মেয়েটি দুষ্ট ছেলের প্রেমে পড়েছে

কার্জন হল থেকে বের হলাম। আমি আর শিমু। হেঁটে যাচ্ছি আমরা। শিমু আমার বাঁ পাশে। আমার বাঁ হাত ধরল ওর ডান হাত দিয়ে। শিমুর দিকে প্রেমকাতর দৃষ্টিতে তাকালাম। তাকানো দেখে আমাকে শক্ত করে ধরল শিমু। বুঝতে পারলাম, ভালোবাসার আশ্রয় পেয়েছে হয়তো আমার তাকানোর মধ্যে।

মুচকি হেসে শিমুকে বললাম, আচ্ছা, আমার মতো খারাপ ছেলেকে তোমার পছন্দ হলো কেন?
শিমুও মুচকি হেসে বলল, ‘রাহাত, তোমাকে আজ একটা সত্যি কথা বলি।’
বলো।
‘আসলে কি জানো। বেশিরভাগ মেয়েই সাধারণত জঘন্য ও দুষ্ট প্রকৃতির ছেলেদের প্রতিই আকৃষ্ট হয় বেশি।’
কী বলো শিমু! তাই নাকি?
‘হ্যাঁ, সত্যি বলছি।’
আচ্ছা শিমু, দুষ্ট ছেলেদের পছন্দ করার কারণ কী?

এদিক-ওদিক তাকিয়ে শিমু বলল, ‘রাস্তাটা পার হই। তারপর বলি।’
আমরা রাস্তা পার হলাম সতর্কভাবে। দক্ষিণ পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকলাম। তারপর শিমুকে বললাম, এবার বলো?
শিমু বলল, ‘দুষ্ট ছেলেদের কর্মকান্ডের প্রতি মেয়েরা তীব্রভাবে আকর্ষিত হয়, মেয়েরা নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। নিজের জন্য ক্ষতিকর সব বিষয় পছন্দ করে। তাদের সঙ্গে মিশতে আমোদ বা উচ্ছ্বাস অনুভব করে থাকে। যেমন আমি তোমার মধ্যে পেয়েছি।’
তাই, কী বলো এসব! তাহলে তো আমাকে আরো দুষ্ট হতে হবে।
শিমু আমার হাতটা জোরে টান দিয়ে বলল, ‘না রাহাত, তুমি আর বেশি দুষ্ট হতে পারবে না।’
কেন পারব না, শিমু?
‘আরো বেশি দুষ্ট হলে আমার হাতছাড়া হয়ে যাবে তুমি।’
তোমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারব না আমি।
‘কেন? আমি কী দেইনি তোমাকে। সবই তো দিয়েছি।’

আমার দুষ্টমির স্বভাব বলে একা অভ্যাস আছে না। সেটার জন্যই তো তুমি আমাকে পছন্দ করেছ।
‘এখন থেকে আর অন্য কারো সঙ্গে সে দুষ্টামি করতে দেব না। এখন শুধু তুমি আমার।’

আচ্ছা, যখন আমি তোমার সঙ্গে থাকব, তখন আমি তোমার, শিমু।
‘বাকি সময়?’
অন্যের।
‘কেন?’
তোমার আমার বিয়ে হবে না। এটা তুমিও জানো, আমি জানি। এভাবেই যত দিন চলে। চালিয়ে যাও।
শিমু চুপ হয়ে গেল। আর কিছু বলল না। হেঁটে যাচ্ছি আমরা। বাংলা একাডেমির সামনে। একটু পর বললাম, শিমু, আমার বাবা ছোটবেলা আমাকে একটা কথা বলেছিলেন?
‘কী কথা?’
বলেছিলেন। মেয়েদের বারো হাতে শাড়িতে তাদের শরীর ডাকে না। তাদের মন বোঝা খুব কঠিন। তার পর পর থেকে আমার ভেতরে একটা কাজ করে। নারীদের মন বোঝার। বিভিন্নভাবে বোঝার চেষ্টা করি। কিন্তু ভালো থেকে পারি না। দুষ্ট হয়ে কিছুটা বুঝতে পেরেছি, এ যুগের মেয়েদের।
‘তাই।’
হ্যাঁ, দুষ্ট না হলে হয়তো তোমার চোখে আমি পড়তাম না। তোমার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক হতো না। ভালো থাকলে হয়তো একটা উপাধি পেতাম, ছেলেটা ভালো কিন্তু বোকা। এ যুগে এমন বোকা টাইপের ছেলেকে কেউ পছন্দ করে না। এখন বুঝতে পেরেছি। তুমিও বোঝো নিশ্চয়।
‘তা অবশ্য ঠিক বলেছ। বোকা ছেলেদের মেয়েরা পছন্দ করে না।’
শিমু, দুষ্ট ছেলেদের সঙ্গে মেয়েরা মেশে কেন?

