আন্ডা না ছাড়লে ইলিশ হাইয়াম কেমনে!

Print Friendly, PDF & Email
মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানকে স্বাগত জানানো নুর ইসলাম নৌকা মেরামতে ব্যস্ত। ছবি: ফরহাদ হোসেন

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সরকার ইলিশ ধরতে না করছে, তাই অন আমরা ইলিশ ধরি না। অন জালের দড়ি (রশি) বদলানো, ছেঁড়া জাল সেলাই (মেরামত) ও মাছ ধরার নৌকা ঠিক (সংস্কার) করি। আর ইলিশ আন্ডা (ডিম) না ছাড়লে, মাছ বাড়বো কইতোন। আর না বাড়লেতো নদীতে ইলিশ হাইয়াম (পাবো) না, তহন সংসার চালামু কেমনে আর মাহজনের ঋনের টিয়া (টাকা) দিয়াম কি কইরা। তাইতো সরকারের উদ্দ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়ে লক্ষ্মীপুরের মেঘনা পাড়ে এই প্রতিবেদককে এমনটি বলছেন নুর ইসলাম (৭৪) নামে এক জেলে।

তবে তিনি আক্ষেপ জানিয়ে বলেন, নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি ১৫-২০ দিন আগে জানলে ভালো হতো। তাহলে সংসারের খরচ ও কিস্তির টাকা জমিয়ে রাখতো। নিষেধাজ্ঞার সময় তাদের কোন কষ্ট হতো না। কিন্তু হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় অনেক কষ্টে কাটছে তাদের দিন। তারপরেও শান্তি পাচ্ছেন ‘নিষেধাজ্ঞা শেষে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাবেন” ভেবে। তহন আর কোন কষ্ট হবে না তাদের।

আশ্বিন মাসের বড় পূর্ণিমার আগের চার দিন, পূর্ণিমার দিন ও পরের ১৭ দিনসহ ২২ দিন ইলিশের প্রজননের মৌসুম। আর এসময় সাগর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মা ইলিশ এসে মেঘনায় ডিম ছাড়ে। যার কারণে ৭ থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন মেঘনায় সকল মাছ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর এই নিষেধাজ্ঞার কারণে নুর ইসলামের মত লক্ষ্মীপুরের ৬০ হাজার জেলে যাননি মেঘনায় ইলিশ শিকারে। সবাই মাছ ধরার সরঞ্জাম ঠিক করছেন আর দোকান ও বাজারে আড্ডা দিয়ে সময় পার করছেন। এ অভিযানের ১০ দিনের মাথায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকারের দায়ে ২৫ জন জেলেকে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। তবে তারা নোয়াখালী ও ভোলা জেলার বাসিন্দা ও জেলে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা সদর, রায়পুর, কমলনগর ও রামগতি উপজেলার মেঘনা এলাকায় মাছ ধরার কোন নৌকা দেখা যায়নি। মা ইলিশ রক্ষায় নদীতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, কোস্টগার্ড ও মৎস্য অধিদপ্তর থেকে সর্তকঅবস্থান নেওয়া হয়েছে।

মাছ ধরার নৌকা শুন্য এখন লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদী। ছবি: ফরহাদ হোসেন

জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুরের রামগতি আলেকজান্ডার থেকে চাঁদপুরের ষাটনল এলাকা পর্যন্ত একশ কিলোমিটার মেঘনা এলাকায় সকল প্রজাতির মাছ শিকারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এ জেলায় প্রায় ৬০ হাজার জেলে রয়েছে। মাছ ধরাই যাদের একমাত্র পেশা। মাছ ধরা থেকে বিরত রাখতে তাদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে ভিজিএফের চাল। এছাড়াও লিফলেট, পোস্টার ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে জেলেসহ সবার মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, বরফ কলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, অন্য কোথাও থেকে বরফ আসতে না দেওয়া, নদী সংলগ্ন খাল থেকে নৌকা বের হতে না দেওয়া, মাছঘাট সংলগ্ন বাজারের নৌকা ও ট্রলারের জ্বালানি তেলের দোকান বন্ধ রাখা, নদীর মাঝে জেগে উঠা চরের মাছঘাটগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে।

আরো জানা যায়, নিষেধাজ্ঞার নির্ধারিত সময়ে মাছ শিকার, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এ আইন আমান্য করলে জেল অথবা জরিমানা এবং উভয় দন্ডের বিধান রয়েছে।

জেলে ইসমাইল, মুনাফ ও ফারুক জানান, এ মৌসুমে নদীতে কাঙ্খিত ইলিশ ধরা পড়েনি। যার ফলে কোন সঞ্চয় করতে পারেননি। মহাজনের দাদনের ও কিস্তির টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে জাল ও নৌকার অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু নতুন করে জাল কেনার পুঁজি নেই। তাই ছেঁড়া জাল সেলাই করে রাখছেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে এ জাল দিয়েই মাছ ধরবেন। তবে সঞ্চয় না থাকার কারনে নিষেধাজ্ঞার দিনগুলো ধারদেনা করেই কোনরকম চলতে হচ্ছে তাদের।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এসএম মহিব উল্যা বলেন, নিষেধাজ্ঞার এ ২২ দিন ইলিশের প্রজনন মৌসুম। জেলেদের মধ্যে পূর্বের চেয়ে সচেতনতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই তারা এবার ডিমওয়ালা ইলিশ শিকার থেকে বিরত রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকারে নদীতে যাচ্ছেন না তারা। এজন্য নির্বিঘ্নে মা ইলিশ ডিম ছাড়তে পারছেন। অন্যদিকে মাছ শিকার থেকে বিরত রাখতে তাদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে ভিজিএফ এর চাল। এছাড়াও মা ইলিশ রক্ষা অভিযানটি সফল করতে পুলিশ, কোস্টগার্ড, উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য অধিদপ্তরের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

শীর্ষ সংবাদ/এফএইচ