনা ঘটার কারণ অনুসন্ধান করে দেখা যায়, এর মূলে রয়েছে আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়।
বিত্ত-বৈভবের মধ্যে লালিত সন্তান কখনোই কোনো দায়িত্ব নিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে না। ফলে অল্পতেই তার মধ্যে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়, সে হয়ে পড়ে বিষণ্ন এবং দিশেহারা। এমন ভবিষ্যত্ প্রজন্ম তৈরি করা বা রেখে যাওয়া কারোই কাম্য নয়। কিন্তু নিজের অজান্তে উপলব্ধির অভাবে আমরা সেটাই করছি। অঢেল বিত্ত-বৈভব মানুষকে সুখের অসুখে আছন্ন করে। কোনো কিছুতেই সে সুখ খুঁজে পায় না। তাকে সুখের পথ খুঁজতে হয় মাদকাসক্তিতে। এমন পরিস্থিতির পরিত্রাণ কেবল সুখ বিতরণের মধ্যে। সুখ বিতরণ বলতে বোঝাতে চাচ্ছি, নিজের সুখ অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া বা অন্যের সুখের অন্বেষণে সহায়তা করা, অন্যের দুঃখ লাঘব করা।
আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে আগত সকল মুনি-ঋষি, মহামানবদের জীবনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তারা মোটেও ভোগবাদী ছিলেন না। অন্যকে সুখ দিতে পারাকেই তারা জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এ কারণে তারা ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো চিরভাস্বর হয়ে আছেন। তারা সকলেই ছিলেন ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত। আর এই ত্যাগের মধ্য দিয়েই তারা জীবনকে অবলোকন করেছেন সার্থকভাবে। পৃথিবীতে বহু বই, বহু মহাকাব্য রচিত হয়েছে ত্যাগের মহিমা নিয়ে।
মানুষ সুখী হতে চায়। কিন্তু সবাই সুখী হতে পারে না। কারণ, তারা ভুলে গেছে সুখী হওয়ার মন্ত্র। অগাধ ধন-সম্পত্তির ভেতরে নিমজ্জিত থেকেও সুখী হতে পারে না অনেকে। যাদের প্রাচুর্য আছে, কিন্তু পরোপকারী মন নেই, কখনও সুখী হতে পারে না তারা। আমরা জানি কীর্তিমানের মৃত্যু নেই। সময় অনন্ত, জীবন সংক্ষিপ্ত। সংক্ষিপ্ত এ জীবনে মানুষ তার মহত্ কাজের মধ্য দিয়ে এ পৃথিবীতে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকে। কীর্তিমানের মৃত্যু হলে তার দেহের ধ্বংস হয় বটে, কিন্তু পৃথিবীর মানুষের কাছে রয়ে যায় তার সত্ কাজ এবং অম্লান কীর্তি। মৃত্যুর শত শত বছর পরেও তাকে মানুষ স্মরণ করে। নতুন প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে হবে এমন কিছু মহত্ কাজ, যেন ওই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেরাও পরের উপকারে আসতে পারে।
স্বার্থপর মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে বেশি হলেও সময়ে-সময়ে ক্ষণজন্মা ব্যক্তি পৃথিবীতে জন্ম নেন, যারা তাঁদের স্বল্পায়ু জীবনের মধ্যে রেখে যান অনেক বড়-বড় কীর্তি। মানুষের দেহ নশ্বর, কিন্তু কর্ম অবিনশ্বর। মহত্ কাজের মাধ্যমে অমরত্ব লাভ করা সম্ভব। পরার্থপরতার চেয়ে ভালো কাজ নেই। পরের জন্য যাঁদের মন-প্রাণ উত্সর্গীকৃত, তারাই চিরঞ্জীব। মানুষ মানুষের জন্য— এ সত্যটি যারা হূদয়ে ধারণ করেন, তারাই মহান। মানব জন্ম শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার জন্য নয়। কেবল নিজের স্বার্থরক্ষাই মানব জীবনের লক্ষ্য নয়। পরস্পর কল্যাণে ও উপকারের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে মানব-সভ্যতা। পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতাই মানব জাতির সমাজ বন্ধনের ভিত্তি। এই পথেই মানুষ পায় বাঁচার আনন্দ, অর্জন করে জীবনের সার্থকতা।
পৃথিবীতে সফল মানুষ দেখলে আমরা ভাবি, আমিও যদি তার মতো হতে পারতাম। আসলে তারা কিন্তু আমাদের মতোই মানুষ কিন্তু তাদের কর্মপন্থা এবং চিন্তায় আমাদের সঙ্গে কিছু পার্থক্য রয়েছে। সেই পার্থক্যগুলোই এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। সফল হওয়ার প্রথম শর্ত হলো, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা। সফল মানুষ তার ভিশন ঠিক করে তা বাস্তবায়নে মিশন পরিচালনা করেন। তিনি জানেন যে, সফল হতে হলে পরিশ্রম করতে হয়। সফলতার কোনো শর্টকাট রাস্তা নেই। বিশ্বখ্যাত ব্যাটসম্যান শচীন টেন্ডুলকার তার শেষ ম্যাচে ১৪ মিনিটের বিদায়ী বক্তব্যের একটি অংশে বলেন, ‘My Father told me that chase your dreams but make sure you don’t find shortcuts, the path might be difficult but don’t give up and I have simply followed his instructions.’ সফল মানুষের আরো একটি গুণাবলি হলো দায়িত্ব নিতে পছন্দ করা। তারা শুধু দায়িত্ব নিয়েই ক্ষান্ত থাকেন না, সূচারুরূপে তা সম্পন্নও করেন। যেকোনো নতুন কিছু শিখতে আগ্রহী থাকা সফলতার আরো একটি বৈশিষ্ট্য। এরা নতুন চিন্তা বা ধারণা নিয়ে কথা বলেন। নিজের অদম্য চেষ্টায় এগিয়ে চলেন। তার এগোনোর পেছনে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা কম থাকে। তিনি অন্যের সফলতায় সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। সময়ের সঙ্গে ইতিবাচক পরিবর্তনকে আলিঙ্গন করেন এবং নেতিবাচক পরিবর্তনকে পরিহার করেন। অন্যের ভালো কর্মকাণ্ডে প্রশংসা করতে দ্বিধা করেন না। এসব গুণাবলির সমন্বয় যার মধ্যে থাকবে তিনিই জীবনে সফল হবেন।
আমাদের সবারই উচিত সন্তান-সন্ততি এবং সমাজের সবাইকে সুখ এবং সফলতার মূলমন্ত্রে দীক্ষিত করা। তাহলেই সমাজ থেকে দূর হবে দুর্নীতি, হতাশা, আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা। সমাজ ভরে উঠবে পরার্থপরতায়। সবার মধ্যে জেগে উঠবে সফলতার শুভ এবং সুন্দর প্রতিযোগিতা ও প্রচেষ্টা— যা জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে সঠিক গন্তব্যে।
n লেখক: অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর