একজন মা ও পরিচয়হীন বাচ্চাদের গল্প

আমার পাশে যাকে দেখতে পাচ্ছেন তাঁর নাম হাজেরা বেগম। নামটা খুব সাধারণ তাই না? চারপাশে তাঁকালেই ‘হাজেরা বেগম ‘ নামের অনেক নারী পাওয়া যায়। কিন্তু এই মানুষটার কার্যক্রম আর দশটা সাধারণ হাজেরা বেগমের মত নয়।অসাধারণ, অভাবনীয় কার্যক্রমের ফলেই তিনি আজ বাংলাদেশের একজন পরিচিত ‘অসাধারণ’ নারী , একজন বিজয়া।

ছোটবেলার মাকে হারানো হাজেরা বেগম সৎ মায়ের যন্ত্রণায় টিকতে না পেরে মাত্র আট বছর বয়সে ঘরছাড়া হন।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে অল্প বয়সেই তাঁর ঠাই হয় পতিতালয়ের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে , পরিচিত হন পতিতাবৃত্তির সঙ্গে।
বহু বছর কাটিয়েছেন যৌনকর্মী হিসেবে ।
একসময় উপলব্ধি হলো -এই জীবন ‘জীবন’ নয়। আমার একটি সুন্দর জীবন হতে পারে!
বেরিয়ে পড়লেন এই নিকৃষ্টতম পেশা থেকে। সিদ্ধান্ত নিলেন পরিত্যক্ত , অসহায় শিশুদের জন্য কিছু করবেন যাতে যৌনকর্মীদের পরিত্যক্ত বাচ্চাদের নাম-পরিচয়হীন অসহায় জীবন কাটাতে না হয়!
২০০৩ সালে যুক্ত হলেন ৭০ জন অসহায় বাচ্চার ‘দুর্জয়’ নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে।
এরপর ২০১০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সহায়তা নিয়ে নিজেই গড়ে তুললেন একটি সংগঠন ‘ শিশুদের জন্য আমরা’।
বিভিন্ন যৌনকর্মীর সন্তানদের জন্যই এই প্রতিষ্ঠান যেখানে পিতা-মাতার পরিচয়হীন ওইসব সন্তানদের ভরনপোষণ , পড়াশোনা তথা আমাদের মতোই সাধারণ একটা জীবন দেয়ার জন্য অক্লান্ত কাজ করে যান হাজেরা বেগম।

প্রথমদিকে সংগঠনে ১৫ জন বাচ্চা থাকলেও এখন এখানে ৪০ জন বাচ্চা আছে এবং ৪০ জন বাচ্চার মা হাজেরা বেগম। এদের মধ্যে কেউ এসএসসি পাশ করেছে এইবার , কেউ ক্লাস এইটে পড়ে, ফাইভে পড়ে, সবচেয়ে ছোট ছেলেটার বয়স ছয় বছর যাকে জন্মের তিনঘণ্টা পর হাজেরা বেগমের কাছে দিয়েছিলো।সেই তিন ঘন্টা বয়স থেকে এখন বয়স ছয় বছর!

এই ৪০ টি বাচ্চার জীবন হয়তো কাটতো রাস্তায় অথবা অন্ধকার কোনো জগতে। কিন্তু সেটা হয়নি ; বরং এই হাজেরা বেগমের জন্য ওরা পেয়েছে অন্য দশটা শিশুর মতোই সাধারণ জীবন।
সকালে ঘুম থেকে জেগে ওরা কুরআন শরীফ পাঠ করে, এরপর মমতাময়ী মা হাজেরা বেগম ওদেরকে ভাত খাইয়ে দেয়।
বড় ছেলে-মেয়েগুলো স্কুলে যায়, ছোটোরা বাসায় বসে শিখে ছড়া,কবিতা, গান। হারমোনিয়াম দিয়ে গানও শিখে কেউ কেউ , গানের স্কুলেও যায়।

যতোবার কারো সাথে দেখা হবে সবাই মিলে একসাথে সালাম দেয়।
কী ভদ্রতা এই বাচ্চাগুলোর!
আবার এই বাচ্চাগুলো অসাধারণ মেধাবীও। অসাধারণ ছবি আঁকে, বোতাম সহ বিভিন্ন ফেলনা বস্তু দিয়ে মালা-আংটি বানায়, সেগুলো বিক্রি করে, আবার গিফট হিসেবে দেয় বিভিন্নজনকে(আমাকেও দিয়েছিলো কতগুলো)!

এই বাচ্চাগুলো তাদের জন্মদাতা বাবা-মায়ের পরিচয় জানে না ; ওরা শুধু জানে ওরা ৪০ ভাইবোন এবং ওদের মা- বাবা -গার্ডিয়ান সবই ওই একজন -হাজেরা বেগম।
সবজায়গায় ওদের মায়ের নাম ‘হাজেরা বেগম ‘, সকল আবদার -ভালোবাসা এই মাকে ঘিরেই।

সংগ্রামী এই হাজেরা বেগম বহু প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে নিজের পরিচয় নিজে প্রতিষ্ঠা করেছেন। কাজ করেছেন এইচআইভির প্রকোপ ঠেকানোর লক্ষ্যে , অর্জন করেছেন জাতীয়-আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বহু পুরষ্কার।

হাজেরা বেগমের স্বপ্ন -একদিন তাঁর বড় একটা বাড়ি থাকবে, সেখানে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিত্যক্ত সন্তান ঠাঁই পাবে তাঁর সন্তান হিসেবে , যাতে কেউ না ভাবে ওরা সেক্স- ওয়ার্কারের বাচ্চা!

আমি যখন তাঁকে বললাম -আমি আপনার সঙ্গে একদিন ইফতার করবো, মা।
উনি বললেন, ” আমার তো অনেক বাচ্চা, জননী “। আমি স্টুডেন্ট , অতএব এতজনকে ইফতার করানোর সামর্থ্য আমার নাও থাকতে পারে সেইটা ভেবেই হয়তো এই কথা বলেছেন!
আমি বললাম – সমস্যা নেই , সবাই মিলেই ইফতার করবো”
বললেন , ” জননী, আমার বাচ্চারা ছোলা-ভাজাপোড়া আর খেতে চায় না।তুমি কী দিয়ে ইফতার করতে চাও বলো, সেইভাবে করি”
বললাম – আমরা বরং অন্যভাবে বিভিন্ন ফল- দই-চিড়া দিয়েই ইফতার করবো!
তাইই হলো।
মমতাময়ী মা নিজ হাতে চিড়া-দই-কলা মাখিয়েছেন, ফল কেটেছেন আর আমরা ৪৪ জন একসাথে বসে ইফতার করেছি!

৪০ জন বাচ্চা হাজেরা বেগমকে ডাকে ‘আম্মু’, আমি ডাকি ‘মা’ আর তিনি আমাকে ডাকেন ‘জননী’

এই হলো আমার মা, আমাদের মা, ৪০ সন্তানের জননী হাজেরা বেগমের গল্প।

লিখেছেন ফাতিমা তাহসিন, এজিএস, শামসুন্নাহার হল ছাত্র সংসদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরো সংবাদ