নিরপেক্ষ গণমাধ্যম জাতির প্রত্যাশা

গণমাধ্যমকে বলা চলে দেশের জনগনের দর্পণ।আমরা দর্পণের মাধ্যমে যেমন আমাদের অবয়ব  দেখতে পাই ঠিক তেমনি ভাবে আমরা গনমাধ্যমের মাধ্যমে দেশের তথা সারাবিশ্বের অবয়ব দেখতে পাই।তাই আমাদের দেশের গনমাধ্যম কে হতে হবে সম্পুর্ণ নিরপেক্ষ।তাই বলে কি গনমাধ্যমের কর্মীদের কোন রাজনীতি করার অধিকার নাই?অবশ্যই তারা রাজনীতি করতে পারবেন। তবে গনমাধ্যমের নিউজের সাথে তাদের কোন রাজনীতি প্রকাশ পাবে না।নিউজ পড়ে কোন মানুষ যাতে বলতে না পারে যে অমুক সাংবাদিক অমুক রাজনৈতিক দলের হয়ে নিউজ করছে।অর্থাৎ তাদের প্রকাশিত সংবাদ পড়ে দেশের জনগন যাতে বুজতে না পারে যে সে অমুক দলের দালালি করছে।বা অমুক দলের পক্ষে নিউজ করছে।কারন গণমাধ্যমের মাধ্যমে আমরা প্রকৃত সংবাদ পাই। বর্তমান পরিস্থিতিতেও গণমাধ্যম এই ভূমিকা পালন করছে। এর দুটি দিক আছে। প্রথমত, আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরোধী দলের আন্দোলনের পরিস্থিতিটা বা ইতিবাচক-নীতিবাচক দিকটাও আমরা গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানছি। আমরা যখন দেখি হরতাল-অবরোধের সময় আগুন জ্বলছে, পেট্রলবোমা পুড়ছে তখন প্রশ্ন ওঠে গণমাধ্যমের ব্যক্তিরা সেখানে এত  তাড়াতাড়ি পৌঁছালেন কীভাবে? আবার এর উত্তর অনেকে এমনভাবে দেন এসব তো সাংবাদিকদের জানারই কথা। কারণ তারা তো সব সময় এর অনুসন্ধানই করেন। তারা সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করার জন্য এ ধরনের সংবাদ প্রকাশে কিছুটা সাবধানতা অবলম্বন করতে পারেন। কারণ তারা যদি আগে থেকেই জানেন এমন কোনো ঘটনা ঘটতে পারে, তবে তা জনগণকে রক্ষা করার জন্য সাধারণ মানুষকে জানালেই পারেন। কিন্তু পত্রিকার আদর্শ অনুযায়ী দুঃসংবাদ বেশি গুরুত্ব পায়। কারণ ‘বেড নিউজ ইজ অলয়েস গুড নিউজ ফর মিডিয়া’।

যেমন বিমান দুর্ঘটনা হলেই আমরা জানতে পারি, আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ভালো কাজ হলেও আমরা দুর্ঘটনাগুলোই গণমাধ্যমে দেখি। সে দিক থেকে আমরা বলতে পারি গণমাধ্যম তো এমনটাই চাইবে। কিন্তু আজকাল গণমাধ্যম আমাদের দেশে শিক্ষকের ভূমিকা পালন করছে। জাতির বিবেকের ভূমিকাও মাঝে মাঝে পালন করে। তাই এ সময় গণমাধ্যমের কাছে আমাদের দাবি থাকবে, এমন সংবাদ পরিবেশনের, যাতে করে মানুষের মাঝে এক ধরনের স্বস্তি ও আশার সম্ভাবনা সৃষ্টি করা যায়। গণমাধ্যমের কর্মীদের প্রয়াস ও উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা সত্যকে জানতে পারি, যে সত্য হয়তো কোনোদিনও আমাদের সামনে আসত না।  গণমাধ্যমের কর্মীদের নিরন্তর পরিশ্রম, কখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের নানা তথ্য সংগ্রহ করে। বর্তমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক একেকটি রাজনৈতিক দল  নিজেদের মতো ইতিবাচক দিক বা নীতিবাচক দিক ব্যাখ্যা করছে। আমরা গণমাধ্যমের ব্যাখ্যা পেয়ে নিজেদের মতো বোঝার সুযোগ পাচ্ছি না। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধান দুদলই দুই মেরুতে অবস্থান করছে। কেউ কারও সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় বসতে চাচ্ছে না। সবগুলো গণমাধ্যম বলে আসছে  দুদলকে সমঝোতায় বসা উচিত, সংলাপ বা আলোচনা হওয়া উচিত। মানুষকে এ আতঙ্কজনক অবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়া উচিত। একটি যথার্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য গণমাধ্যম ভূমিকা রাখবে এমনটাই সাধারণ জনতার আশা।

