একটি কালো মেয়ের গল্প

‘সুরাইয়ার’ তিনদিন ধরে প্রসব ব্যথা। বাচ্চা প্রসব হচ্ছে না। তিন দিন পর একজন ডাক্তার আনা হলো। জন্ম হলো কালির। প্রথমে নানিকে ডেকে নাতনি দেখানো হলো। সে তো চিন্তায় অস্থির হয়ে আছে। সুরাইয়ার বাবা জিজ্ঞেস করে, বাচ্চা কি ছেলে না মেয়ে? উত্তরে আসে মেয়ে। তৎক্ষণাৎ আগত শিশুর শুভেচ্ছা পাল্টে যায়। ‘এই মেয়ে হইছে, আর ওর লাগি আমার মেয়ে তিনদিন কষ্ট করছে?’ সবাই এমনভাবে কথা বলছিল যেন এসব কষ্টের জন্য কালি দায়ী। পেটে থেকে আজন্মের পাপ করেছে।

তাই তার মায়ের এই শাস্তি। সবাই জন্মের পরে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে কান্না করে। কিন্তু কালি তা করেনি শুধু ঠোঁট এতটুকু বাঁকা করেছিল এই যা। কারণ ও পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছিল।

বেশি কাঁদলেই সমস্যা আছে আর ওর মা এখন অচেতন অবস্থায় আছে, বাবাকেও আশপাশে দেখছে না। তাই কাঁদার মতো বোকামির কাজটা সে করল না। তার চেয়ে বরং সবার দিকে মায়া মায়া চোখ করে তাকাতে থাকে। কেউ একবার কোলে তুলে নিয়ে যদি বলে, আহারে মেয়েটা কত সুন্দর হয়েছে! যেন একটা ফুলপরি। সেই জন্ম থেকেই সুন্দর শব্দটা শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে সে।

আস্তে আস্তে বড় হতে থাকল। অন্য কেউ যাই বলুক বাবা-মার খুব আদরের সন্তান সে। তাদের ভালোবাসার প্রথম পদ্ম। সুন্দর শোনার আকাক্সক্ষা তার আর পূরণ হয় না। এমন কি মানুষের কাছে সে অবহেলিত হতে থাকে।

তাকে দেখতে এসে আত্মীয়-স্বজনদের বক্তব্য হয় এমন, আল্লাহ এই মেয়ে যে কালো, বিয়ে দিতে খবর আছে। কালির এক চাচি আছে, সেই চাচির সামনে পড়লেই বলত, ‘এই যা এখান থেকে এসব কালো মানুষ দেখলে আমার বমি আসে।’ কালি কি আর করবে?

মনের কষ্ট মনেই রাখে। আর ঘুমের আগে একটা কল্পনা করে ঘুমায়, ইস আমাকে যদি আল্লাহ ফর্সা করে দিত তাহলে আমি সবচেয়ে সুখী মানুষ হতাম। হায়রে, কল্পনা তা কি আর সত্যি হয়?

কিছুদিন বাদেই তার একটা রাজপুত্রের মতো ভাই হলো। সে কি কাণ্ড! আট বছর বয়স হয়েছে কোনোদিন কোনো কাজে হাত দিতে দেয়নি কালির মা। কিন্তু যে দিন ওর ভাই হলো সেই দিন ঘরের সব কাজ করে কালি। তার মধ্যে আবার ভাই হওয়ার খবরটাও দিয়ে আসে বন্ধুদের কাছে। যদিওবা ওর বন্ধু গুটিকয়েক।

দুপুরে নানি ডেকে বলেন শুকনো গোবর কুড়িয়ে আনার জন্য। আনলোও, কিন্তু আহ্লাদি করে নানির কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য আঁতুর ঘরে ঢোকে পড়ে।

কালির আসল উদ্দেশ্য ছিল মার সামনে যাওয়া। কিন্তু কালির নানি কালিকে বলে, ‘এই তুই এইগুলো নিয়ে এই ঘরে ঢুকলি ক্যান? দৌড়ে আইসা ঘরে ঢোকা যাইব! তোর মতো অইছে? আমার ভাইটা দেখ কত সুন্দর হইছে। আর সুরাইয়া তরে কই শোন, মাইয়া কোলে জন্ম নিছে কাম কাইজ করাবি বলে বাদাড়ে ঘুরতে দিস না।‘ কালি আর অপমান সহ্য করতে পারছিল না ছলছল চোখে বেরিয়ে গেল।

সুরাইয়া বলছে, ‘আম্মা থাক আমার কাছে একটু সময়, মেয়েটা আমার কাছে কই থাকে। সে ডাকতে থাকে, এই কালি আয় মা আমার কাছে।’ কালি অভিমানে পালিয়ে যায়। সবাই কালিকে বলতে থাকে, কালি তোকে এখন তোর বাপ-মাও আদর করবে না।

কালি আস্তে আস্তে খিটখিটে স্বভাবের হয়ে যায়। যখন সে অষ্টম কিংবা নবম শ্রেণিতে পড়ে তখন ছেলেমেয়েরা নতুন নাম দিয়েছে, ‘পেতনি’। কারণ কালি একে তো কালো আর এক হলো চোখ দুটো বড় বড়। তাই কালি তখন পেতনি নামে উপাধি পেয়েছে।

পড়াশোনায় ভালো ছিল স্কুল পেরিয়ে কলেজে যায়। থাকে এক ফুফুর বাসায়। একদিন ফুফুর সঙ্গে একটা অনুষ্ঠানে যায়। কে একজন এসে বলে, আপা আপনার মেয়ে?

ফুফু বলে, না না আমার মেয়ে হতে যাবে কেন? আমার মেয়ে অনেক সুন্দর। আমাদের পরিবারে ওই একমাত্র দেখতে খারাপ হয়েছে।

এদিকে কালির কষ্টে বুকের হাড়গুলো ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যায় ফুফুর এসব কথা শুনে। ও ছলছল চোখের জল আড়াল করার জন্য সরে যায় এখান থেকে।

কলেজের চৌকাঠ পার হওয়ার আগেই কালির বিয়ে হয়ে যায়। তিন লাখ টাকা যৌতুকের বিনিময়ে।

কিন্তু এই টাকা দিয়েও সুখ কিনতে পারেনি কালির বাবা।

শ্বশুরবাড়িতে সে অবহেলিত ছিল অসুন্দরের জন্য। আরো টাকা চাইতো কালির বাবার কাছে। এই গায়ের রঙটা কালো হওয়াতে সারা জীবন কষ্ট পেয়েছে কালি। কালোর জন্য কালি নামটিও রেখেছে তার। আর অপমান নিতে না পেরে নিজের শরীর ঝুলিয়ে দিয়েছে গাছের ডালে।

শেষ বিদায়ের জন্য কালো রাতকেই তার পছন্দ হয়েছে। রাতের নির্জনতা সাক্ষী সাদা কালো বিভেদ এর মধ্যে পড়ে কালি একটি পরাজিত নাম। এমন বিভেদ নিয়ে বিশ্ববাসীও জাগ্রত হয়েছে। কিন্তু এখনো মাটির নিচের মূলটা রয়েই গেছে। আর সে জন্যই কালিদের জীবনের স্বপ্ন বা জীবন ঝুলে থাকে গাছের ডালে। কেউ ভুগে হতাশায়। কেউ কোনো জায়গায় গিয়ে মূল্যই পায় না। কি যে অদ্ভুত পৃথিবী!

:: আফিফী ইশিতা, ঢাকা মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট