লজ্জায় বিমূঢ় প্রিয় স্বদেশ

‘প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন ধরনের অপ্রত্যাশিত ছবি, ফিল্ম, বিশেষ করে পর্নো রিলেটেড বিষয়গুলো এখন সবার হাতে হাতে। এখন সেগুলো বিভিন্ন বয়সের মানুষ চাইলেই দেখতে পারছে। এ ধরনের বিনোদনের উপকরণগুলো দেখে যে ধরনের আচরণগত অস্থিরতা তৈরি হয়, সেটা অনেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।’

ধর্ষণ যেন মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিবেশী, নিকটাত্মীয় কিংবা বাবার বুকেও নিরাপদ নয় কন্যাশিশু ও নারীরা। ধর্ষণের পর শাস্তির ভয়ে শিশুটির প্রাণ নিতেও দ্বিধা করছে না অনেক ধর্ষক। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন রয়েছেন অভিভাবকরা। ঘটনার ব্যাপকতা এতই বেশি যে, দেশের গণমাধ্যম প্রায় প্রতিদিনই ধর্ষণের খবর গুচ্ছ সংবাদ আকারে প্রকাশ করছে। গত এক যুগ ধরে উন্নয়নে এগিয়ে যাওয়া প্রিয় স্বদেশ ধর্ষণ-কলঙ্কের লজ্জায় যেন বিমূঢ় হয়ে পড়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও অপরাধী শাস্তি না পাওয়ায় এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে। এছাড়া এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদেরও প্রভাব বিস্তার না করতে অনুরোধ জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি সামাজিক মূল্যবোধ বাড়িয়ে সব ধরনের অপরাধ থেকে সমাজকে মুক্ত রাখতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সবাইকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, অতীতের তুলনায় ধর্ষণের সংখ্যাটা বেড়েছে। এই বাড়ার পেছনে আমরা যে কারণ খুুঁজে পাই, সেই কারণগুলো হচ্ছে, অতীতে যে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, সেই ঘটনাগুলোর বিচার না হওয়া। অনেক সময় দেখা গেছে যে বিচার হয়েছে, কিন্তু সেই বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হতে ৪-৫ বছর লেগে গেছে। সামাজিক অপরাধের ঘটনা, বিশেষ করে যেগুলো শিশু ও নারী নির্যাতন সম্পর্কিত হয়, তাহলে তার বিচার ৬ মাসের মধ্যে করতে হবে। অন্যথায় নতুন আরেকটি ঘটনা ঘটলে তখন সবার নজর সেদিকে যায়। আগের ঘটনার গুরুত্ব হারিয়ে যায়। সেই জায়গা থেকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি অন্যতম একটি কারণ।

তিনি বলেন, প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন ধরনের অপ্রত্যাশিত ছবি, ফিল্ম, বিশেষ করে পর্নো রিলেটেড বিষয়গুলো এখন সবার হাতে হাতে। এখন সেগুলো বিভিন্ন বয়সের মানুষ চাইলেই  দেখতে পারছে। এ ধরনের বিনোদনের উপকরণগুলো দেখে যে ধরনের আচরণগত অস্থিরতা তৈরি হয়, সেটা অনেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সেটা নিয়ন্ত্রণ না করার অন্যতম কারণ হলো আমাদের দেশে সামাজিক মূল্যবোধ, সামাজিক নীতি-নৈতিকতা অর্থাৎ বৃহৎ পরিসরে সমাজের যে শৃঙ্খলা, তা অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। ভেঙে পড়ার কারণটা হলো, একটা সময় সিনিয়র ব্যক্তিদের সমাজের শৃঙ্খলায় ভূমিকা ছিল, সেই জায়গাটাই এখন অতি রাজনীতির কারণে সিনিয়রদের পরিবর্তে জুনিয়ররা নিয়ন্ত্রণ করছে। তার মানে এখানে তারা নিজেরা নিজেদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা কিংবা নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য মূলত কাজ করছে।

