লক্ষ্মীপুরে সুপারি পচাতে সরকারি জলাশয়; দেদার পরিবেশ দূষণ

Print Friendly, PDF & Email

দেশে সবচেয়ে বেশি সুপারি উৎপাদিত হয় লক্ষ্মীপুর জেলায়। প্রায় সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে এটি। বার্ষিক বাণিজ্য ৩০০ কোটি টাকার কম নয়। লাভজনক হওয়ায় বেশ লোভনীয় হয়ে উঠেছে এ ফসল। প্রতি বছরই সুপারি বাগানের পরিমাণ ও সংখ্যা বাড়ছে।

কিন্তু এর জন্য মূল্য দিচ্ছে স্থানীয় পরিবেশ-প্রতিবেশ। প্রতি বছর এ মৌসুমে সরকারি খাল ও উন্মুক্ত জলাশয় দখল করে সুপারি পচানোর ফলে দূষিত হচ্ছে পানি; দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয়রা।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, মাটিতে হাউজ করে সুপারি ভেজানোর নির্দেশনা থাকলেও ব্যবসায়ীরা মানছেন না। কার্তিক-অগ্রহায়ণে চাষীদের কাছ থেকে সুপারি সংগ্রহ করে অবৈধভাবে সরকারি খাল ও উন্মুক্ত জলাশয়ের পানিতে ভিজিয়ে রাখা হচ্ছে। এতে পানি পচে বিষাক্ত হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এ সুপারি ভাদ্র-আশ্বিন পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাজারজাত করা হয়।

সম্প্রতি সদরের কাঞ্চনী বাজার বেড়িবাঁধ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে দুটি পুকুরে অসংখ্য বস্তাভর্তি সুপারি। স্থানীয়রা জানান, একেকটি পুকুরে ২-৪ কোটি টাকার সুপারি রয়েছে। এরই মধ্যে পুকুরের পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে।

অন্যদিকে দক্ষিণ হামছাদি ইউনিয়নের নন্দনপুর এলাকায় রাস্তার পাশে সরকারি খালে সুপারি ভিজিয়েছেন বাবুল নামে এক ব্যবসায়ী। এ ব্যাপারে কথা বললে তিনি দাবি করেন, হাউজে ভেজালে সুপারিতে দুর্গন্ধ একটু বেশি হয়। তাছাড়া এ অঞ্চলের সুপারির বুক তুলনামূলক নরম, ফলে হাউজে দ্রুত সুপারি পচে নষ্ট হয়ে যায়। তাই খালে ভিজিয়েছেন। এ জেলার প্রায় সব বেপারিই তার মতো উন্মুক্ত জলাশয়ে সুপারি ভেজান বলে দাবি করেন তিনি।

খোঁজ নিতে গিয়ে বাবুলের দাবির সত্যতা পাওয়া গেছে। এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী বশিকপুর এলাকার আশু বাবু, রসুরগঞ্জ এলাকার বারেক, করিম খাঁ, মান্দারি এলাকার বাবুল, ফয়েজ— তারা সবাই সরকারি খাল, পুকুর ও উন্মুক্ত জলাশয়ে সুপারি ভিজিয়ে রেখেছেন। তাদের প্রত্যেকেই প্রতি বছর ২-৫ কোটি টাকার ব্যবসা করেন বলে জানা যায়।

সদর ছাড়াও রায়পুরের রাখালিয়া, মোল্লারহাট, নয়ারহাট, রায়পুর বাজার, খাসেরহাট, চরলক্ষ্মী, চরবংশী, উদমারা, ক্যাম্পেরহাট, হায়দরগঞ্জ বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সরকারি খাল, পুকুর-ডোবা-নালায় পচানো হচ্ছে সুপারি। এসব জলাশয়ের পানি ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়রা জানায়, সুপারির মৌসুম এলে এলাকায় বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীরা রাস্তা-ঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, আবাসিক এলাকা এমনকি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আশপাশের জলাশয়েও সুপারি ভিজিয়ে রাখেন। এ সময় কয়েক মাস চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকার সুপারি উৎপাদন হয়ে থাকে। এর ৭০ শতাংশই পানিতে পচিয়ে বাইরে সরবরাহ করেন ব্যবসায়ীরা। তবে নির্দিষ্ট হাউজে না ভিজিয়ে উন্মুক্ত জলাশয়ে ভেজানোর কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে জানান উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবুল হোসেন।

এ দূষণের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে নোয়াখালী পরিবেশ অধিদপ্তর আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আবদুল মালেক বলেন, এ বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হবে। পরিবেশ দূষিত করার সত্যতা পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে রঙ আকর্ষণীয় করতে সুপারি পচানোর সময় অনেকে বিষাক্ত হাইড্রোজ ও কাপড়ে ব্যবহারের রঙ ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, হাইড্রোজ ও রঙমিশ্রিত সুপারি খেলে লিভারের সমস্যা হতে পারে। এসব রাসায়নিকে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান থাকে।