মেলেনি খাদ্য সহায়তা, মাছ শিকারে লক্ষ্মীপুরের জেলেরা

নিজস্ব প্রতিবেদক :
লক্ষ্মীপুরের রামগতি থেকে চাঁদপুরের ষাটনল পর্যন্ত মেঘনা নদীতে (মার্চ-এপ্রিল) দু’মাস মাছ ধরা বন্ধ। উদ্দেশ্য, জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি। ওই সময় বেকার জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করেছে সরকার। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার এক মাসেও মেলেনি সেই খাদ্য সহয়ায়তা। আবার নিবন্ধিত জেলে তালিকায়ও রয়েছে অসংঘতি। প্রকৃত জেলেদের বঞ্চিত করে ব্যবসায়ী, কৃষক, রাজনৈতিক নেতাদের এ খাদ্য সহায়তার দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। জীবিকার তাগিদে বাঁধ্য হয়েই নদীতে মাছ শিকারে নামছে জেলেরা।

এদিকে রাতে অরক্ষিত থাকে মেঘনা নদী। এ সুযোগে জেয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে রাতভর টলারে চলে মাছ শিকার। ভোরে অস্থায়ী মাছঘাটে চলে লাখ-লাখ টাকার জাটকা ইলিশ বেচা-বিক্রি। অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে মৎস্য শিকারে মহাৎসব চলছে লক্ষ্মীপুরের উপকূলীয় এলাকায়।

জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার ধায়ে এক মাসে ৪৯টি ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হয়। এতে ২৬জন জেলেকে গ্রেফতার ও ১৪ লাখ মিটার কারেণ জাল ও ১৫৪ মিটার সাধারণ জাল আগুনে পুড়িয়ে নষ্ট করা হয়। এছাড়াও মামলা হয়েছে ২৭টি, জরিমানা আদায় হয়েছে ৮৩ হাজার টাকা।

সূত্রে আরো জানা যায়, লক্ষ্মীপুরে ৬২ হাজারেও বেশি জেলে রয়েছে। সরকারের নিবন্ধিত জেলে সংখ্যা ৫০ হাজার ২৫২জন এবং আইডি কার্ডধারী জেলে সংখ্যা ৪২ হাজার ৩২৬। মার্চ-এপ্রিল দু’মাস অভয়াশ্রম মৌসুমে নদীতে মাছ ধরা নিষেধ। জাটকা সংরক্ষণকালীন এ সময় বেকার ২৫ হাজার ৯৪৭টি জেলে পরিবারকে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়।

অন্যদিকে জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাস কর্মকর্তার মাহফুজুর রহমান জানান, অভয়াশ্রম মৌসুমে জেলেদের মাছ ধরা থেকে বিরত রাখতে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় ২৫ হাজার ৯৪৭টি জেলে পরিবারের জন্য ৪,১৫১.৫২০ মে.টন চাল বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে লক্ষ্মীপুর সদরে ৫৩৫.২০০টন, রায়পুর ৬৭১.৩৬০ টন, রামগতিতে ১৮০২ টন ও কমলনগরে ১১৪২.৫৬০ টন চাল বরাদ্ধ দেওয়া হয়। ফেব্রুয়ারী থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে ৪০ কেজি হারে জেলে পরিবারের মাঝে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানগণ বন্টন করার কথা।

অথচ অভিযান শুরুর এক মাসেও খাদ্য সহায়তা পায়নি জেলেরা। দু-এক ইউনিয়ন কিছু সংখ্যক জেলে পরিবারের মাঝে ভিজিএফ চাল বিতরণ করলেও অধিকাংশ ইউনিয়নেই এখনো বিতরণ শুরু হয়নি। বিকল্প কোন কর্মসংস্থান না থাকায় দূর্বিসহ দিন যাপন করছেন জেলে পরিবার গুলো। বাধ্য হয়েই জীবিকার তাগিদে নদীতে মাছ শিকারে নামছে তারা।

সরেজমিনে সন্ধ্যায় কমলনগর উপজেলার চরকালকিনি ইউনিয়নের মতিরহাট মাছ ঘাট এলাকায় ঘিয়ে দেখা যায়, ঘাটে কোন মাছ বেচা-বিক্রি হচ্ছে না। দেখে মনে হবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ঠিকমতই মানছে জেলেরা। কিন্তু মতিরহাট ঘাট থেকে একটু পশ্চিমে সুপারি বাগানে চলছে এ জাটকা বেচা-বিক্রির মহাৎসব। বাগানটির নাম লোকমান চেয়াম্যানের বাড়ির সুপারি বাগান।

