কর্মই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে অনন্য উচ্চতায়

টানা তৃতীয় এবং সব মিলিয়ে চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে রেকর্ড গড়েছেন শেখ হাসিনা। জ্ঞান, মেধা, দক্ষতা ও সাহসিকতার মিশ্রণে দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নের মাধ্যমে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। শত বাধা-বিপত্তি, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপ ও হত্যার হুমকিসহ নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে তিনি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করছেন।

আজ বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেয়েছে। তাঁর আত্মত্যাগের ফলেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। তাঁর শাসনামলের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, যোগাযোগ, কৃষি, খাদ্য, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্যবিমোচন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, অবকাঠামোর উন্নয়ন, পুষ্টি, মাতৃত্ব, শিশুস্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়নসহ এমন কোনো খাত নেই যে খাতে অগ্রগতি সাধিত হয়নি। যা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে প্রশংসিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলেও।

বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ এখন শুধু উন্নয়নের রোল মডেল নয়, একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। কথিত তলাবিহীন ঝুড়ির বাংলাদেশ আজ  প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসার দায়িত্বও নিয়েছে। এ সবকিছুই সম্ভব হয়েছে তাঁর দৃঢ়চেতা ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে। আন্তর্জাতিক ঋণ ছাড়াই নিজস্ব অর্থে ৬.১ কিমি দীর্ঘ পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত তিনিই নিতে পেরেছেন।

আজ সেই সেতু পদ্মার বুকে দৃশ্যমান। মহাকাশে স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু-১’ স্থাপনের ফলে আজ বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক বাংলাদেশ। এছাড়া মেট্রোরেল, এলিভেটেট, কর্ণফুলী ট্যানেল, পায়রা সমুদ্রবন্দর, নদী রক্ষা প্রকল্প, ৬ লেনের ফ্লাইওভার, মহাসড়কের ৪ লেনে রূপান্তর, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, বেশ কয়েকটি সোলার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় সেতু, শেখ হাসিনা আইটি সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, মাতারবাড়িতে ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ইত্যাদির মতো মেগা ও সাহসী প্রকল্পগুলো তাঁরই অবদান।

শিক্ষাক্ষেত্রের উন্নয়নে নিয়েছেন যুগোপযোগী পদক্ষেপ। সব উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল স্থাপন, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে বেতন মওকুফ, উপবৃত্তি প্রদান, প্রাথমিকে দুপুরের খাবার প্রদান, বিনামূল্যে বই বিতরণ, বিদ্যালয়গুলোতে ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া, ইন্টারনেট মডেম ও সাউন্ড সিস্টেম সরবরাহ করা হয়েছে।

চিকিৎসা ব্যবস্থায় উন্নতি সাধনে বহু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, অসংখ্য ডাক্তার নিয়োগ, প্রতিটি ইউনিয়নে কমিউনিটি ক্লিনিক করার ফলে শিশু মৃত্যুর হার কমেছে এবং মানুষের গড় আয়ু বেড়ে ৭৩ বছরে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া বয়স্ক ভাতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম ভাতা, সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, হোম লোন সুবিধা, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা প্রদান, বাড়ি নির্মাণ, চাকরিতে কোটা, ভূমিহীনদের ভূমিদান, অ্যাসিডদগ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন ইত্যাদি শেখ হাসিনারই অবদান। মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় শেখ হাসিনার সরকার সব সময়ই আপসহীন।

২০০৯ সালে তাঁর সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে এবং ইতোমধ্যে শত চাপ ও বাধা সত্ত্বেও অনেক রায়ই কার্যকর করা হয়েছে।

প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে ৭.৮৬%-তে উন্নীত হয়েছে, বেড়েছে রিজার্ভ ব্যাংক ও মাথাপিছু আয়, একনেকে অনুমোদিত হয়েছে অসংখ্য প্রকল্প, বদ্বীপ পরিকল্পনা (ডেল্টা প্ল্যান ২১০০), জাতিসংঘ প্রণীত এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ, ভিশন-২১ ও রূপকল্প-২০৪১সহ অসংখ্য পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে খুব দ্রুতই বাংলাদেশ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ দেশে বিশ্বদরবারে পরিচিতি লাভ করবে। এ ছাড়া বিভিন্ন রকম খেলাধুলায়ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ আজ কয়েক ধাপ এগিয়েছে। ক্রিকেটে সাম্প্রতিককালে যেসব অর্জন তা শুধু তাঁর আন্তরিকতারই প্রতিফল।

