এস কে সিনহার মামলার এজাহারে কি আছে?

ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভুয়া ঋণের মাধ্যমে ৪ কোটি টাকা স্থানান্তর ও আত্মসাৎ করার অভিযোগ আনা হয়েছে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে।

বুধবার দুর্নীতি দমন কমিশন, দুদকের দায়ের করা ওই মামলায় বিচারপতি এস কে সিনহা ও ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমান পদ্মা ব্যাংক) সাবেক এমডি এ কে এম শামীমসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।

আসামিরা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে অস্বাভাবিক দ্রুততার সাথে চার কোটি টাকা ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে তা একই দিনে পে-অর্ডারের মাধ্যমে আসামি এস কে সিনহার ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তর করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর আসামি মো. শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখায় আলাদা দুটি একাউন্ট খোলেন। পরের দিন ৭ নভেম্বর তাদের ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য ২ কোটি টাকা করে ৪ কোটি টাকার ঋণ আবেদন করেন। তাদের ব্যাংক একাউন্ট ও ঋণ আবেদনে এস কে সিনহার উত্তরার (১০ নম্বর সেক্টর, রোড নং-১২, বাড়ি -৫১) ঠিকানা ব্যবহার করেন তারা। এছাড়া ঋণের জামানত হিসেবে আসামি রনজিৎ চন্দ্রের স্ত্রী সান্ত্রী রায়ের সাভারের ৩২ শতাংশ জমির কথা উল্লেখ করেন। এই দম্পতি এস কে সিনহার আগে থেকেই পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

ঋণ প্রস্তাব কোনো যাচাই-বাছাই না করে ব্যাংকের নিয়ম-নীতি না মেনে ব্যাংকটির সেসময়ের এমডি আসামি এ কে এম শামীম ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুইটি ঋণ অনুমোদন করেন। ঋণ আবেদনের পরের দিন ৮ নভেম্বর পৃথক দুইটি পে-অর্ডার এস কে সিনহার নামে ইস্যু করা হয়। যা পরের দিন ৯ নভেম্বর সোনালী ব্যাংকের সুপ্রিম কোর্ট শাখায় এস কে সিনহার একাউন্টে জমা হয়। পরে বিভিন্ন সময় ক্যাশ, চেক ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে টাকা উঠানো হয়। এর মধ্যে সিনহার ভাইয়ের নামে শাহজালাল ব্যাংকের উত্তরা শাখার ব্যাংক হিসাবে একই বছরের ২৮ নভেম্বর দুইটি চেকে দুই কোটি ২৩ লাখ ৫৯ হাজার টাকা স্থানান্তর করা হয়।

এজাহারে আরও বলা হয়, আসামি রনজিৎ চন্দ্র ঋণ দ্রুত অনুমোদনের জন্য প্রধান বিচারপতির প্রভাব ব্যবহার করেছেন। রনজিৎ চন্দ্রের ভাতিজা হলেন ঋণ গ্রহীতা নিরঞ্জন এবং অপর ঋণ গ্রহিতা শাহজাহান রনজিৎ চন্দ্রের ছোট বেলার বন্ধু। ঋণ গ্রহীতা দুইজনই অত্যান্ত গরীব ও দুঃস্থ। তারা কখনও ব্যবসা-বাণিজ্য করেননি বলেও এজাহারে বলা হয়। আসামি এস কে সিনহা অপর আসামি রনজিতের মাধ্যমে অন্যান্য আসামিদের ভুল বুঝিয়ে কাগজপত্র স্বাক্ষর করার ব্যবস্থা করেন। উক্ত ঋণের চার কোটি টাকা আজও পরিশোধ করা হয়নি।

অর্থের উৎস এবং অবস্থান গোপন করে পাচারের প্রচেষ্টা করার দায়ে দণ্ডবিধি-১৮৬০ এর ৪০৯, ৪২০, ১০৯ ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন-১৯৪৭ এর ৫(২) এবং মানিল্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর ৪(২), (৩) ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।

এস কে সিনহা ছাড়া বাকি আসামিরা হলেন, ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমান পদ্মা ব্যাংক) সাবেক এমডি এ কে এম শামীম, সাবেক এসইভিপি গাজী সালাহউদ্দিন, ফাস্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, ফাস্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সাফিউদ্দিন আসকারী, ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. লুৎফুল হক, টাঙ্গাইলের বাসিন্দা মো. শাহজাহান, একই এলাকার বাসিন্দা নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা, রনজিৎ চন্দ্র সাহা ও তার স্ত্রী সান্ত্রী রায়।

এর আগে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার ব্যাংক হিসাবে চার কোটি টাকা লেনদনের ঘটনায় জালিয়াতির প্রমাণের কথা জানিয়েছিলেন দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ।

অভিযোগ অনুসন্ধানে ওই বছরের ৬ মে ও ২৬ সেপ্টেম্বর মোট আট জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ সেপ্টেম্বর ফারমার্স ব্যাংকের প্রাক্তন এমডি কে এম শামীমসহ ছয় কর্মকর্তা এবং ৬ মে মো. শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র সাহাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা এস কে সিনহার ব্যাংক হিসাবে চার কোটি টাকা স্থানান্তরের বিষয়টি স্বীকার করেন।