দূরের ব্যবসায়ীরা এসে মাছ নিয়ে যায়। আবার অনেকে টলারেই জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে নদীতে করেই নিয়ে যাচ্ছে অন্য স্থানে। মাছ বিক্রির সময় প্রশাসনের জন্য একটি চক্র জেলেদের কাছ থেকে টাকা উত্তোলন করে তাকে। একই অবস্থা মাতাব্বার হাট, রামগতি আলেকজান্ডার এলাকায়ও।

এছাড়াও রায়পুর উপজেলার পুরান বেড়ি, খাসের হাট বাজার, চরলক্ষী, পানির ঘাট, প্রধানিয়া ঘাট, জালিয়ার চর, চর আবাবিল, চরভৈরবী, কাটাখালসহ বিভিন্ন এলাকায় অবাধে জাটকা ইলিশ নিধন ও বিক্রি করতে দেখা গেছে। রাতের অন্ধকারে পিকআপ ভ্যানে করে ঢাকাসহ দূর-দূরান্তে পাচার করা হচ্ছে জাটকা ইলিশ।

স্থানীয়রা জানায়, মৎস্য বিভাগ, মৎস্য বিভাগ, কোস্টগার্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের তেমন একটা তৎপরতা নেই। দিনে কিছু স্থানে অভিযান হলেও আগেই খবর চলে যায় জেলেদের কাছে। দাদনদার-মহাজনরা সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে জেলেদের নদীতে পাঠাচ্ছেন। এতে মাছের উৎপাদন ব্যহত হয়ে সরকারের কাঙ্খিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে ধারনা স্থানীয়দের।

কথা হলে মতিরহাট এলাকার তিনজন জেলে জানায়, সরকারি নির্দেশনার জন্য অপেক্ষায় থাকলে না খেয়ে মরতে হবে। ফেব্রুয়ারী থেকে চাল বিতরণের কথা থাকলেও এখনো পায়নি তারা। আবার চাল দিলেও তালিকায় নাম না থাকায় অনেকে এ থেকে বঞ্চিত হতে হয়। তাই দাঁদনের দেনা আর ঋণের টাকা পরিশোধ করতে নদীতে মাছ শিকারে নামছে জেলেরা।

জানতে চাইলে চর কালকিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ছায়েফ উল্যা বলেন, উপজেলা নির্বাচনী ঝামেলার কারণে উপজেলা থেকে ভিজিএফ বরাদ্দ আনা হয়নি। যার কারণে কোন জেলেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে আগামী ৮-১০ দিনের মধ্যে চাল বিতরণ শুরু হবে।

জানতে চাইলে কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমতিয়াজ হোসেন জানান, সহায়তা না পেলে জেলেরা মাছ শিকারে নামবে এটাই স্বাভাবিক। তবে আমরাও সর্তক অবস্থানে রয়েছি। মৎস্য বিভাগ ও কোস্টগার্ডকে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে কেউ যেন নদীতে নামতে না পারে। এছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের দ্রুত ভিজিএফ চাল বিতরণে জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সদর উপজেলার চররুহিতা ইউনিয়ন এলাকায় প্রকৃত জেলেদের বাদ দিয়ে প্রতিবছর বাজারের ব্যবসায়ী স্বপন, কৃষক, সাবেক ইউপি মেম্বর লিয়াকত, স্থানীয় হোসেন ও শামছুদ্দিন নামে কিছু সংখ্যক লোকদের ভিজিএফ সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান কবির পাটোয়ারী জানান, জেলেদের তালিক আমরা করিনি। ৮/১০ বছর পূর্বে সরকার এসব জেলে তালিকা করেছে। সে তালিকা অনুযায়ী চাল বিতরণ করা হয়। এ ইউনিয়নে প্রায় ২শ ৭০জন জেলের তালিকা রয়েছে। পর্যাক্রমে নিবন্ধিত সবাইকে এ সহায়তার আওতায় আনা হবে।

অভিযোগ অস্বীকার করে লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এইচ এম মহিব উল্লাহ বলেন, গতবারের ছেয়েও এবার অভিযান সফল হতে চলেছে। এতো মধ্যে জেলেরাও সচেতন হচ্ছে। প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ ও কোষ্টগার্ড তৎপর রয়েছে। যদিও ফাক পেলে কিছু জেলে নদীতে নামছে, তাও বন্ধ করা হবে। প্রকৃত জেলেদের বাদ দিয়ে ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীদের সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পূর্ব জেলেদের যে তালিকা করা হয়েছে তা আর সংশোধন করা হয়নি, যার কারণে এ সমস্যা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমতি পেলে তা সংশোধন করা হবে।

শীর্ষ সংবাদ/এফএইচ