লক্ষ্মীপুরে শিক্ষার্থীদের প্রগ্রেসিভ রিপোর্ট খেয়েছে উই পোকা

নিজস্ব প্রতিবেদক :

লক্ষ্মীপুর বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে তৃতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের প্রগ্রেসিভ রিপোর্ট অভিভাবকদের দেওয়া হয়নি। প্রধান শিক্ষক নিজেই বলছেন, ‘প্রগ্রেসিভ রিপোর্ট খেয়েছে উই পোকা’। এতে শিক্ষার্থীদের বার্ষিক মেধা মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এদিকে শিক্ষার্থীদের বাৎসরিক ফলাফল না পেয়ে অভিভাবকদের মাঝেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

শুধু তাই নয়, বিভিন্ন পরীক্ষায় ভালো নাম্বার প্রাপ্তির জন্য অভিভাবকদের কাছ থেকে‘স্বর্ণের দুল’ উপডোকন নেওয়া, ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য (ঝাড়– বাবদ) ৫০ টাকা হারে উত্তোলন, নিষিদ্ধ গাইড বাণিজ্য ও অসদাচরণসহ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে প্রধান শিক্ষক রূপালী প্রভা নাথের বিরুদ্ধে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর পৌরসভার (৬নং ওয়ার্ডস্থ) প্রাণকেন্দ্র মোরগহাটা সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়টি ১৯৬৫ সালে স্থাপিত হয়। এতে পাক প্রাথমিক শাখাসহ ৬টি শ্রেণীতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৮৯৮জন। এর মধ্যে পাক প্রাথমিকে ১২৪, প্রথম শ্রেণীতে ১৫৯, ২য় শ্রেণীতে ১৫২, ৩য় শ্রেনীতে ১৭১, ৪র্থ শ্রেণীতে ১৪৩ ও ৫ম শ্রেণীতে ১৪৯জন শিক্ষার্থী রয়েছে। আর এসব শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য প্রধান শিক্ষক ছাড়াও আছেন ১২জন শিক্ষক।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে কয়েকজন অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, রেজাল্ট কার্ড অনুযায়ী পরবর্তী ক্লাসের মেধা মূল্যায়ন করা হয়। অথচ দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রগ্রেসিভ রিপোর্ট দেওয়া হয়নি। স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নাম্বারপত্র বিতরণ করেছে প্রধান শিক্ষক।

পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের ভালো নাম্বার দিতে অভিভাবকদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরণের উপডোকন নেন শিক্ষকরা। তৃতীয় শ্রেণী থেকে চতুর্থ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ ও চতুর্থ শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ যেসব শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের কোচিং করেছে। তাদের অভিভাকদের কাছ থেকে শিক্ষকরা ‘স্বর্ণের কানের দুল’ উপডোকন নিয়েছেন। এছাড়াও নিষিদ্ধ গাইড পাঠ্য করতে শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করছেন শিক্ষকগণ। এসব বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

অপরদিকে নিয়ম অনুযায়ী চারুকারু বিভাগে ব্যবহারিক নাম্বারের জন্য শিক্ষার্থীদের নিজ হস্তে তৈরীকৃত সমাগ্রী বিদ্যালয়ে উপস্থাপন করার কথা। অথচ ব্যবহারিকের জন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে (ঝাড়– ক্রয় বাবদ) ৫০ টাকা হারে উত্তোলন করা হয়। এতে প্রায় মোটা অংকের টাকা উত্তোলন করে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এছাড়াও বিদ্যালয়ের আয়ার বেতন বাবত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১০ টাকা হারেও উত্তোলন করা হয় বলে অভিভাবকদের অভিযোগ।

বিদ্যালয়ের শ্রেণী কক্ষে পাঠদানে সমাধান বা গাইড ব্যবহারে সরকারের নিষেধ থাকলেও এ বিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ গাইড ব্যবহার যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। কোম্পানীদের থেকে টাকা নিয়ে শিক্ষার্থীদের গাইড কিনতে প্রভাবিত করা হচ্ছে।

জুপিটার গাইড কোম্পানীর এক প্রতিনিধি বলেন, এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে যে কোম্পানী মোটা অংকের টাকা দিবে তার গাইডই এ বিদ্যালয়ে পাঠ্যপস্তুক করা হয়। এর মধ্যে ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য লেকচার গাইড ও ৮ হাজার টাকার বিনিময়ে চতুর্থ শ্রেণীর জন্য স্কয়ার কোম্পানীর গাইড নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের কোম্পানীও পঞ্চম শ্রেণীতে গাইড বিক্রির জন্য ৫ হাজার টাকা দিয়েছে। টাকা কম দেওয়ায় পঞ্চম শ্রেণী না দিয়ে তৃতীয় শ্রেণীতে পাঠ্যপ্রস্তুক নির্ধারণ করা হয়েছে।

অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রূপালী প্রভা নাথ বলেন, দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রগ্রেসিভ রিপোর্ট টেবিলের ড্রয়ারে রাখার কারণে নিচ থেকে উইপোকা খেয়েছে। নষ্ট হয়ে যাওয়ায় রিপোর্টটি দেওয়া হয়নি। তবে রেজিষ্টার খাতা দেখে অভিভাবকদের নাম্বার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অভিভাকদের কাছ থেকে স্বর্ণের অলংকার নেওয়া, ব্যবহারিক খাতার জন্য ৫০ টাকা ও গাইড বাণিজ্যের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আয়ার বেতনের জন্য শুধু ১০টাকা হারে অভিভাবকদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে। বিদ্যালযের বাহিরের এক অসাধু চক্র আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলছে। আমার বিরুদ্ধে করা সবগুলো অভিযোগই মিথ্যা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু জাফর মোঃ সালেহ বলেন, প্রগ্রেসিভ রিপোর্ট’র বিষয়ে সরকারের কোন নির্দেশনা নেই। তবে বিদ্যালয় থেকে দিলে সব ক্লাসেই বিনা মূল্যে দিতে হবে। কোন ক্লাসে দিবে আবার কোন ক্লাসে দিবে না তাতো হবে না।

ব্যবহারিক নাম্বারের জন্য অর্থ আদায় ও গাইড বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোন প্রকার গাইড সরবরাহ করা যাবে না। এসব অনিয়েমের বিরুদ্ধে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।

শীর্ষ সংবাদ/এফএইচ