নারীশিক্ষা রুখতে পারে বাল্যবিবাহ

Print Friendly, PDF & Email

একটা দেশের উন্নতির জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শিক্ষার। অর্থাৎ যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি তত উন্নত। আবার আজকের শিশুই একটা দেশের ভবিষ্যত। শিশুর ভবিষ্যত গড়ে তোলে তার মা। সেহেতু একটা শিশুর সুন্দরভাবে গড়ে ওঠা নির্ভর করে অনেকাংশেই তার মায়ের শিক্ষার ওপড়। সুতরাং একজন শিক্ষিত নারীই তার শিশুর সুন্দর ভবিষ্যত গড়তে পারেন। যেকোন দেশের জন্যই বাল্য বিবাহ একটা বড় সমস্যা। সে ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ রুখতে পারে একজন শিক্ষত নারী। যার প্রমাণ দিয়েছেন দিনাত জাহান। বিয়ের তিন বছরের মধ্যে দিনাত জাহান (১৭) যেন অনেক পরিণত হয়েছে। তার বোধ-বুদ্ধি অনেকখানি বেড়েছে এবং সে বেশ কয়েকটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বছর সে এইচ এসসি পাস করেছে। আগামি ছয় বছর অর্থাৎ সে মাস্টার্স পাস করার আগে সন্তান ধারণ না করার সিদ্ধান্তও নিয়েছে। যদি সে কন্যা সন্তানের মা হয় তাহলে তার কন্যার পড়ালেখা শেষ করার পরে তার মতামত নিয়ে তাকে বিয়ে দিবে বলে সে জানায়। এরকম আরো নানারকম সিদ্ধান্ত আর দৃঢ়তাই বদলে দিয়েছে দিনাত জাহানকে।

দিনাত জানান, তিন বছর আগে এসএসসি পরীক্ষার আগে তার মা ও খালা তাকে তার বিয়ের বিষয়ে জানায়। সঠিক সময়ে তার বিয়ের প্রস্তাব আসায় তারা তাকে সৌভাগ্যবতী বলে এবং বিয়েতে তার মত আদায় করে নেয়। বিয়ের পর বুদ্ধিমতী দিনাত স্বামী ও শ^শুড়বাড়ির লোকজনদের আপন করে নেয় এবং খুশি মনে ঘরসংসার করছে। তার কণ্ঠের দৃঢ়তাই প্রমাণ করে পড়ালেখা সে কোনোদিন ছাড়বে না। কেননা এটা ছিল না বলে তার মা- খালা নিজেরা যেমন কম বয়সে বিয়েতে রাজি হয়েছে, তেমনি তাকেও বাধ্য করেছে বাল্যবিয়ে করতে।

দিনাত বলেন, “ঢাকা শহরের একটি সরকারি স্কুলে আমি পড়তাম। পড়ালেখায় বেশ ভালো ছিলাম। যথেষ্ট স্বচ্ছল আমাদের পরিবার। কিন্তÍু আমার মা-বাবা শিক্ষিত না হওয়ায় আমার বাল্যবিয়ে হয়েছে। আমার ভাবতে অবাক লাগে- এটা কীভাবে হলো? আমার মা যদি শিক্ষিত হতেন তাহলে এটা হতো না। একজন নারীর জীবনে বিয়েটাই সব নয়। নিজেকে এবং পরিবারকে ভালোভাবে দেখাশুনা করার জন্য এবং সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য শিক্ষার প্রয়োজন আছে।”

গ্রামে বাল্যবিয়ের অন্যতম কারণ দারিদ্র, সামাজিক প্রথা, কুসংস্কার এবং কন্যাশিশুর সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা হলেও শহরে এ সমস্যাগুলো নেই বললেই চলে। তবুও মাঝে মাঝে দিনাতের মতো ঘটনাও ঘটতে দেখা যায়। ২০১৮ সালের ৬ই মার্চ প্রকাশিত ইউনিসেফের বাল্যবিয়ে সম্পর্কিত একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায় “বর্তমানে দেশে বাল্যবিয়ের হার শতকরা ৫২ থেকে ৫৯ শতাংশ। এতে আরো জানা যায়, কয়েক বছর আগেও ভারতে বাল্যবিয়ের হার শীর্ষে অবস্থানকারী দেশগুলোর মত ছিল। কিন্তÍু বিগত কয়েক বছরে তারা এ হার কমিয়ে ফেলেছে। এতে মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে নারীশিক্ষা। কোনোভাবেই যখন তারা বাল্যবিয়ে কমাতে পারছিল না তখন নারীশিক্ষার কুফল সম্পর্কে তারা জনগনকে সচেতন করে এবং এতে তারা ব্যাপক সাড়া পায় বলে জানা যায়।” কাজেই বাল্যবিয়ে কমানোর জন্য আমরাও নারীশিক্ষাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারি।

