জটিলতার বেড়াজালে লক্ষ্মীপুরে রেললাইন

নিজস্ব প্রতিবেদক :  

কৃষিপণ্য উৎপাদনে খ্যাতি আছে উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরের। তবে এ জেলা থেকে পণ্য পরিবহন করতে হয় সড়ক নয়তো নৌপথে। অথচ রেলকেই কৃষিপণ্য পরিবহনে সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একই কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হয় এ জেলার বাসিন্দাদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাণিজ্যিক সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে ১৯৭৩ সালেই লক্ষ্মীপুরে রেললাইন স্থাপনে জরিপ চালানো হয়। তবে নানা জটিলতায় ৪৬ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি এ উদ্যোগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর নারকেল, সুপারি, সয়াবিন ও ধান উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। জেলাটির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনা নদীতে প্রচুর ইলিশও পাওয়া যায়। কৃষিনির্ভর এ জেলায় প্রায় ১৮ লাখ মানুষের বসবাস। তবে দেশে যেসব জেলার সঙ্গে বিমান ও রেল যোগাযোগ নেই, তার একটি হলো লক্ষ্মীপুর। অথচ লক্ষ্মীপুরের পাশের জেলা চাঁদপুর ও নোয়াখালীতেও রেল যোগাযোগ রয়েছে।

বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় লক্ষ্মীপুর থেকে রাজধানী, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহন ও যাতায়াত করতে হয় সড়ক ও নৌপথে।

সূত্র জানায়, রাজধানী ও চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদিন কয়েকশ ট্রাক লক্ষ্মীপুরে পণ্য আনা-নেয়া করে। এছাড়া কয়েকশ বাস ঢাকা-লক্ষ্মীপুর সড়ক রুটে যাত্রী নিয়ে চলাচল করে। ভোলার বাসিন্দারাও লক্ষ্মীপুর-ভোলা নৌরুট দিয়ে এসে একই সড়কে ঢাকায় যাতায়াত করে। এছাড়া খুলনা, বরিশালসহ ২১ জেলার পণ্য পরিবহন ও চলাচলের অন্যতম পথ হলো লক্ষ্মীপুর মজুচৌধুরীর হাট-ভোলা নৌরুট। তাই লক্ষ্মীপুরে রেললাইন স্থাপন হলে পরোক্ষভাবে এসব জেলার বাসিন্দারাও উপকৃত হবে। লক্ষ্মীপুরে মেঘনার তীরে একটি নৌবন্দর ও সাড়ে তিন হাজার একর জায়গায় একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি রেললাইন স্থাপন করলে জেলার অর্থনীতিতেও গতি আসবে।

লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৩ সালে নোয়াখালীর চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের জন্য একটি জরিপ পরিচালনা করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। পরে নানা জটিলতা ও উদ্যোগের অভাবে থমকে যায় এ কার্যক্রম। অথচ পাশের দুই জেলাই রেললাইনের আওতায় রয়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কয়েক বছর ধরেই লক্ষ্মীপুরে রেলপথ স্থাপনের জন্য রেল মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হচ্ছে। নোয়াখালীর চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর, রায়পুর হয়ে চাঁদপুর পর্যন্ত ৭৫ কিলোমিটার অথবা চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার লাইন স্থাপনের প্রস্তাবও করা হয়। কিন্তু এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্র পাল বলেন, রেললাইন স্থাপনের বিষয়ে দুবার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানানো হয়েছে। তাছাড়া সংশ্লিষ্ট দপ্তরেও চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু এখনো কোনো সুফল আসেনি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, লক্ষ্মীপুরে রেললাইন স্থাপনের জন্য ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা এম আলাউদ্দিন তত্কালীন রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হকের কাছে লিখিতভাবে আবেদন জানান। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রেলমন্ত্রী নীতিমালার আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপককে নির্দেশ দেন।

আবেদনে বলা হয়, লক্ষ্মীপুর জেলায় রেলপথ ও বিমানপথ বলতে কিছু নেই। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও রাজধানী ঢাকা থেকে পণ্য আনা-নেয়া করতে হয় সড়কপথে। এতে প্রচণ্ড দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ফেনী-চৌমুহনী-লক্ষ্মীপুর রেলপথ সংযোজন করা হলে ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর জেলার প্রায় ৮০ লাখ মানুষ রেল সুবিধার আওতায় আসবে।

আবেদনের বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এম আলাউদ্দিন বলেন, তদবির ও উদ্যোগের অভাবে আজও লক্ষ্মীপুরে রেললাইন স্থাপন হয়নি। বর্তমান সরকার রেলওয়ের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি মোতাবেক জরুরি ভিত্তিতে লক্ষ্মীপুরে রেললাইন স্থাপনের দাবি জানাই। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ পণ্য পরিবহন ও চলাচল সহজতর হবে।

এ আবেদন ছাড়াও একই বছরের ৩১ আগস্ট তত্কালীন যোগাযোগমন্ত্রী (বর্তমান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী) ওবায়দুল কাদের রেললাইন চেয়ে রেলমন্ত্রীর কাছে একটি চাহিদাপত্র (ডিও) দেন। এতে উল্লেখ করা হয়, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার অধিবাসীদের বেশির ভাগ তাদের গ্রামের বাড়িতে নিয়মিতভাবে যাতায়াত করেন। ফেনী-চৌমুহনী-লক্ষ্মীপুর রুটে ট্রেন চালু করা হলে এ অঞ্চলসহ পাশের অঞ্চলের অধিবাসীরাও যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা ভোগ করবে এবং আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে। পাশাপাশি যাত্রীসাধারণের যাতায়াত সমস্যা যেমন দূরীভূত হবে, তেমনি সরকারের বিপুল রাজস্ব আয় হবে।

এ ব্যাপারে সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এবং লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য একেএম শাহজাহান কামাল বলেন, আমি মন্ত্রী থাকাকালে লক্ষ্মীপুরে রেললাইন স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েকবার আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি রেল মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সংসদ নির্বাচনের পর রেলমন্ত্রী বদল হওয়ায় এ কার্যক্রম কিছুটা ধীর হয়ে পড়েছে।

তিনি জানান, ১৯৭৩ সালে লক্ষ্মীপুরে রেললাইন স্থাপনের জন্য জরিপ করা হয়। কয়েকটি স্টেশন শনাক্তসহ স্টেশন নাম্বারও নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে এটি সামনে আর অগ্রসর হয়নি। বর্তমান সংসদেও বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। আশা করি, শিগগির সুফল পাওয়া যাবে।