একটি খোলা চিঠি : হাজারো আহাজারি

আঙ্কেল ও আঙ্কেল,

তুমি কি জানো? আমি না! একজন থ্যালাসেমিয়া রোগী। প্রত্যেক মাসে আমার শরীরে রক্ত দেয়া লাগে। যদি ২ থেকে ৩ মাস আমার শরীরে রক্ত দেয়া না হয়; তাহলে আমার না অনেক সমস্যা হয়!

যেমন শরীর দুর্বল হয়ে আসে, শ্বাস কষ্ট বেড়ে যায়, মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়, সারা শরীর হলদে হয়ে যায়, পেট ফুলে যায়, কিছুই ভাল লাগে না। আর জানো তো! আমার না! ইনজেকশনের সুই আর ভাল লাগে না।

মায়ের কাছ থেকে শুনেছি আমি, জন্মের ৪ মাস বয়স থেকে প্রতি মাসে আমার শরীরে রক্ত দেয়া লাগে। শুনছিলাম! ডাক্তার আঙ্কেল আমার মায়ের সঙ্গে বলেছিল যে, আমি যে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হয়েছি, এটা নাকি আমার দোষ না, এ দোষটা নাকি আমার বাবা-মায়ের।

ডাক্তার আঙ্কেল আরও বলেছিল, আপনারা যদি বিয়ের আগে একফোঁটা রক্ত পরীক্ষা করে দেখতেন, যে আপনারা থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা; তাহলে হয়ত আপনাদের সন্তানের এই থ্যালাসেমিয়া নামক মারাত্মক রোগটি হতো না।

আবার মাকে এও বলেছিল সন্তান গর্ভে আসার ১১-১৫ সপ্তাহের ভেতর যদি আপনার গর্ভের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা; সেটাও পরীক্ষা করতেন, তাহলে আপনাদেরকে এতো ভুগতে হতো না।

ও আমার মা-বাবা তোমরা যদি সেটাও করতে, তাহলে আমি হয়তোবা কারও বোঝা হতাম না! আমি একটি অসহায় শিশু।

আমারও ইচ্ছা করে বাবার ভালোবাসা পেতে! কিন্তু তোমরা কি জানো? আমার জন্মের ৪ মাস পরে আমার বাবা যখন জানতে পারল, আমি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত এবং আমার বেঁচে থাকার জন্য এখন থেকে প্রতি মাসে ১-২ ব্যাগ রক্ত লাগবে এবং প্রতিনিয়ত অনেক টাকার ওষুধ কিনতে হবে; তার কিছুদিন পরেই আমার বাবা আমার মাকে ছেড়ে চলে গেলেন।

হে করুণাময়! কী দোষ করেছিলাম আমি, যার প্রতিশোধ এইভাবে তুমি আমার মায়ের কাছ থেকে নিলে! মায়ের মুখের দিকে তাকালে আমার খুব কান্না আসে। কেউ আমাদেরকে কোনো সহযোগিতা করতে চায় না। মনে হয় অধিকাংশ মানুষই আমাদের মত থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদেরকে বোঝা মনে করে।

আসলেই আমরা তো আপনাদের জন্য বোঝা; আর তা না হলে হয়তবা কোন জন্মের পাপের শাস্তি পাচ্ছি আমরা। আচ্ছা আপনারাই বলুন তো…!

কারা আমাদেরকে প্রতি মাসে রক্ত দেবে…?

কারা আমাদেরকে আদর করবে…?

কারা আমাদেরকে ভালোবাসবে…?

কারা আমাদের সাথে খেলবে…?

এই সুবিধাগুলি পেতে আমাদের ও খুব ইচ্ছা করে।

এরপরও যদি তোমরা বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা না করে বিয়ে করো তাহলে আমার কোনো ভাই বা বোনের যদি এমন অবস্থা হয়, তখন তাদেরকে তোমরা কি উত্তর দেবে?

আর একটি কথা,

একটু শুনুন! আমার বাবাকে কেউ গালি দেবেন না প্লিজ! সে আমার দেখাশুনা লালন-পালন, লেখাপড়া, ভালবাসা সবকিছু থেকে বঞ্চিত রেখেছে ঠিকই, কিন্তু আমি তো তার কাছে ঋণী। কারণ সে যদি আমাকে জন্ম না দিত; তাহলে আমি তো এই সুন্দর পৃথিবী দেখতে পেতাম না, এই সুন্দর পৃথিবীর অসংখ্যা ভালো মানুষের ভালোবাসা পেতাম না।

বাবা!

ও বাবা!

আমি অনেক ভাল আছি, সুখে আছি, শুধু বুকের মাঝে একটু শূন্যতা অনুভব করছি তোমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য।

ইতি তোমারই অপেক্ষায় থাকা

আমি…

লেখক : সাধন কুমার দাস

প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক

স্বজন সংঘ, স্বেচ্ছাসেবী ও সমাজকল্যাণমূলক সংস্থা, যশোর।