শোকে কাতর তারকারা : কেমন করে এত দুঃখ দিলে?

Print Friendly, PDF & Email

রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে আজ বৃহস্পতিবার সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চু। অজ্ঞান অবস্থায় স্কয়ার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়া হলে চিকিৎসকরা কৃত্রিমভাবে কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন বা সিপিআর এর মাধ্যমে হৃৎপিণ্ড এবং ফুসফুসের স্বাভাবিক কার্যকলাপ ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন।

চিকিৎসকরা জানান, সকালে সাড়ে ৮টায় মৃত্যু হয়েছে তার। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর।

‘নগর বাউল’ খ্যাত জেমস বলেন, ‘বাংলা রক সংগীতের কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু। ১৯৮০ সালের শুরু থেকেই তার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা। সুখে-দুঃখে, মান-অভিমানে পথ চলেছি আমরা। প্রায় চল্লিশ বছর একসঙ্গে ছিলাম। আজ সকালবেলা যখন শুনলাম উনি নেই এই কথাটি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তার সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভাষায় বলে প্রকাশ করার মতো নয়। আপনের চেয়ে আপন বলে যদি কিছু থাকে বাচ্চু ভাই আমার সেটাই ছিলো।’

আইয়ুব বাচ্চুর দীর্ঘদিনের বন্ধু এন্ড্রু কিশোর বলেন, ‘মন মানতে চায় না বাচ্চু নেই। আমারা যখন আজকের মতো এতো পরিচিত হয়ে উঠিনি তখন থেকেই আমরা বন্ধু। আমাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক ছিল। আমি, আইয়ুব বাচ্চু, কুমার বিশ্বজিৎ, হানিফ সংকেত একসঙ্গে আড্ডা দিতাম। অনেক মধুর ছিল সেসব দিন। একজন অসাধারণ শিল্পী ছিলেন বাচ্চু। তার মতো গিটার প্রেমিক আমি কখনই দেখিনি। হাতে টাকা থাকলেই গিটার কিনত। যারা গিটারিস্ট হতে চায়, শিল্পী হতে চায়। তাদের উচিৎ বাচ্চুকে অনুসরণ করা।’

‘সোলস’র সদস্য পার্থ বড়ুয়া বলেছেন, ‘কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন। আমাকে তৈরি করেছেন। গিটার শিখিয়েছিলেন। গান করতে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন।’

হাসপাতালে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ দেখতে এসে এভাবেই বলছিলেন তিনি। ‘কখনোই ভাবিনি বাচ্চু ভাই এভাবে হঠাৎ করে চলে যাবেন। উনার মতো গিটারিস্ট এই উপমহাদেশে আর আছে কি না আমার জানা নাই। সংগীতাঙ্গন একটি সম্পদ হারালো। বাচ্চু ভাইয়ের মতো শিল্পী আর বাংলাদেশে আসবে কি না সন্দেহ আছে।’

আর্ক ব্যান্ড তারকা হাসান বলেন, ‘মানুষের মনে যে সুর বাজে সেই সু্রই কণ্ঠে ধারণ করে ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। নতুন প্রজন্ম তাকে অনুসরণ করবে। মনে রাখবে অনেক দিন। তাকে মিস করবে সবাই। তার সৃষ্টি কর্মে তিনি থেকে যাবেন। আর কখনো তার সঙ্গে দেখা হবে না ভাবলেই মন কেঁদে উঠছে।’

হাসপাতালে আইয়ুব বাচ্চুকে শেষবারের মতো দেখতে গিয়েছিলেন আরেক সঙ্গীতশিল্পী শুভ্রদেব। সেখানে তিনি বলেন, ‘আইয়ুব বাচ্চুর মতো এমন গায়ক ও কম্পোজার একশ বছরে বাংলাদেশ পাবে কি না সংশয়। আইয়ুব বাচ্চুর মতো গিটার বাজাতে এশিয়ার অনেকে জানেন না। তার কম্পোজ ছিল দুর্দান্ত। সব থেকে বড় গুন ছিল সবার সাথে আন্তরিক ব্যবহার করতেন তিনি।’

সঙ্গীতশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, ‘আইয়ুব বাচ্চু আমাকে বড় ভাইয়ের সম্মান দিতো। বাসায় আসা-যাওয়া ছিল ভাইয়ের মতোই। অনেক স্মৃতি জড়িয়ে। ওর জন্য সঙ্গীতাঙ্গন এগিয়েছে বহুদূর।’