অন্যদিক থেকে বলা যায়  গণমাধ্যম বিবদমান দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণের মতামতের প্রতিফলন দেখিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে এ ধরনের কোনো চাপ গণমাধ্যম সৃষ্টি করতে পারেনি। কারণ আমাদের দেশের গণমাধ্যমকর্মী, গণমাধ্যম করপোরেট মালিক, পুঁজিনিয়ন্ত্রণকারী করপোরেটরা যে কোনোভাবেই হোক একেকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কেউই এ রাজনৈতিক গন্ডি অতিক্রম করতে পারেন না। সাংবাদিকের নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকবে। কিন্তু তিনি কখনো রাজনৈতিক মুখপত্র হবেন না। কিন্তু আমাদের দেশে সম্পূর্ণ এর বিপরীত প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ফলে যে কোনো সাংবাদিক যখন কথা বলেন  তখন অন্যরা সবাই তাকে নির্দিষ্ট দলের বলে চিহ্নিত করেন।  ফলে তার কথা কেউ শুনছেন না। আমাদের গণমাধ্যমের নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে যারা আছেন, তারা নিরাসক্তভাবে বাস্তবতা বলছেন তা কিন্তু নয়। পাকিস্তানের হামিদগুল বলেন, ভারতের কুলদীপ নায়ার বলেন  তাদের বক্তব্যে কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ পায় না। আমাদের দেশে এ রকম সাংবাদিক নেতার অভাব। সাংবাদিক নেতারা যখনই কথা বলেন, তারা যে কোনো দলের বলে চিহ্নিত হয়ে পড়ছেন, যা মানুষ মেনে নিতে পারছে না। এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাসক্ত, মুক্তচিন্তার ও মুক্তচিত্তের গণমাধ্যমকর্মী ও সংগঠকের আমাদের অনেক প্রয়োজন। আর এমনটা হলেই আমাদের প্রার্থিত, কাঙ্খিত, সুস্থ ও কল্যাণকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হতে পারে। আমি বিশ্বাস করি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরাই জাতির শিক্ষক হতে পারেন। কারণ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এ পেশাকে বেঁছে নিয়েছেন। যে কোনো সংবাদ পরিবেশনে সাংবাদিকরা তাদের মেধা-মনন, মুক্তচিত্ত ও বিবেচনা দিয়ে সংবাদ আমাদের সামনে পরিবেশ করবেন। একটি সংবাদের নানামুখী ব্যাখ্যা হতে পারে। কিন্তু সেই ব্যাখ্যাটা যেন জনগণমুখী, মানবমুখী ও দেশমুখী হয়। ব্যক্তিভাবনা ও রাজনৈতিক আদর্শ যেন প্রাধান্য না পায়। সংবাদকর্মীরা  জীবনের ঝুঁকি জেনেও যেহেতু এ পেশার সাথে জড়িত হয়েছেন তারা অবশ্যই তাদের মেধা-মনন ও দক্ষতার দ্বারা নিউজ করে দেশের জনগনকে প্রমান করিয়ে দিতে হবে যে,সাংবাদিকরা কোন রাজনৈতিক দলের বা গোত্রের বিশেষ ব্যক্তি নন।তারা তাদের দায়িত্বের খাতিরেই সত্য নিউজ করে থাকেন।এতে করে দেশের মানুষের কাছে যেমন তিনি সঠিক দায়িত্ববান সাংবাদিক হিসাবে পরিচিতি লাভ করবেন তেমনি তিনি যে পত্রিকায় কাজ করছেন সে পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ও দিন দিন বাড়তে থাকবে।মানুষ আগ্রহ নিয়ে বসে থাকবে এই দায়িত্ববান সাংবাদিকের লেখা পত্রিকার জন্য।একজন সাংবাদিক যখন নিরপক্ষ সংবাদ প্রকাশ করবেন তখন তিনি দেশের মানুষের কাছে ভালো সাংবাদিক হিসাবে পরিচিতি লাভ করবেন তাতে কোন সন্দেহ নাই। আর যখণ কোন দলের বা গোত্রের পক্ষ হয়ে সংবাদ প্রকাশ করবেন তখন তিনি দেশের মানুষের কাছে হলুদ সাংবাদিক বা সাংঘাতিক হিসাবে পরিচিতি লাভ করবেন।

আস্তে আস্তে তার প্রতি হতে মানুষের আস্তা কমতে থাকবে।সাময়িকভাবে তিনি যার নিউজ করছেন তার কাছে গ্রহন যোগ্য হলেও এক সময় তিনি তার নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারবে না।তাই গণমাধ্যমের সাথে জড়িত সকল লোকদের কে অবশ্যই নিরপক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। কারন একজন গণমাধ্যম কর্মীর কাছে দেশের সকল শ্রেনীর মানুষের অনেক কিছু আশা করে থাকে।দেশের মানুষের আশার প্রতিফলন ঘটানোই হলো একজন ভালো গণমাধ্যম কর্মীর কাজ।স্ব স্ব অবস্থানে থেকে কোন ব্যক্তি বিশেষের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে কাজের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে।তাহলেই তিনি একজন সফল সাংবাদিক হিসাবে বিবেচিত হবেন।

মো. ওসমান গনি.

 লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট