লক্ষ্মীপুরে উর্মি’র বাল্য বিয়ের প্রস্তুতি চলছে : ঠেকানোর চেষ্টা করছে চেয়ারম্যান

নিজস্ব প্রতিবেদক :
দু’দিন পর আগামী (২ সেপ্টেম্বর) রোববার উর্মির বিয়ে। বিয়ের গেইট সাজানো হয়েছে। বাড়ীতে স্বজনসহ মেহমানও আসতে শুরু করেছে। পুরো বাড়ীতেই আনন্দ বিরাজ করছে। কিন্তু উর্মি’র মন খারাপ। সে আর কখনো স্কুলে যেতে পারবে না, বান্ধবীদের সাথেও খেলা করতে পারবে না। ঘরের ভেতরে তার কান্নার গোঙ্গরানী শোনা গেলেও মা ও মামার বাধার কারণে দেখা করতে দেয়া হয়নি।

ঘটনাটি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের চরকাচিয়া গ্রামের বেপারি বাড়ীতে। জান্নাতুল ফেরদাউস উর্মি একই এলাকার প্রবাসী মাজেদ মালের বড় মেয়ে এবং এলকেএইচ উপকূল উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী।

বুধবার (২৮ আগষ্ট) সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, বাড়ীতে ঢুকতেই বিয়ের গেইট সাজানো হচ্ছে। ভেতরে প্যান্ডেলও সাজানো হচ্ছে। বাড়ীর উঠানে উর্মির প্রবাস ফেরত বাবা, ব্যবসায়ী মামা, চার স্বজনসহ কয়েকজন মেহমান খোশগল্পে মেতে আছেন। সাংবাদিক দেখেই তারা নড়েচড়ে বসেন। আগামী ২ সেপ্টেম্বর বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে উর্মিকে একই গ্রামের সর্দার বাড়ীর মফিজুল হক সর্দারের ছেলে মোল্লার হাট বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল করিমের কাছে।

এদিকে আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে বিদ্যালয়ে পরীক্ষা শুরু হবে। কয়েকদিন স্কুলে না গেলেও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিল উর্মি। কিন্তু বিয়ের কারণে স্কুলেও যাওয়া হলো না, পরীক্ষাও আর দেয়া হলো না। ঘরের ভেতরে ঢুকরে ঢুকরে কাঁদছে। উর্মির এ কান্নার শব্দ শুনে তার সাথে কথা বলার জন্য অনেক অনুরোধ করলেও মা, বাবা ও মামার কারণে বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

বিদ্যালয়ে গেলে কয়েকজন সহপাঠী জানায়, উর্মি একদিকে যেমন মেধাবী শিক্ষার্থী, অন্যদিকেও সে রূপসী। স্থানীয় কয়েকজন বখাটে বিদ্যালয়ে আসা যাওয়ার সময় উর্মিকে উত্ত্যক্ত করতো। তাই ওর মা-বাবা এ পরিস্থিতিতে তাকে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। তাকে না পেয়ে আমাদেরও মন খারাপ।

এব্যাপারে উর্মির বাবা মাজেদ মাল বলেন, আমার পরিবার প্রায় পাঁচ বছর আগে ভোলার কালিগঞ্জ থেকে এ গ্রামে জমি কিনে বসবাস করছিলাম। প্রায় এক বছর হয়েছে আমি প্রবাসে থাকি। গত মাসে মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে বাড়ীতে এসেছি। তিন মেয়ের মধ্যে উর্মি সবার বড়। বিদ্যালয়ে আসা যাওয়ার সময় এলাকার বখাটেরা উত্ত্যক্ত করতো। আমার স্ত্রী, তিন মেয়েকে নিয়ে আতঙ্কে রাত যাপন করতে হয়। কোথাও বিচার পাইনি। তাই অনেকটা বাধ্য হয়ে বিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু বাল্য বিবাহের বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান আবু সালেহ মোহাম্মদ মিন্টু ফরাজী তার স্বাক্ষর দিয়ে উর্মির জন্ম সনদে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে।

সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কাশেম বলেন, মেয়েটি সুন্দরী হওয়ায় এলাকার বখাটেরা উত্ত্যক্ত করতো। একাধিকবার ইউপি কার্যালয় ও স্থানীয় ফাঁড়ি থানায় সালিশ বৈঠক হলেও কোন লাভ হয়নি। উর্মির বিয়ে ভাঙ্গতে তাদের বাড়ীর পাশের বখাটেরাই ইউএনও অফিসে লিখিত অভিযোগ ও আপনাদেরকে (সাংবাদিক) এনে হয়রানি করছে। রিপোর্ট লেখার দরকার নেই, কিছু টাকা নিয়ে দিই, চলে যান।

দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সালেহ মোহাম্মদ মিন্টু ফরাজী বলেন, আমার এলাকায় কোন বাল্য বিয়ে হতে দেয়া হবে না। আপনারা (সাংবাদিক) আসছেন, বিয়েটা ভেঙ্গে দেন। পরে আমি আইনগত ব্যবস্থা নিব।

রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম বানু শান্তি জানান, ঘটনাটি আমি অবহিত হয়েছি। এব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।