‘শোনো রাহাত, প্রতিটি নারী চায় তার জীবনটা উত্তেজনায় ভরপুর থাকুক। পুরুষেরা তাদের চাহিদাগুলো পূরণ করুক। কিন্তু কয়জন পুরুষ তা পারে। আর যে পারে তার প্রতি নারীর একটা নিষিদ্ধ আকর্ষণ কাজ করে। আর এই আকর্ষণ থেকেই নারীরা দুষ্ট ছেলেটার প্রেমে পড়ে যায়। যেমন তোমার প্রেমে পড়েছি আমি।’
তাই নাকি।
‘হ্যাঁ। যখন তোমার সঙ্গে আমি মিশি তখন গতানুগতিক জীবনের একঘেয়েমি কটিয়ে কিছু মুহূর্ত আমার জীবনের ক্লান্তি দূর করে জীবনটাকে অন্যভাবে উপভোগ করি।’
আমিও জানি। বুঝতে পারি, নারীরা কী চায়।
‘তুমি তো বিশ্বপ্রেমিক। তুমি বুঝতে পারবে না, কে পারবে।’

হ্যাঁ, এ ক্ষমতা আমার আছে। ক্ষমতা অর্জন করতে হয়েছে আমাকে। আমার কিছু বন্ধু আছে। তারা তো একটা প্রেমও এখন পর্যন্ত করতে পারেনি। আমার কাছে এসে তারা আপসোস করে।
‘তাই! তোমার সে বন্ধুরা হয়তো বোকা। সাহস করে মেয়েদের কিছু বলতে পারে না। তাই না?’
ঠিক বলেছ।
‘চলো টিএসসিতে বসে চা খাই।’
‘আচ্ছা, চলো।’
টিএসসি এলাম। চা-সিগারেট খাচ্ছি। সিগারেটে টান দিতে দিতে বললাম, শিমু, তোমাকে একটা গোপন কথা বলি আমি।
‘চায়ের কাপটা মুখ থেকে সরিয়ে নিয়ে শিমু বলল, ‘কী আবার গোপন কথা বলবে?’
কিছু স্বামী স্ত্রীকে ঘরপোষা হিসেবে দেখতে চায়। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর যে দায়িত্ব, সেটা তারা পালন করতে চায় না। সেসব স্ত্রীর মধ্য থেকে কিছু স্ত্রী কী করে, জানো?
‘কী?’
তারা অনেকে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে পরকীয়ায় মেতে থাকে। নিজেকে একটু রিল্যাক্স হওয়ার জন্য।
‘তাই। তোমার এমন কেউ আছে নাকি?’

কী যে বলো! অভিজ্ঞতা না থাকলে কি আর বলি।
‘আর এস করবে না রাহাত।’

শিমু, তুমি আসলেই পাগলি।
আমাদের চা-সিগারেট খাওয়া শেষ হলো। বললাম, চলো শিমু।
চায়ের কাপ রাখতে রাখতে সে বলল,‘কোথায়?’
তোমার প্রিয় জায়গায়।
‘ও, আচ্ছা, চলো। একটু পরে গেলে তো আর জায়গা পাওয়া যাবে না।’

আমরা দুজন রোকেয়া হলের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে লাগলাম কলা ভবনের দিকে। কলা ভবনের সামনে আমগাছের চারপাশে শানবাঁধানো জায়গায় বসলাম আমরা। গল্প করতে লাগলাম। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা হলো। আমাদের পাশে আরো অনেক জুটি এসে বসল। আমি আর শিমু রোমাঞ্চকর কিছু মুহূর্ত কাটালাম। তারপর ওখান থেকে উঠলাম। শিমু রোকেয়া হলে ঢুকল। আমি হাঁটা দিলাম শাহবাগের দিকে।

রণজিৎ সরকার

এই বিভাগের আরো সংবাদ