কমিউনিটির এই যে ব্যবস্থাপনা তা ত্রুটিপূর্ণ সামাজিক ব্যবস্থাপনা। আরেকটি কারণ হলো, আমাদের যে পারিবারিক শৃঙ্খলা এবং যে শিক্ষাব্যবস্থা, সেখানেও অনেক ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা পুরোটাই ভিনদেশি সংস্কৃতির আদলে তৈরি। আমরা বারবার বলার চেষ্টা করছি, আমরা আমাদের মতো করে অর্থাৎ পুরোদস্তুর একজন বাঙালি তৈরি করব, সেভাবে একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি হওয়া দরকার। দেশে কয়েক ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার কারণে ভিন্ন ভিন্ন সামাজিকীকরণ হচ্ছে। যে সামাজিকীকরণের কারণে অনেকেই আমাদের দেশের যে সামাজিক মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ যেগুলো রয়েছে সেগুলো তারা মানে না বা মানতে চায় না। পারিবারিক শৃঙ্খলার যে একটি ব্যাপার ছিল, সেই জায়গাটি কর্মের দোহাই দিয়ে স্বামী-স্ত্রী বা পরিবারের অন্য সদস্যরা শিথিল করে আনছে। অর্থাৎ আমরা সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত থাকি। আগে পরস্পরের একটা দেখভালের ব্যাপার ছিল, পরস্পরের খোঁজখবর নেওয়ার একটা ব্যাপার ছিল। এখন মনে হয়, প্রত্যেকেই নিজ গৃহে পরবাসী। এই যে, আচরণের একটা প্রেক্ষাপট দাঁড়িয়েছে, এটা কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের যে দরদ, কিংবা মানবিক আবেদন তৈরি করার সুযোগটি তৈরি করত সেই জায়গাটি ক্ষীণ হয়ে এসেছে। কোনো একক কারণে এ ধরনের অপরাধ ঘটে না। কোনো অপরাধীর ক্ষেত্রে দেখা যায়, সে মানসিক বিকারগ্রস্ত রয়েছে অথবা আচরণগত বিকৃতি রয়েছে তার মাঝে, সেটি ভিন্ন বিষয়। সেটি চিকিৎসার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। যৌন বিকারগ্রস্ততা বলে একটি অসুখ রয়েছে, আচরণগত অসুখ, সেটিও অনেকের মধ্যে আমরা লক্ষ করেছি। সেটি আগে থেকে আইডেন্টিফাই করতে পারলে, এ ধরনের অপরাধ ঘটত না।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, এ ধরনের অপরাধগুলোর বিচার ছয় মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে। যেভাবেই হোক আমাদের বাজেটে সামাজিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা একজন মানুষকে সুস্থ, সামাজিক উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত এ ধরনের সামাজিক বিপর্যয় ঘটতে থাকবে।

তিনি আরো বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নীতিমালা প্রয়োজন। এর অপব্যবহারের ফলে এ ধরনের কার্যক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব বন্ধ না হলে এ ধরনের অপরাধ বাড়বে। শিশুরা অনিরাপদ থাকবে। তাদের জীবন অনিশ্চয়তায় থাকবে এবং শিশুরা এক ধরনের ট্রমা নিয়ে বড় হবে। ধর্ষিত শিশুদের মধ্যে একটি ট্রমা তৈরি হয়। অনেকেই আছে এ ঘটনাটি ভুলতে পারে না। এখন এই  ভোলাটা খুব সহজ ব্যাপারও না। কারণ বাচ্চাদের শৈশবকালীন সময়ে তার আচরণ, তার সম্মান, তার অবস্থানের বিরুদ্ধে যত ঘটনা বা অপরাধ হয়, প্রতিটি ঘটনাই সেই বাচ্চাকে বা ওই ব্যক্তিকে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রভাবিত করে। সেই জায়গা থেকে আমরা বলি, এটা তার পরবর্তী স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। অনেকের ক্ষেত্রে সেই ট্রমা থেকে মানসিক বিকারগ্রস্ততা বা আচরণগত বিচ্যুতি তৈরি হয়েছে, এমনও ঘটনা আছে। সেই জায়গা থেকে আমরা বলি, দ্রুত বিচার করে যদি আমি দৃষ্টান্ত করতে পারি, তাহলে যে ভিকটিম হয়েছে তাকে আমরা বলতে পারি, তোমার সঙ্গে যে অন্যায় আচরণটা হয়েছে, তার বিচার কিন্তু হয়েছে। এই যে, একটা মেসেজ, সেই মেসেজের মাধ্যমে কিন্তু তার আচরণগত স্বাভাবিকতা অনেকাংশেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, দুর্নীতি বেড়েছে, মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে। কোনো একটা ঘটনা ঘটছে প্রভাবশালী বা যারা রাজনীতিবিদ, অর্থশালী অথবা অন্যভাবে প্রভাব বিস্তার করে। তাদের আওতায় চলে গেছে দেশের একটা অংশ।

