লক্ষ্মীপুরে খাবার দোকানে সার কীটনাশক বিক্রি, অস্তিত্বহীন ডিলার

নিজস্ব প্রতিবেদক :
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার চর বংশী ইউনিয়নের সমিতির হাট এলাকার একটি দোকান। নাম তার ফারুক স্টোর। টিনসেট এ দোকানটি ৮নং দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড সদস্য (মেম্বার) ফারুক হাওলাদারের। দোকানটির একপাশে বিক্রি হচ্ছে, পেঁয়াজ, লবণ, সিগারেট, পান-সুপারি, চা, বিস্কুটসহ নিত্য পণ্য সামগ্রী। অন্যপাশে সার ও কীটনাশক ওষধ। যদিও সার-কীটনাশক বিক্রি করার নেই কোন লাইসেন্স।

শুধু মেম্বার ফারুকের দোকানেয় নয়, জেলার সর্বত্র অনুমোদনহীনভাবে চলছে সার ও কীটনাশক ব্যবসা। স্বল্প পুঁজিতে লাভ বেশি হওয়ায় যত্রতত্র গড়ে উঠেছে এসব দোকান। অধিকাংশ দোকানই পরিচালিত হচ্ছে মুদি অথবা চায়ের দোকানেই। অন্যদিকে সেমিপাকা ঘরে সার ও কীটনাশক বিক্রির নিয়ম থাকলেও তা মানছেনা বেশিরভাগই অনুমোদনপ্রাপ্ত ও অনুমোদনহীন দোকানগুলো। ফলে সার ও কীটনাশকের গুনগত মান নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে খাবার দোকানে সার ও কীটনাশক বিক্রি হওয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।

জানা যায়, জেলার ৫৮ টি ইউনিয়ন ও ৪ টি পৌরসভায় অনুমোদনকৃত ৬০ জন বিসিআইসি ডিলারের অধীনে ৪৪৪ জন খুচরা বিক্রেতা রয়েছেন। একজন বিসিআইসি সার ডিলার সরকারের কোষাগারে ২ লক্ষ টাকা ও খুচরা বিক্রেতা ৩০ হাজার টাকা জামানত দিয়ে লাইসেন্স (কার্ড) সংগ্রহ করে সার বিক্রি করছেন। নিয়মনুসারে সরকারি ইউরিয়া, টিএসটি, ডিএপি ও এমওপি সার বিসিআইসি ডিলারদের অধীনে বরাদ্ধ আসবে। আর ঐ সার তাঁর ইউনিয়নের কার্ডধারী খুচরা বিক্রেতাদের মাঝে সুষম বন্টন করবেন। কার্ডধারী বিক্রেতাগণ কৃষকদের চাহিদা অনুসারে তাদের কাছে সার পৌঁছে দিবেন।

আরো জানা যায়, প্রশাসনের সুষ্ঠ তদারকি না থাকায় কতিপয় ডিলারগণ ব্যক্তিস্বার্থে সরকারি বরাদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা (ডিলারদের) থেকে সার নিয়ে যত্রতত্র বিক্রি করছেন। ফলে জেলার পাঁচটি উপজেলায় এক সহাস্রাধিক অবৈধ সার বিক্রেতার দৌরাত্ম্যে বেকায়দায় পড়েছেন কার্ডধারী ব্যবসায়ীরা।

কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করে বলেন, অধিকাংশ দোকানেই নির্দিষ্ট দামে সার বিক্রি হয় না, ফলে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে ক্রয় করছেন তারা। আর এসব বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কৃষি অফিসে অভিযোগ করেও কোন লাভ হচ্ছে না বলেও জানান তারা।
খুচরা ডিলাররা অভিযোগ করে বলেন, কৃষি কর্মকর্তা ও বিসিআইসি ডিলারদের সহযোগিতায় যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অনুমোদনহীন সার ও কীটনাশকের দোকান। অন্যদিকে বিসিআইসি ডিলারগণ নির্দিষ্ট এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা না করায়, সার সংগ্রহ করতে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাদের। এছাড়াও কয়েকজন বিসিআইসি ডিলারের দোকান ও গুদাম ঘরের নেই কোন অস্তিত্ব বলেও অভিযোগ করেন তারা।

জেলার রায়পুর উপজেলার ৪ নং সোনাপুর ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার এর মালিক এ বি এম জিলানী বলেন, দোকান অথবা গুদাম ঘরের কোন প্রয়োজন নেই। বরাদ্ধকৃত সার যখন পাওয়া যায়, সাথে সাথে খুচরা ডিলার ও পাশ্ববর্তি বিসিআইসি ডিলারদের মাঝে বন্টন করে দেওয়া হয়। তিনি আরো বলেন, কখনো নিরীক্ষা আসলে ইউনিয়নের একটি খুচরা ডিলারের দোকানকে নিজ বিসিআইসি ডিলার পয়েন্ট বলে চালিয়ে দিবেন।

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশনের (বিএফএ) লক্ষ্মীপুর জেলা শাখার এক নেতা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, কিছু অসাধু ডিলারদের কারনেই যত্রতত্র অনুমোদনহীন সারের দোকান গড়ে উঠেছে। এই বিষয়টি কৃষি কর্মকর্তাদের বারবার জানিয়েও কোন লাভ হয়নি। ফলে ক্ষতিগস্ত হচ্ছে কার্ডধারি ডিলার ও কৃষকগণ।

রায়পুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) তানভির আহম্মেদ সরকার বলেন, তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় অনুমোদনহীন সারের দোকান নেই। অন্যদিকে সারের ডিলারগণ নির্দিষ্ট আয়তনে ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে দাবি করেন তিনি। ডিলারদের বিভিন্ন অনিয়মে সহযোগিতা করছে কৃষি অফিস? এমন প্রশ্নের জবাবে এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, এখানে কোন অনিয়ম নেই, আর অনিয়ম থাকলেতো সহযোগিতার প্রয়োজন হবে।

এ বিষয়ে জেলা স্যানেটারি কর্মকর্তা নুর আলম জানান, কয়েকটি খাবার দোকানে সার ও কীটনাশক বিক্রি হচ্ছে। যা স্বাস্থের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর। এজন্য দোকান মালিকদের কীটনাশক বিক্রি বন্ধের জন্য নোটিস করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ও সার বীজ তদারকি কমিটির সভাপতি অঞ্জন চন্দ্র পাল বলেন, অনুমোদনহীন সারের দোকানগুলোর বিষয়ে খুব শিগ্রই ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। এছাড়া যেসব খাবার দোকানে সার ও কীটনাশক বিক্রি হচ্ছে, সেগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বিসিআইসি ডিলারদের দোকান ও গুদাম ঘরের অস্তিত্ব নেই, এমন বিষয়টির সত্যতা পেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

শীর্ষ সংবাদ/এফএইচ