অন্যদিকে ছিটমহল সমাধান, পার্বত্য শান্তিচুক্তি, ভারত ও মিয়ানমারের বিপক্ষে সমুদ্র জয়ের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে ২০০ নটিক্যাল মাইল এলাকায় একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপান এলাকার প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি, আমদানি-রপ্তানি চুক্তির মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান তুলনাহীন। এই সব ধারাবাহিক উন্নতির পাশাপাশি তাঁর পরিকল্পনা ও দৃঢ় নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি অর্জন করেছেন বেশকিছু দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পদক, খেতাব ও সম্মাননা।

‘গ্লোবাল উইমেন্স লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’, ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’, ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড’, ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ আইটিইউ (ইন্টারন্যাশনাল টেলিকম ইউনিয়ন) অ্যাওয়ার্ড, ডব্লিউআইপি (উইমেন ইন পার্লামেন্ট) গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড, ‘শান্তিবৃক্ষ’, ‘সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড’ ইত্যাদি অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেন।

এছাড়া মাদার অব হিউম্যানিটি, স্টার অব দ্য ইস্ট, লেডি অব ঢাকা, বিশ্ব শান্তির দূতসহ ইত্যাদি আন্তর্জাতিক খেতাব অর্জন করেন।

অন্যদিকে শান্তি প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখায় বিশ্বের বেশকিছু নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান তাঁকে বিভিন্ন ডিগ্রি এবং পুরস্কার প্রদান করে।

যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রিজপোর্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানের ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়, স্কটল্যান্ডের অ্যাবারটে বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের বিশ্বভারতী এবং ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ব্রাসেলসের বিশ্ববিখ্যাত ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়, রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ও স্টেট ইউনিভার্সিটি অব পিটার্সবার্গ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। তাই তো জাতিসংঘ তাঁকে আজ বিশ্বের সেরা দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রীর খেতাব দিয়েছে। তাঁর উন্নয়ন ও সফলতার কথা বলে শেষ করা যাবে না।

ব্যক্তি হিসেবে তিনি একজন লেখক, সৎ ও নির্লোভ প্রকৃতির। গরিব-দুঃখী ও অসহায়দের জন্য তাঁর মন সব সময়ই কাঁদে। চিকিৎসাসহ বহু অসহায় মানুষকে আর্থিকভাবেও সহায়তা করেন। ঘুষ, দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে তিনি সব সময় কঠিন অবস্থানে। এসব অপরাধে জড়িত নিজ দলেরও যত প্রভাবশালীই নেতাই হোক কাউকে তিনি চুল পরিমাণ ছাড় দেন না। দলের অঙ্গ সংগঠনগুলোতে সাম্প্রতিক কিছু শুদ্ধি অভিযানই তার প্রমাণ।

তাঁর এসব অর্জনে পদে পদে তাঁকে নানা রকম বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, তবুও তিনি জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজ বাস্তবায়নে পিছপা হননি। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মিথ্যা মামলায় তাঁকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে। তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে কমপক্ষে ১৯ বার সশস্ত্র হামলা করা হয়। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার আগেও বহুবার বিভিন্ন জনসভায় তাঁকে মারার উদ্দেশ্যে গুলি করেছে শত্রুপক্ষ। কিন্তু রাখে আল্লাহ, মারে কে! আল্লাহর রহমতে বারবার তিনি প্রাণে বেঁচে যান। তিনি ছাড়া বাংলাদেশ অভিভাবকহীন। তাঁর এই সাহসী ও যুগোপযোগী এগিয়ে চলা অব্যাহত থাকুক এবং বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে জেগে উঠুক।

লেখক : প্রকৌশলী