৮০ শতাংশ বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন নারীদের : অভিযোগ পরকীয়ার

পরিবারের পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করেছিলেন অনু (ছব্দনাম)। এরপর কেটে গেছে ১২ বছর। বর্তমানে দু’সন্তানের জননী। কিন্তু এত দিনের সংসার জীবনের ইতি টানতে যাচ্ছেন তিনি। মাসখানেক হলো বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করেছেন। স্বামীর পরকীয়ায় আসক্তি এবং মাদক সেবনের যন্ত্রনায় অতিষ্ট হয়ে তিনি বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে প্রিয়.কমকে জানিয়েছেন। শুধু অনুই নয়, স্বামীর পরকীয়ার কারণে আরো অনেক নারীই বিবাহ বিচ্ছেদকে বেছে নিয়েছেন।

রাজধানীর বিভিন্ন কাজী অফিস ও বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করেছেন এমন একাধিক নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিচ্ছেদের মূল কারণ স্বামীর পরকীয়ায় আসক্তি। এছাড়া মাদকের প্রতি আসক্তও একটি কারণ। কেউ কেউ বলেছেন, বিয়ের পরে স্বামীরা সারাক্ষণ সন্দেহ করে, গায়ে হাত তোলে, যার কারণে তারা বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করেছেন। বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন জমা দেওয়া পুরুষরা জানিয়েছেন, স্ত্রী পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ায় তারা বিচ্ছেদ চান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় সাড়ে চার বছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে ১৬ হাজার ৩৮৮টি। এর মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত বিচ্ছেদের আবেদন করা হয়েছে ২৮০০টি। ২০১৪ সালে ৪৬০০টি, ২০১৩ সালে ৪৪৭০টি এবং ২০১২ সালে ৪৫১৮টি বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে। এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৮০ শতাংশ আবেদন করেছেন নারীরা। আর ২০ শতাংশ আবেদন করেন পুরুষরা।

মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিবাহ বিচ্ছেদের সুদূরপ্রসারী একটা প্রভাব আছে। আর পরকীয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো আধুনিকতার প্রভাব। তবে নারী স্বাধীনতার দিক থেকে বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে অবকাশ রয়েছে। আর নারী নেত্রীদের মতে, নারীর আত্মনির্ভরশীলতায় তাদের এই সাহসিকতা তৈরি করছে। আত্মমর্যদাশীল হতে শিখেছেন নারীরা। বিয়ের এক বছর পার না হতেই বিচ্ছেদের আবেদন করছেন রত্না (ছব্দনাম)। সেলফোনে এ নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। রত্না জানান, প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন তিনি। কিছুদিন যেতেই বুঝতে পারেন অন্য নারীর সাথে রাতে ফোনে কথা বলেন তার স্বামী। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন স্বামী পরকীয়ায় আসক্ত। অনেক চেষ্টা করেও তিনি তার স্বামীকে পরকীয়া থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেননি। এ কারণেই তিনি বিচ্ছেদের আবেদন করেছেন। অন্য নারী আসক্তির বিষয়ে কথা বলতে গেলে স্বামী তাকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে বলেও অভিযোগ করেন রত্না।

তবে পরকীয়ার বাইরেও বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। আর এটি হচ্ছে মাদকের প্রতি আসক্তি। বিচ্ছেদের আবেদন করা শর্মিলা জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বিয়ে করেছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক ছেলেকে। পরে জানতে পারেন স্বামী মাদকাশক্ত। স্বামীর মাত্রাতিরিক্ত মাদকাশক্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি বিচ্ছেদের আবেদন করেছেন বলে জানিয়েছেন। এ সম্পর্কে নারী নেত্রী খুশি কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘আমার অভিজ্ঞতা বলে নারীর চেয়ে পুরুষরাই তালাক বেশি করে। নারীরা তাদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সব সহ্য করে আসে।

তবে যদি নারীরা সত্যিই আবেদন বেশি করে সেটা ভালো লক্ষণ। আর পরকীয়া যদি ছেলেরা করে সেটা তো মুখ বুঝে সহ্য করা যায় না। এখন নারীরা প্রতিবাদের ভাষা শিখেছে।’ বিবাহ বিচ্ছেদে পরকীয়ার প্রভাব নিয়ে কথা হয় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বিবাহ বিচ্ছেদ শুধু বিচ্ছেদ নয়, এটার প্রভাব মনোজগতের বিশাল জায়গা জুড়ে রয়ে যায়। সন্তান থেকে শুরু করে সমাজ পর্যন্ত এর প্রভাবে নড়বড়ে হয়ে পড়ে।’ এই মনোবিজ্ঞানী প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘মানুষের সহনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে বিচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে। তবে পরকীয়ার কারণ হিসেবে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা যায় আধুনিকতাকে, যেখানে মোবাইল বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে সহজেই অন্য কারো যোগাযোগ করা যায়।’

আধুনিকতার প্রভাবে পরকীয়ার বিস্তার ঘটার বিষয়কে সমর্থন করে সমাজবিজ্ঞানীর অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বিশ্বাসের বাইরে চলে গেলে তারা তালাকের আবেদন করে। তবে নারীদের দিক থেকে বেশি আবেদন পড়াকে তিনি নারী মুক্তির জন্য ভালো দিক বলে চিহ্নিত করেন। এর কারণ হিসেবে তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘পুরুষেরা অনেক কিছু এড়িয়ে চলতে পারে। বাইরে বিভিন্নভাবে বিনোদিত হতে পারে। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই। মোট কথা ভিতরে রোগ থাকলে এক সময় তা বিকশিত হবেই।’ নারীরা ক্রমাগতভাবে এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন। তারা এখন আর স্বামীদের নির্যাতন সহ্য করে না। মাদককে তারা এখন আর প্রশ্রয় দেয় না। আর এই কারণেই নারীরা বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করেন বলে মত দেন ড. তাজুল ইসলাম। এই কথার সঙ্গে কিছুটা একমত প্রকাশ করেন নারী নেত্রী শিরীন আক্তার। তিনি বলেন, ‘নির্যাতিত নারীরা এখন আর সব বিষয়গুলো সহজভাবে নিতে রাজি না। তারা সচেতন হয়েছ