লক্ষ্মীপুরে শিক্ষকের থাপ্পড়ে ছাত্রের জ্ঞান আসে আর যায়

নিজস্ব প্রতিবেদক :

লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে সহকারী প্রধান শিক্ষকের মারা থাপ্পড়ের আঘাতে ব্রেনে রক্ত জমে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র রাকিবুল হাসান ঢাকায় একটি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। সেই শিক্ষক বদরুল আলমের বিরুদ্ধে ঐ ছাত্রের মা রাবেয়া বেগম রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে করেন লিখিত অভিযোগ।

অভিযোগের ভিত্তিতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ঘটনাটি নিয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুচিত্র রঞ্জন দাস ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে।

বুধবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে মুঠোফোনে হাসানের মা রাবেয়া বেগম জানান, তার ছেলে বর্তমানে ঢাকায় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। ছেলের অবস্থা পূর্বের চেয়ে আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। জ্ঞান ফিরলেও সে বারবার অচেতন হয়ে পড়ছে। তিনি আরো বলেন, তার আগের তিনটি সন্তান মারা গেছে। হাসান তার খুব আদরের সন্তান। একমাত্র ছেলেটিকে বাঁচানোর জন্য চিকিৎসকদের কাছে আকুতি জানাচ্ছেন তিনি।

হাসান আলেকজান্ডার সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। সে উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে কর্মরত মিজানুর রহমানের ছেলে। অভিযুক্ত বদরুল আলম ওই বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক। দুপুরে বিদ্যালয়ে গিয়ে হাসানের সহপাঠি আবদুর রহমান ফাহিমসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে ঘটনার সত্যতা জানা যায়।

হাসানের মা রাবেয়া বেগম কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, রবিবার (২৫ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৮ টায় হাসান স্কুলে কোচিংয়ে গিয়ে দুই সহপাঠিসহ সামনের বেঞ্চে বসেছিল। অন্য এক সহপাঠি তাদের সাথে বসার আগ্রহ দেখায়। পরে সহপাঠির বইগুলো নিজের বেঞ্চে আনে হাসান। এসময় শিক্ষক বদরুল আলম শ্রেণিকক্ষে ঢুকে হাসানকে কথা বলতে দেখে। এতে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে হাসানকে কানে ও মাথায় থাপ্পড় দেয়। তাৎক্ষণিক হাসানের মাথার ভেতর গরম হয়ে উঠে। বিষয়টি সে শিক্ষককেও জানিয়েছে। কিন্তু শিক্ষক কর্ণপাত না করে তাকে বেঞ্চের নিচে মাথা দিয়ে রাখতে বলে।

বারবার সে অসুস্থ হয়ে পড়ার কথাও জানিয়েছিল শিক্ষককে। তারপরও জোরপূর্বক হাসানকে বেঞ্চের নিচে মাথা দিয়ে কোমর ওপরে উঠিয়ে রাখতে বাধ্য করা হয়। ওই সময় কোমর নামালে ফের তার পিঠে দুটি থাপ্পড় মারে শিক্ষক।

তখন শিক্ষক বলেন, তার ক্লাসের নির্ধারিত সময় পর্যন্ত এভাবে থাকতে হবে হাসানকে। এরমধ্যে সে কান্না করতে করতে বারবার তার মাকে ডাকার জন্য বলে সবাইকে। হাত-পা সোজা হয়ে আসছে বলে তাকে বাঁচানোর জন্য চিৎকার দিয়ে সহপাঠিদের জানানো হয়। কিন্তু শিক্ষকের ভয়ে তারা হাসানকে সহযোগীতা করতে পারেনি।

এদিকে হাসানের এমন অবস্থাতেও তার মাকে বিষয়টি জানাননি ওই শিক্ষক। ঘটনার সময় অন্য কোন শিক্ষক বিদ্যালয়ে ছিলেন না। হাসান অচেতন হয়ে পড়লে তাকে একটি বেঞ্চের ওপর শুয়ে রাখা হয়। পরে আরিফ নামে এক শিক্ষক এলে ঘটনাটি দেখে বদরুলকে বকাবকি করেন। একপর্যায়ে শিক্ষক আরিফসহ শিক্ষার্থীরা হাসানকে উদ্ধার করে রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাকে নোয়াখালী হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায় হাসানের ব্রেনে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সেখান থেকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাকে ভর্তি রাখা হয়নি। পরে তাকে ধানম-ির পপুলার হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তার অবস্থার উন্নতি হয়নি। জ্ঞান আসলেও বারবার সে অচেতন হয়ে পড়ছে। তার অবস্থা ধীরে ধীরে আরো অবনতির দিকে যাচ্ছে।
অভিযুক্ত শিক্ষক বদরুল আলম গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, হাসানকে অচেতন হয়ে যাওয়ার মত মারধর করা হয়নি। তবে পিঠে আস্তে করে থাপ্পড় দিয়ে বেঞ্চের নিচে মাথা রাখার বিষয়টি স্বীকার করেছেন তিনি।

রামগতি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, অভিযোগ পেয়ে আমি ঘটনাস্থল গিয়েছি। এনিয়ে হাসানের সহপাঠি, মা ও অভিযুক্ত শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছি। মেডিকেল রিপোর্ট পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, ঘটনাটি তদন্তের জন্য শিক্ষা কর্মকর্তাকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষককে শোকজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্ত কমিটিকে আগামি তিনদিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

শীর্ষ সংবাদ/এফএইচ