খাদ্যে ভেজাল মুক্ত বাংলাদেশ চাই : রাজু আহমেদ

মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্য একটি প্রধান ও অন্যতম মৌলিক চাহিদা। জীবন ধারণের জন্য খাদ্যের কোন বিকল্প নেই। বলা হয়ে থাকে স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। সুস্বাস্থের জন্য প্রতিটি মানুষের দরকার বিশুদ্ধ, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য। আর এ বিশুদ্ধ খাদ্য সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনে সহায়ক যা সমৃদ্ধশালী জাতি গঠনে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে কিন্তু আমরা যেসব খাবার গ্রহণ করছি তা কি আসলেই নিরাপদ নাকি তার অধিকাংশই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভেজাল? নিরাপদ খাদ্য ছাড়া কেউ বাঁচতে পারেনা এটা যেমন সত্যি, অনুরুপ একটি সত্যি কথা হল ভেজাল খাদ্য আমাদের বেশিদিন টিকে থাকতে দিবেনা। বর্তমানে দেশে খাদ্যে ভেজাল যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।পূর্বে যে পরিমাণ খাদ্যে ভেজাল ছিল বর্তমানে দিন দিন তা মহামারি আকার ধারণ করছে। দেশে এমন কোন খাদ্য দ্রব্য নেই যেখানে ভেজালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবেনা। রাজধানী ঢাকাসহ জেলা, উপজেলা এমনকি গ্রাম পর্যায়ে সবাইকে ফাঁকি দিয়েই ভেজাল দ্রব্যের রমরমা ব্যবসা চলছে।যার দরুন ভেজাল এমন এক পর্যায়ে পৌছেছে যে, নকল জিনিসের ভিড়ে আসল জিনিস চেনাটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশে খাদ্যদ্রব্যে যে পরিমাণ ভেজাল মেশানো হচ্ছে তাতে কোন কার্যকরি পদক্ষেপ না নিলে আশংকা করা যাচ্ছে যে পরবর্তী কয়েক বছর পর কোন খাদ্যই ভেজালমুক্ত থাকবেনা।এই মুহুর্তে সাম্যবাদী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই কবিতাটির কথা মনে পড়ছে। তিনি লিখেছেন ‘‘ভেজাল, ভেজাল, ভেজাল রে ভাই ,
ভেজাল সারা দেশটাই,
ভেজাল ছাড়া খাঁটি জিনিস মিলবে নাকি চেষ্টায়!
খাঁটি জিনিস এই কথাটা রেখো না আর চিত্তে
ভেজাল নামটা খাঁটি কেবল,
আর সকলই মিথ্যে।’’এ কথা বুঝতে বাকি থাকেনা যে, এই কবিতাতে কবি বর্তমান বাংলাদেশের উনড়বয়নের পথে ‘গলার কাঁটা ’ খ্যাত ‘খাদ্যে ভেজাল’ কেই ইঙ্গিত করেছিলেন। তার অনেক বছর আগে বলে যাওয়া কথা যে বাস্তবরূপে পরিণত হবে তা কি কেউ ভেবেছিল? এ পরিপ্রেক্ষিতে আরও একটি বাস্তবউদাহরণ দিতে চাই ওয়াটার লু’র যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর নেপোলিওনকে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বন্দী করে রাখা হয়। কথিত আছে যে, প্রতিদিন খাবারের সাথে অল্প পরিমাণ আর্সেনিক মিশিয়ে নেপোলিওনকে খেতে দেওয়া হত। এভাবে স্লো পইজনিংয়ের মাধ্যমে
ফরাসি সেনাপতি নেপোলিওনকে তাদের চির শত্রু ব্রিটিশরা হত্যা করে। এই ঘটনার সূত্রপাত ধরে বলা যায় যে, বর্তমানে বাংলাদেশীরা নিজেরা নিজেদেরকে স্লো পইজনিংয়ের মাধ্যমে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।দেখা যাচ্ছে যে ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ভেজাল প্রয়োগ করছে সেই ব্যক্তিরাই আবার অন্য কোন দোকান থেকে ভেজাল খাদ্যদ্রব্য কিনে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তাই হয়ত নীরাদ সি চৌধুরী বাঙালীদের ‘আত্মঘাতী বাঙালী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
বর্তমানে দিন দিন বাজার ব্যবস্থায় ভেজালের উপস্থিতি বেড়ে যাওয়ায় সমন্বয়ে আসল জিনিস হারিয়েই যাচ্ছে। দূর্নীতির বেড়াজালে আবদ্ধ এবং রাজনৈতিক বিবেচনা নির্ভর এ দেশে আইনের শাসনের সঠিক ও সুষ্ঠু প্রয়োগ না থাকার সুযোগে এক শ্রেণীর অসাধু ও অর্থলোভী ব্যবসায়ী অধিক লাভের আশায় জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা না করে খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