বিশিষ্ট আইনজীবী সালমা আলী বলেন, “নারী শিক্ষিত হলে সে তার শারিরীক অর্থাৎ স্বাস্থ্যগত বিষয়ে সচেতন হবে। বাল্যবিয়ের কুফল বুঝতে পারবে। শিক্ষিত নারী স্বাবলম্বি হবে। তখন সে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তার সুবিধা-অসুবিধা বুঝে বিয়ের কথা ভাববে। যেসব সামাজিক প্রথা তার জন্য ক্ষতিকর তা সে মানতে চাইবে না। কুসংস্কার কিংবা বয়স হলে তার বিয়ে হবে না এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিবে না। শিক্ষিত মা তার কন্যাকে শিক্ষিত করতে চাইবে এবং উপযুক্ত পাত্রের সাথে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবে। একজন শিক্ষিত মা তার কন্যাকে নিয়ে সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বিগ্ন হবেন না।”
বিশেষজ্ঞদের কথা অনুযায়ী নারীশিক্ষা বাল্যবিয়েকে দৃঢ়ভাবে রুখতে পারলেও রাষ্ট্র ও সমাজের কিছু দায়-দায়িত্ব রয়েছে। মসজিদগুলোতে ইমাম সাহেবরা সামাজিক শৃঙ্খলার কথা বললেও বাল্যবিয়ে সম্পর্কে রয়েছে তাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। তাদের মতে, “মেয়েদের দেরিতে বিয়ে দিয়ে কোনো লাভ নেই। অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দেয়া উচিত। বর্তমানে মেয়েদের দেরি করে বিয়ে দেয়ার ফলেই নানা অঘটন ঘটছে।” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইমাম বলেন, “ইসলামে শিশুকালে বিয়ে দেয়া জায়েজ এবং শরীয়াহ মোতাবেক মেয়েরা সাবালক হলেই বিয়ে দেয়া যায়।” বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে ইমাম সাহেবদের জানানো প্রয়োজন এবং এক্ষেত্রে সরকার তাদেরকে নির্দেশ দিতে পারেন বলে জানান সুশীল সমাজ।
শুধু গ্রামীণ বা অনগ্রসর সমাজ কিংবা অসচেতন নারী সমাজকে জাগলে হবে না এক্ষেত্রে সরকারেরও ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা। বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “এ বিষয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শুধু আইন করে এটা বন্ধ করা সম্ভব নয়। বয়স প্রমাণের জন্য জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট প্রত্যেকের থাকা উচিত। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের জেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সচেতন করে তাদেরকে বাল্যবিবাহ বন্ধের দায়িত্ব দিতে হবে।”
বাল্যবিয়ে রুখে দিতে সরকারের রয়েছে নানা ধরনের উদ্যোগ ও কার্যক্রম। নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, “বিভিন্ন পর্যায় থেকে বাল্যবিয়ে বন্ধের পক্ষে কাজ হচ্ছে। বাল্যবিয়ের বিষয়ে যারা কাজ করছেন বা যারা দোষী সাব্যস্ত হবেন তাদের জন্য জেল-জরিমানা হবে। এমনকি সেরকম কোনো ত্রুটি পেলে বিয়ে বাতিল করা হবে।”
এসব কার্যক্রমের ফাঁক দিয়ে বাল্যবিবাহের ঘটনা আটকে রাখা যায় না। তাই সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদেরও বিষয়টির মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। শ্রেণিকক্ষে বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। ইতিমধ্যে এর প্রভাবও লক্ষ্য করা গেছে। থানা, ইউনিয়ন পর্যায়ের অনেক কন্যাশিশু নিজের সচেতনতা কাজে লাগিয়ে বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছে- এ ধরনের সংবাদ আজকাল বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হতে দেখা যায়। তাই শুধুমাত্র শিক্ষাই পারে বাল্যবিয়ের কুফল ও ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে একে বন্ধ করতে। এ কাজে মিডিয়ার ভূমিকা অগ্রগণ্য বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মী এবং সুশীল সমাজের মানুষ।

=শানু মোস্তাফিজ

সুত্র-বাসস