তিনি আরও বলেন, ‘আইয়ুব বাচ্চুর সাথে আমার পরিচয় আশির দশকে। গানের কারণেই আমার সাথে ওর গভীরতা। সারাটি জীবন ও ছিল গানের পাগল, গিটারের পাগল। ওর গানগুলো যেমন ভালো, তারচেয়েও ভালো ছিল ওর মন। ওকে এভাবে হারাবো চিন্তাতীত। বাচ্চুদের জন্ম বারবার হয় না। ওর শূন্যতা কাটানো সম্ভব না। সবাই দোয়া করবেন, বাচ্চু ভালো থাকুক।

ব্যান্ডশিল্পী থেকে অভিনয়ে আসা সুমন পাটোয়ারী বলেন, ‘আমি আজ সুমন পাটোয়ারী, আপনারা যে আমাকে চেনেন -তার একটির বড় অবদান হচ্ছে বাচ্চু (আইয়ুব বাচ্চু) ভাইয়ের। বাচ্চু ভাই যদি সাহস না যোগাতেন তাহলে আমি কোনোদিন সাংবাদিকতায় আসতাম না, কোনোদিন মিডিয়াতে আসতাম না। বাচ্চু ভাইয়ের সাথে বলার মতো আমার অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে। আমরা যখন প্রেম করেছি তখন বাচ্চু ভাই, আবার আমরা যখন ছ্যাকা খেয়েছি তখনও বাচ্চু ভাই। আসলে বাচ্চু ভাই আমাদের শৈশব।’

চলচ্চিত্র পরিচালক ও উপস্থাপক দেবাশীষ বিশ্বাস বলেন, ‘উনাকে (আইয়ুব বাচ্চু) নিয়ে আজ এভাবে মিডিয়ার সামনে দাঁড়াতে হবে ভাবিনি। উনার সাথে অনেক স্মৃতি। অনেক গভীর সম্পর্ক ছিল। অনেক পুরনো। ছোটবেলা থেকে উনার গান শুনে, গিটার শুনে, গান দেখে অনুভব করেই বড় হওয়া। অনেক সময়ই বলেছি, শরীরের দিকে একটু যত্নশীল হন। একটু সাবধানে থাকেন। উনি বলতেন, ধুর দেবো, আমি তোর থেকেও ইয়াং। ওই কথাগুলো স্মরণে আসছে। আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন, আইয়ুব বাচ্চু আছেন, আইয়ুব বাচ্চু থাকবেন। আমরা যারা আইয়ুব বাচ্চুকে চিনি আমরা সবাই সারাজীবন তার গান ধারণ করেই, তার গান লালন করেই বাঁচবো। তিনি যেখানেই থাকুন ভাল থাকুন।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিনেত্রী তিশা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘বাচ্চু ভাইয়ে সঙ্গে তো একদিন দুই দিনের পরিচয় না। অনেক দিনের সম্পর্ক। আমাদের সঙ্গীতাঙ্গনের একজন অবিভাবককে হারালাম আমরা।’

চিত্রনায়ক ফেরদৌস বলেন, ‘আমার একটা মুভিতে তার প্লেব্যাক ছিল। শেষ যেদিন তার সাথে দেখা হয় তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, হিরো এত সুন্দর একটা গান গেয়ে দিলাম, আর সিনেমাতে এটা কী করলা। যদি পারো গানটি নিয়ে আবার কাজ কইরো, ফুটিয়ে তুইলো।’

গায়ক রবি চৌধুরী বলেন, ‘আইয়ুব বাচ্চু এরিস্ট্রোক্রেট। অত্যন্ত হৃদয়বান। ভালো মনের মানুষ। বাচ্চু কী ছিলেন তা সবাই জানি। তার স্থান পূরণ হওয়ার নয়। তার জন্য সবাই দোয়া করবেন যেন ওপারে তিনি ভালো থাকেন। আর ভাষা নেই। আর কিছু বলতে পারছি না।’

গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর বলেন, ‘আইযুব বাচ্চু সব সময় আমাকে গুরু বলে ডাকতো। সে এতো বড় মাপের শিল্পী ছিল কিন্তু কোনো অহংকার ছিল না। তার চলে যাওয়ায় অপূরণীয় ক্ষতি হলো। তার মতো এমন সজ্জন, অমায়িক, মিশুক লোক দেশে আর কেউ ছিল না। তিনি খুবই সহজ সরল প্রকৃতির ছিলেন।’

ফিডব্যাক ব্যান্ডের গিটারিস্ট লাবু রহমান বলেন, ‘তার কাছে আমাদের আরও অনেক কিছু নেয়ার ছিল। তিনি এতো দ্রুত চলে যাবেন ভাবিনি। তার এ অকাল মৃত্যুতে সঙ্গীত জগতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।’