১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে ও গর্ভধারণ ঝুঁকিপূর্ণ

চিকিৎসকদের মতে ১৮ বছর বয়সের আগেই মেয়েদের বিয়ে এবং গর্ভধারণ ঝুঁকিপূর্ণ। প্রসব-পূর্ববর্তী, প্রসবকালীন ও পরবর্তী স্বাস্থ্য জটিলতাগুলো কম বয়সী মায়েরা বুঝেনা। ফলে বাংলাদেশের অসংখ্য কিশোরীই অপরিণত বয়সে বিয়ে এবং সন্তান ধারণের ফলে গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হয়।

শৈলকুপা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম লক্ষণদিয়ায় একচালা একটা ঘরে স্ত্রী ও তিন মেয়ে নিয়ে দরিদ্র কাশেম মিয়ার অভাবের সংসার। বড় মেয়ে সাথী আক্তার বয়স ছিল দশ বছর। এলাকাবাসীর নানান কথায কাশেম মিয়া সাথীকে বিয়ে দেয়ার চিন্তা করে। অল্প বয়সেই পাশের গ্রামের এক কৃষক বাড়ির বউ হয়ে যায় সাথী। বছর ঘুরতেই সে অন্তঃসত্ত্বা হয়। অপরিণত বয়সে পাকা গৃহিনীর দায়িত্ব কিশোর বয়সী সাথীর জীবন হয়ে ওঠে আনন্দহীন। প্রসব-পূর্ববর্তী, প্রসবকালীন ও পরবর্তী স্বাস্থ্য জটিলতাগুলো সে বোঝেনি। গ্রামের অশিক্ষিত ধাত্রী বা দাইয়ের হাতে সন্তান প্রসবের সময় নবজাতকের মৃত্যু হয়। সাথীর মত এমন বাংলাদেশের অসংখ্য কিশোরীই অপরিণত বয়সে বিয়ে এবং সন্তান ধারণের ফলে গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের গাইনী বিভাগের ডা. ফেরদৌসি ইসলাম জানান, ১৮ বছরের আগেই মেয়েদের বিয়ে এবং গর্ভধারণ ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের দেশে ৮৩ শতাংশ মায়ের সন্তান প্রসব হয় বাড়িতে। এদের মধ্যে ১০ শতাংশ বিলম্বিত প্রসব হয়। এ বিলম্বিত প্রসব রোধ করতে মায়েদের পার্শ্ববর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা জরুরী। অর্থনেতিক অসচ্ছলতা এবং সঠিক জ্ঞানের অভাবে অর্ধেকেরও বেশি গর্ভবতী মা এখনো অপুষ্টিতে ভোগেন৷ মা অপুষ্টিতে ভুগলে গর্ভের শিশুও অপুষ্টিতে ভোগে৷ গর্ভবতী মায়েদের একটি অংশ ডায়াবেটিস রোগে ভোগেন, তাঁরা নানা ধরনের সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। পাঁচবছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিশ্বে প্রশংসিত হলেও নবজাতকের মৃত্যুহার কমানো এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বাংলাদেশে প্রতি ঘণ্টায় ৬টি নবজাতকের মৃত্যু হচ্ছে। বছরের হিসেবে বাংলাদেশে ৫০ হাজারের বেশি নবজাতকের মৃত্যু হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী শিশু মৃত্যুর প্রবণতা নিয়ে ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিভাগের দেওয়া পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে। আন্তর্জাতিক এই চারটি সংস্থা সম্প্রতি একযোগে নিউইয়র্ক, জেনেভা ও ওয়াশিংটন থেকে বিশ্বে শিশুমৃত্যুর হার ও প্রবণতা নিয়ে নতুন একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে বিশ্বে ১৫ বছরের কম বয়সী ৬৩ লাখ শিশুর মৃত্যু হয়। অর্থাৎ প্রতি পাঁচ সেকেন্ডে বিশ্বে একটি শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। এসব মৃত্যু প্রতিরোধ সম্ভব।

ইউনিসেফ জানিয়েছে, এক লাখ শিশুর মধ্যে অর্ধেকের কিছু বেশি শিশুর মৃত্যু হচ্ছে বয়স ২৮ দিন পূর্ণ হওয়ার আগে। সে হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৫০ হাজারের বেশি নবজাতকের মৃত্যু হচ্ছে। বাংলাদেশে নবজাতক মৃত্যুর প্রধান কারণ জন্মের সময় শ্বাসকষ্ট, সংক্রমণ এবং কম ওজনজনিত জটিলতা। ইউনিসেফ-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন প্রতিবছর ৬২ হাজার নবজাতকের মৃত্যু হয়৷ এরা মারা যায় জন্ম থেকে ২৮ দিনের মধ্যে আর জন্মের পর একদিনের মধ্যে মারা যাচ্ছে ৫০ শতাংশ, অর্থাৎ ৩১ হাজার নবজাতক। তবে সার্বিক বিচারে বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর হার কমেছে।

ইউনিসেফ-এর ‘লেভেলস অ্যান্ড ট্রেন্ডস ইন চাইল্ড মর্টালিটি রিপোর্ট-২০১৭’অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার শতকরা ৭৩ ভাগ কমেছে। জন্মের পর ৭ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে মারা যাচ্ছে ১৯ শতাংশ নবজাতক। পাঁচবছরের কম বয়সী যে শিশুদের মৃত্যু হয় তাদের ৬০ শতাংশই নবজাতক। নবজাতক মৃত্যুর ৮৮ শতাংশই ঘটছে সংক্রমণ, শ্বাসজনিত সমস্যা ও স্বল্প ওজন নিয়ে অপরিণত জন্মসংক্রান্ত কারণে। আর এর একটি বড় কারণ কিশোরী মাতৃত্ব। যেসব নবজাতক মারা যায় তাদের বড় একটি অংশ ২ হাজার ৫০০ গ্রাম বা তারও কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়৷

অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া এবং সন্তান ধারণ শিশু মৃত্যু সরাসরি কারণ বলে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সাইন্স-এর প্রজনন ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডাক্তার রওশন আরা। তিনি জানান, এসব শিশুরা সময়ের আগে জন্মগ্রহণ করে এবং কোন-কোন ক্ষেত্রে জন্মগতভাবে শ্বাসকষ্টজনিত কারণে তাৎক্ষণিক মৃত্যবরণ করতে পারে। গর্ভাবস্থায় মাকে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য না দেয়া এবং বাড়িতে আনিরাপদ ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে সন্তান জন্ম দানের কারনে বাংলাদেশে অধিক হারে শিশু মৃত্যুর ঘঠনা ঘটছে। এছাড়াও বাল্য বিবাহরোধ, গভার্বস্থায় মাকে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়ানো, হাসপাতালে বা দক্ষ দাইয়ের সাহায্যে সন্তান প্রসব করানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।

বর্তমানে জাতীয় নবজাতক স্বাস্থ্য কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে জন্মের পর নবজাতকের নাভীতে দেওয়ার জন্য ওষুধ এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ইউনিয়ন পর্যায়ের সেবাকেন্দ্রে সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে জনিয়েছেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য) মোহাম্মদ শরিফ । পাশাপাশি ‘ক্যাংঙারু মাদার কেয়ার’ নামের সেবাও দেশব্যাপী বিস্তৃৃত করা হয়েছে। জন্মের পর নবজাতক ক্যাংঙারু ছানাকে মায়ের শরীরের তাপে রেখে বড় করার যে কৌশল তা শিশু চিকিৎসার ক্ষেত্রে নাম দেয়া হয়েছে ‘ক্যাংগারু মাদার কেয়ার’।

সুত্র : বাসস