সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখতে চান লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তিন হাফেজ

নিজস্ব প্রতবেদক :

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম (১৪)। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার পার্বর্তীনগর ইউনিয়নের দক্ষিণ সোনাপুর গ্রামের মরহুম মোহাম্মদ কবির হোসাইনের ছেলে। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে সে ছিল সবার ছোট। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হলেও বাবা তাকে খুব ভালোবাসতেন। তাইতো আদরের সন্তানটিকে দ্বীনি শিক্ষায় সু-শিক্ষিত করবেন। আর বানাবেন কুরআনে হাফেজ। এমনটি স্বপ্ন ছিল কবির হোসাইনের। এজন্য সন্তানকে জেলা শহরের ‘আবদুল গণি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্রেইল হাফিজিয়া ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করান। জাহিদও বাবার স্বপ্ন পূরণে ছিল বদ্ধ পরিকর। তাইতো মাত্র তিন বছরে কুরআন মাজিদের ত্রিশটি পারা সম্পূর্ণ মুখস্ত করেন। হয়েছেন একজন কুরআনে হাফেজ। যদিও তার বাবা এই সফলতা দেখে যেতে পারেননি। কারন তিনি ২০১৬ সালের শেষের দিকে মারা যান।

শুধু জাহিদুল ইসলামই নয়। ওই প্রতিষ্ঠান থেকে কুরআনে হাফেজ হয়েছেন মোহাম্মদ ইমাম হাসান (১৪) ও ইয়াছিন আরাফাত (১৬) নামে আরো দু’জন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। জন্মের পর থেকেই পৃথিবীর কিছুই চোখে দেখিনি ওরা। কিন্তু শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক নানা প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে বিশ্ব বাসীকে দেখিয়ে দিল ওরা বিজ্ঞানময় পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কুরআন সম্পূর্ণ মুখস্ত করে।
জানা গেছে, ২০১৪ সালে লক্ষ্মীপুর পৌর শহরে অবস্থিত ‘আবদুল গণি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্রেইল হাফিজিয়া ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসায় ব্রেইল পদ্ধতিতে কুরআন শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। এ প্রতিষ্ঠানে মাওলানা শামছুজ্জামান মাহমুদ, হাফেজ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ক্বারী আবদুল মোহাইমেন-এর তত্ত্বাবধানে নাজরানা, হাফিজিয়া ও কিতাব শাখায় মোট ১৭ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছাত্র অধ্যয়নরত রয়েছে। এখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছাত্রদের ভর্তি, থাকা-খাওয়া ও পড়ালেখা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। স্থানীয়দের দান-অনুদানেই মাদ্রাসাটি চলছে।

আরো জানা যায়, হেফজ্ সম্পূর্ণ করার পর গত দুই বছর ধরে আল কুরআনের তাফসীর ও হাদিস গ্রন্থসমূহ নিয়ে পড়াশুনা করছেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ইমাম হাসান ও ইয়াছিন আরাফাত। সব ঠিক থাকলে আর পাঁচ বছর পরেই তারা হয়ে উঠবেন আল কুরআনের তাফসীরকারক। তারা আলোচনা করবেন, বক্তব্য রাখবেন ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। হাফেজ ইমাম হাসান লক্ষ্মীপুর পৌরসভার বাসিন্দা মহিব উল্লাহর ছেলে এবং হাফেজ ইয়াছিন আরাফাত সদর উপজেলার চররুহিতা ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুল করিমের ছেলে।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা। এটি যে ভূল ধারণা, তা সু-শিক্ষিত হয়ে প্রমাণ করতে চান এই তিন হাফেজ। তারা বলেন, কিতাব পড়া শেষ করে তারা অন্যদের আলেমদের মতো কুরআন ও হাদিসের তাফসির পেশ করবেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে কাজ করবেন। তারা সমাজের বোঝা হয়ে নয়, নিজ যোগ্যতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চান। রাখতে চান  সমাজ ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান।

ব্রেইল ক্বারী আবদুল মোহাইমেন (দৃষ্টি প্রতিবন্ধী) বলেন, একসময় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা তাদের ওস্তাদের মুখ থেকে শুনে শুনে কুরআন মুখস্ত করতো। ১৯৯৫ সালে প্রথম রাজধানী ঢাকায় আল মারকাজুল ইসলামী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্রেইল হাফিজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালে লক্ষ্মীপুরের আবদুল গণি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্রেইল হাফিজিয়া ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসায় ব্রেইল পদ্ধতি চালু হয়। এখানে শিক্ষার্থীরা আরবীর পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজী ও গণিত বিষয়ে লেখাপড়া করছে।

মাদ্রাসাটির গভর্ণিং বডির সভাপতি ও ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা হারুন আল মাদানী বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা পরিবার কিংবা দেশের বোঝা নয়। সুষ্ঠু পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ পেলে তারাও ভালো কিছু করে দেখাতে পারে। ইতোমধ্যে পবিত্র কুরআন শরীফ সম্পূর্ণ মুখস্ত করে হাফেজ হয়েছেন এই প্রতিষ্ঠানের তিনজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী। এ মাদ্রাসায় আরও ১৪ জন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী নাজরানা ও হেফজ্ বিভাগে অধ্যয়নরত রয়েছে।

সভাপতি আরো বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের মানব সম্পদে রূপান্তরিত করতে হলে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং টিকিয়ে রাখা খুবই প্রয়োজন। এজন্য যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করছেন তারা নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালার নিকট থেকে উত্তম প্রতিদান পাবেন বলে মন্তব্য করেন এই ইসলামী চিন্তাবিদ।