তাদের বিবেক বুদ্ধি বলে কিছুই নেই যেন সাধারণ মানুষকে ঠকানোই তাদের উদ্দেশ্য। আজ ¯্রষ্টার শ্রেষ্ঠ জীব হয়েও মানুষ এমন নিকৃষ্ট কাজে লিপ্ত হচ্ছে। আর যারা খাদ্যে ভেজাল দিয়ে নিরব হত্যাকান্ড চালাচ্ছে আর যাই হোক তারা কখনো মানুষ হতে পারেনা বরং তাদেরকে পশু বলাটাই শ্রেয় হবে।আর তারা যা করছে তা দেশ ও জাতির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।যারা এই ধরনের জঘন্য কাজে লিপ্ত, তাদের কাছে আমার প্রশড়ব হলো আপনারা কি এই ভেজাল থেকে মুক্ত? মানুষের ভালো করতে না পারেন অন্তত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিবেন না।
আমাদেরকে মাছেভাতে বাঙালী বলা হয় কারণ আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত। ভাত ছাড়া আমাদের একদমই চলে না। অন্য কিছু খেলেও একমুঠো ভাতই যেন তৃপ্তির খোরাক যোগায়।কিন্তু দুঃশ্চিন্তা তখনই এসে হানা দেয় যখন জানতে পারি আমরা যে চাল রানড়বা করে খাই সেই চালে লুকিয়ে আছে ভেজালের ছাপ। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চাল স্বচ্ছ ও ঝকঝকে করতে মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক। ব্রি ২৮,২৯,৩৯ ও ৫০ জাতের ধানের খোসা ছাড়িয়ে তাতে ডিটারজেন্ট বা উচ্চমাত্রার ক্ষার মিশিয়ে নরম করার পর ছোট করে ফেলে এরপর তাতে ইউরিয়া সার ব্যবহার করে সাদাতে পরিণত করে বাজারে মিনিকেট বলে উচ্চদামে বিক্রির এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করছেন ব্যবসায়ীরা। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, ইউরিয়া ও ক্ষার মিশে যাওয়ায় বিষ ঢুকছে মানব শরীরে যাতে করে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে সাধারণ জনগণ।চাল থেকে মুড়ি উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইড, যা হাইড্রোজ হিসেবে পরিচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইড্রোজ খাদ্যের সঙ্গে মিশে পেটে গেলে মানব দেহের রক্তের শ্বেত কণিকা ও হিমোগ্লোবিনের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়।
অন্যদিকে শাকসবজিতে পোঁকামাকড় মুক্ত রাখতে মেশানো হচ্ছে রাসায়নিক কীটনাশক। শুধু ব্যবসায়ীক ফায়দা হাসিলের স্বার্থে মাছে ফরমালিনসহ নানা কেমিক্যাল ব্যবহার করে মাছকে বানাচ্ছে বিষ। যা আমিষের চাহিদা মেটানোর কথা তার বদৌলোতে আমরা ফরমালিন পাচ্ছি একদম ফ্রিতে।বাজারের তাজা মাছগুলোকে ইনজেকশন দিচ্ছে শুধুমাত্র বেশি দামে বিক্রির জন্য। বর্তমানে দেশে গরু মোটাতাজাকরণের নামে ক্ষতিকর পদার্থ খাওয়ানো হচ্ছে এদিক থেকেও আমরা নিরাপদ কোথায়। পোল্ট্রি মুরগীর কথা না বললেই নয়, অধিক মুনাফা লাভের আশায় ব্যবসায়ীরা মুরগীর খাবারে টেনারীর বর্জ্য, ভয়ংকর বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত চামড়ার ভুষি ব্যবহার করছে। এতে করে মুরগীর মাংস ও ডিম বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। আবার কোন কোন ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে সোডিয়াম কার্বাইড। সরিষার তেলে ঝাঁঝ বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয় এক ধরণের কেমিক্যাল এবং আকর্ষনীয় রং করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে টেক্সটাইল কালার।
আমরা জানি, ফল’ই বল।কিন্তু কতটুকু বল যোগাচ্ছে তা এবার জানা যাক। ফলগুলোতে সুরক্ষার জন্য নিয়মিত মেশানো হচ্ছে কার্বাইট। কাঁচা আম থেকে শুরু করে কোন ফল’ই যেন রেহাই পাচ্ছে না বিষাক্ত রাসায়নিক থেকে। আমরা কখনো কল্পনা করতে পারিনি ডাবও এর অন্তর্ভুক্ত হবে।সিরিঞ্জ দিয়ে ডাবের পানি বের করে নিয়ে তাতে ঢুকানো হচ্ছে নকল ডাবের পানি। আর তরমুজের ভিতরে সিরিঞ্জ দিয়ে প্রবেশ করানো হচ্ছে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট যার ফলে তরমুজের ভিতরের অংশ লাল টকটকে হয়। অন্যদিকে কলা পাকানো হচ্ছে ইথিলিন দিয়ে। অপরিপক্ব টমেটো হরমোন দিয়ে পাকানো হচ্ছে। এভাবে প্রত্যেকটি ফলেই কমবেশি ভেজাল বিদ্যমান।এবার আসি বেকারীর পণ্যে, এ জাতীয় পণ্য তৈরী করা হচ্ছে সম্পূর্ণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। ব্রেড, বিস্কুট, কেক সহ নানা লোভনীয় জিনিস তৈরীতে ব্যয় কমানোর জন্য আটা, ময়দা, ডালডা, তেল, পঁচা ডিমসহ নি¤ড়বমানের উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে।ইতিমধ্যে বাংলাদেশ বিভিনড়ব দেশে ঔষধ রপ্তানীতে সুনাম অর্জন করেছে। আর এই সুযোগ গ্রহণ করে কিছু অস্বাধু ব্যবসায়ী নকল ঔষুধ তৈরী করে বাজারে ছাড়ছে। যে ঔষধ সেবন করলে রোগ নিরাময় হওয়ার কথা সেই ঔষধই কেড়ে নিচ্ছে লাখো মানুষের জীবন। তাহলে এই নিরব হত্যার দায় কে নিবে। এবার আসি সোয়াবিন তেলের কথা, এতে মেশানো হচ্ছে ফলিক এসিড যার পরিমাণ শতকরা ২.৮ ভাগ আর সহনীয় মাত্রা হলো ২ ভাগ। একই সাথে ময়দাতে চক পাওডার এবং বিস্কুট, আইসμিম, কোল্ডড্রিংকস, জুস, সেমাই, আঁচার, নুডুলস ও মিষ্টিতে টেক্সটাইল ও লেদার রং মেশানো হচ্ছে। অপরদিকে পানিতে ক্যাডমিয়াম, লেড ও ইকোলাই, লবণে সাদা বালু, চা’য়ে করাতকলের গুঁড়া, গুঁড়া মসলাতে ভূষি, কাঠের গুঁড়া, বালু বা ইটের গুঁড়া ও বিষাক্ত রং মিশিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে।বর্তমান দেশে ফাস্টফুড μমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নিরাপদ খাদ্য ও সুষ্ঠু পরিবেশের কারণে রেস্ট্যুরেন্টমুখী হচ্ছে সবাই। জনপ্রিয় খাবার গুলোর মধ্যে রয়েছে পিজ্জা, বার্গার, স্যান্ডউইচ, আইসμিম, চিকেনফ্রাই, প্যাটিস, পাস্তা এবং কোমল পানীয়। এসব খাবার লোভনীয় ও মজাদার করতে মিশানো হচ্ছে উচ্চমাত্রার চর্বি উপাদান, ক্ষতিকর টেস্টিং সল্ট, মেয়নিজ বা চীজ।

এতে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এরই মধ্যে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকার কারণে বিএসটিআই এনার্জি ড্রিংকস ও জুস কোম্পানীগুলোকে অনুমোদন দেয়নি। তবুও তারা তা উপেক্ষা করে পণ্য বাজারজাত করছে।উদাহরণ হিসেবে বলা যায়,বাংলাদেশের খ্যাতনামা কোম্পানী ‘প্রাণ’ কে জুস উৎপাদনসহ আটটি পণ্যের লাইসেন্স বাতিল করেছে। সেগুলো হলো-প্রাণ টোস্ট বিস্কুট, চানাচুর, ম্যাংগো বার, চাল, ঝালমুড়ি, চিড়া ভাজা, চিড়ার লাড্ডু, পটেটো μ্যাকার্স ও মাস্টার্ড ওয়েল।পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায় দেশে শিল্প খাতে ফরমালিনের প্রয়োজন হয় ৪০ থেকে ৫০ টন। কিন্তু বর্তমানে আমদানী করা হয় ২৫০ টনেরও বেশি অর্থাৎ সহজে বুঝা যাচ্ছে যে, বাকি ফরমালিন ব্যবহৃত হচ্ছে আমাদের খাদ্যদ্েরব্য। কিন্তু এই ফরমালিনগুলো কোথায় বিμি করা হয় তার সুষ্ঠু হিসাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। অনেক সময় দেখা যায় বিভিন্ন বাজারকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তা আসলে ফরমালিনমুক্ত কিনা এ নিয়ে দ্বিধা-সংশয় থেকেই যায়।প্রμিয়াজাত খাবারে মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল, ফরমালিন, কার্বাইট, খাওয়ার অনুপযুক্ত টেক্সটাইল কালারগুলো ব্যবহারে শিশুসহ সবার স্বাস্থ্য আজ হুমকির মুখে। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে যে উপসর্গগুলো দেখা যায় সেগুলো হলো-পেটব্যাথা সহ বমি হওয়া, মাথা ঘোরা, মল পাতলা বা হজম বিঘিড়বত মল, শরীরে ঘাম বেশী হওয়া, দূর্বল হয়ে যাওয়া, পালস রেট কম বা বেশী হওয়া, ক্ষুধা মন্দা, কিডনীর সমস্যা, এ্যাজমা, লিভার ফাংশনে আμান্ত হওয়া, এ্যালার্জি, চর্মরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ব্রেইনস্ট্রোক, হার্টএটাক ও ক্যান্সার ইত্যাদি।বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে,‘‘বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে প্রতিবছর দূষিত খাবার খেয়ে ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ মারা যায় এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী ১০ শিশুর তিন জনই ডাইরিয়ায় ভোগে।’’
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে,‘‘ প্রতিবছর ভেজাল খাদ্য খেয়ে তিন লাখেরও বেশী মানুষ ক্যান্সারে আμান্ত হচ্ছে।আর প্রায় দেড় লাখ মানুষ ডায়াবেটিস এবং প্রায় দুই লাখ মানুষ কিডনী রোগে আμান্ত হয়।’’ বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে গর্ভবতী মা ও শিশু। এতে শারীরিক জটিলতা দেখা দেয় এবং অনেক শিশু বিকলাঙ্গ/পঙ্গু হয়ে জন্মগ্রহণ করে। ভেজাল খাদ্যের ফলে যদি আগামী দিনের ভবিষ্যতরা বিকলাঙ্গ হয় তাহলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে ভুমিকা রাখবে কে? এমন প্রশড়ব থেকেই যায়।ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. তাজমেরী এস.এ ইসলাম বলেন,‘‘ ইউরিয়া ও হাইড্রোজ হচ্ছে এক ধরণের ক্ষার। এগুলো পেটে গেলে রাসায়নিক বিμিয়ার মাধ্যমে পেপটিন এসিড তৈরী করে যা ক্ষুধামন্দা, খাবারে অরুচি, বৃহদান্ত ও ক্ষুদ্রান্তে প্রদাহসহ নানারকম শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি করে।’’জাতীয় কিডনি রোগ ও ইওরোলজি ইন্সটিটিউটের ডা. আহমদ সাইফুল জব্বার বলেন,‘‘মেটাল বেইজড ভেজাল খাবারে কিডনী স¦ল্পমাত্রা থেকে সম্পূর্ণ বিকল হতে পারে। পরিপাকতন্ত্রে ভেজাল খাবারের জন্য হজমের গন্ডগোল, ডাইরিয়া এবং বিভিনড়ব জটিল রোগে আμান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।’’ঢাকা শিশু হাসপাতালের এনেসথেশিয়া ডা.মো. মিল্লাত ই ইব্রাহিম বলেন,‘‘বিভিন্ন ধরণের শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদনের জন্য কীটনাশক ব্যবহারকরণের ফলে এ খাবারগুলোতে একটি সময় পর্যন্ত বিষμিয়া কার্যকর থাকে যা রানড়বা করার পরেও অটুট থাকে। তাছাড়া বিভিনড়ব ধরণের মুখরোচক খাবার ও ফলমূল আকর্ষনীয় করে ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করার জন্য ক্ষতিকর কার্বাইট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল রং, ফরমালিন ও প্যারাথিয়ন ব্যবহার করা হয়।এগুলো গ্রহণের ফলে কিডনী, লিভার ফাংশন, এ্যাজমা সহ বিভিনড়ব প্রকার জটিল রোগে আμান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ভেজাল খাবারের কারণে যে রোগগুলোর দ্বারা মানুষ বেশী আμান্ত হয় তা হলো- এ্যালার্জি, এ্যাজমা, চর্মরোগ, বমি, মাথাব্যাথা, খাদ্য বিষμিয়া, অরুচি, উচ্চরক্তচাপ, ব্রেইনস্ট্রোক, কিডনী ফেলিউর ও হার্ট এ্যাটাক ইত্যাদি।’’সরকার জনগোষ্ঠীর খাদ্য-স্বাস্থ্য উনড়বয়ন তথা খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ২০০ ধরণের মারাত্মক রোগ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ১৯৫৯ সালের বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ রহিত করে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’ প্রণয়ন করেছেন।এছাড়াও ভ্রাম্যমান আদালত অধ্যাদেশ-২০০৯, পয়জনস এ্যাক্ট-১৯১৯, ভোক্তা অধিকার আইন-২০০৯ ও নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ ইত্যাদি আইন রয়েছে।অন্যদিকে ভেজালমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ভেজাল প্রতিরোধে বহু আইন আছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আশানুরুপ ফলাফল পাওয়া যায়নি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠা করা হলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই আইন যথেষ্ঠ হয় নি। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউটে উনড়বতমানের কোন পরীক্ষাগার নেই। উন্নতমানের যন্ত্রপাতি না থাকার কারণে খাদ্যদ্রব্যের ভেজাল চিহ্নিত করতে কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হন। কিছু খাদ্য ব্যতীত বেশীর ভাগই বাহিরের দেশ থেকে পরীক্ষা করে আনা হয়। অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ভেজাল বিরোধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সফল হচ্ছে।কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো তারা সম্পুর্ণভাবে ভোক্তা অধিকার আইন-২০০৯ অনুযায়ী ভেজাল বিরোধীদের উপরে যথাযথ আইন প্রয়োগ হচ্ছে না। নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ অনুযায়ী খাদ্যে ভেজাল বা রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর অভিযোগে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদন্ড ও ১০ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।কিন্তু এ আইন অনেকাংশেই কার্যকর করা হচ্ছে না। অনেক সময় এদের কেউ হাতেনাতে ধরা পড়লে কমবেশী জরিমানা আদায় করা হলেও অন্য কোন শাস্তি বা কারাদন্ড দেওয়া হচ্ছে না। যার ফলে জরিমানা দেওয়ার পর পুনরায় তারা ভেজাল মেশানোর কাজে লিপ্ত হচ্ছে। তাই এ পরিস্থিতিতে ভোক্তা অধিকার আইন-২০০৯
অনুযায়ী শাস্তি প্রদান করলে ভেজালের পরিমান কমে যেত।ভেজাল বিরোধী আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ হলে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ যেমন আশা করা যাবে তেমনি অসাধু ব্যবসায়ীরাও নিয়ন্ত্রণে থাকতে বাধ্য হবে। তাই বিএসটিআইএ আধুনিক যন্ত্রপাতি সহ উনড়বতমানের পরীক্ষাগার নির্মাণ করতে এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে যথেষ্ট আইন প্রয়োগ করে ভেজালকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও কারাদন্ড প্রদান করার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানাবো।ভেজাল ও বিষাক্ত খাবার থেকে নিরাপদ থাকতে ভেজাল বিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। আমাদের বাজার থেকে একেবারে ভেজাল পণ্য তুলে দিতে হবে। বিএসটিআইকে এ ব্যাপারে নিতে হবে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা। দেশের প্রত্যেকটি কারখানা থেকে খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনের সময় বিএসটিআইকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাজারে ছাড়ার অনুমতি দিতে হবে। রাজধানী ঢাকা সহ জেলা, উপজেলা সহ গ্রাম অঞ্চলের বাজারে নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান জোরদার করতে হবে।সর্বোপরি ভেজাল প্রতিরোধ করতে হলে শুধু সরকারের উপর নির্ভর করে না থেকে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে। প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ থাকবে শহর থেকে শুরু করে দেশের মফস্বল অঞ্চলের মানুষদেরকে খাদ্যে ভেজাল বিষয়ে সবাইকে অবহিত করুন। এতে করে সবাই সচেতন হতে পারবে এবং ভেজাল বিরোন্দোলন গড়ে তুলতে সচেষ্ট হবে। পরিশেষে বলতে চাই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে অন্তরায় হলো ভেজাল তাই আসুন সবাই মিলে ভেজাল বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলি। আর সম্মিলিত কন্ঠে বলি
‘ভেজাল মুক্ত দেশই হবে ডিজিটাল বাংলাদেশ।’