নারী-শিশু এমনিতেই দুর্বল বা তাদের ফ্যামিলি দুর্বল। যার ফলে নারী-শিশুর ওপর যখন ঘটনা ঘটে, তারা টাকা-পয়সা দিতে পারবে না বলে মামলাগুলো থানা থেকে স্পেশালি দেখা হয় না, যতক্ষণ না ওপর মহলের কোনো চাপ না থাকে। সেই জায়গা থেকে চিন্তা করলে দেখা যায়, আমরা যে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছি, সেটা নৈতিকতা মূল্যবোধের অবক্ষয়, ফ্যামিলির বন্ডিং যেটা দরকার, নীতিগতভাবে যেটা আমরা করে থাকতাম বা আমাদের বাবা-মা করে থাকত, সেটা কমে গেছে। স্কুলে পড়াশোনা ছাড়া মানে পুঁথিগত পড়া ছাড়া সেভাবে শিক্ষা দেওয়া হয় না। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে, তারা না সংবাদপত্র পড়ে, না খবর দেখে, তারা তাদের মতোই জীবনযাপন করছে। হাতের মুঠে পর্নোগ্রাফি, সবকিছু মিলিয়ে একটা বিশাল অস্থিরতা আর অবক্ষয়ের মধ্যে আছি। এর প্রভাব এই শিশুগুলোর ওপর এসে পড়ছে। সে ক্ষেত্রে আমি মনে করি, এটা থেকে বের হওয়ার জন্য যদি রাষ্ট্র বা সমাজ এখন থেকে তৎপর না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের ঘটনা ঘটবে। যেটা আরো মারাত্মক আকার ধারণ করবে।

পরামর্শ : স্কুল-কলেজগুলোতে শুধু পুঁথিগত পড়া না, তাদের বলতে হবে, যারা নৈতিকতা মূল্যবোধের ওপর কোনো কাজ করবে বা সেবামূলক কাজ করবে, সমাজে ভালো কোনো কাজ করবে, সেটা শিশুরা করতে পারে। অনেক ভালো কাজ করতে হবে। সেখান থেকে তাদের শিক্ষাটা নিতে হবে।

আর যেকোনো ঘটনা বা এ ধরনের খারাপ ঘটনাই ঘটুক না কেনো, শিশু-নারী বা যেকোনো ধরনের দুর্বৃত্ত দ্বারা আক্রান্তের ঘটনাই ঘটুক না কেন, কোনো রাজনীতিবিদ কখনো এ ধরনের অপরাধীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে না। যে রাজনীতিবিদ তাদের আশ্রয় দেবে, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে জনমত তৈরি করতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, দেশে সামাজিক শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাওয়ায় নৃশংস এই ঘটনাগুলো ঘটছে। এখানে মূল্যবোধের অভাবও রয়েছে। সামাজিক শাসনব্যবস্থা জোরদার করা এবং সামাজিক মূল্যবোধ বৃদ্ধির জন্য আমাদের সবারই ভূমিকা রাখতে হবে।

দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে কয়েকটি নৃশংস ঘটনায় জাতি হতবাক। আমরাও বিব্রত হচ্ছি। এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই সভ্য সমাজের জন্য কাম্য হতে পারে না।

নিজের বাল্যকালের সামাজিক শাসনব্যবস্থার বিবরণ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা ছোটকালে বড়দের দেখলে অনেক ভয় পেতাম। তাদের প্রতি আমাদের আলাদা একটা শ্রদ্ধাবোধ ছিল। এখনো বয়স্ক কাউকে দেখলে শ্রদ্ধা ও সম্মান করি। ওই সময় এলাকায় কেউ অপরাধ করে পার পেত না। সামাজিকভাবে তার কঠোর বিচার হতো। এ ভয়ে কেউ অপরাধ করার সাহসও পেত না। এ সামাজিক বিচারব্যবস্থাটা এখন নেই বললেই চলে। এজন্যই আমাদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, সামাজিক মূল্যবোধ অনেক বড় একটি বিষয়। স্কুল, কলেজ ও মাদরাসাসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর মাধ্যমে আমরা সামাজিক মূল্যবোধ বৃদ্ধির কাজ করতে পারি। সামাজিক মূল্যবোধ বাড়িয়ে সমাজকে সব ধরনের অপরাধ থেকে মুক্ত রাখতে সবারই ভূমিকা পালন করতে হবে।

 

–এমদাদুল হক খান