টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ

Print Friendly, PDF & Email

অনেক দিন আগে এক বনে থাকত মস্তবড় এক কুনোব্যাঙ আর ছোট্ট এক টুনটুনি। দু’জনের মধ্যে ভারি দোস্তি। টুনটুনি থাকে ঝোপে ঝাড়ে, —- পাতায় তৈরী তার ছোট্ট বাসায়, আর কুনোব্যাঙ থাকে ঐ ঝোপের নীচে…… গর্তের ভেতর।

একদিন কুনোব্যাঙ গেল বেড়াতে…… কাছেই, নয়া শহরে। ফিরে এসে সে টুনটুনিকে বল্‌ল, … “দোস্ত, ভারি বিপদ, শোননি, আজ জবর তুফান হবে? শহরে সবাই বলাবলি করছে। আমি ত আমার গর্তের ভেতর ঢুক্‌লেই খালাস; এখন তোমার উপায়……?”
এখন কথাটা হ’ল একদম ডাহা মিথ্যে, টুনটুনির তাক্‌ লাগাবার জন্যই শুধু বলা। পাড়াগাঁয় শহর ফেরত লোক অমন উটকো খবর একটা না একটা কিছু বলেই থাকে। নইলে পয়সা খরচ করে শহর ঘুরে আমার মজাই বা কী?

নয়া শহরের নয়া খবর শুনে টুনটুনি কিন্তু গেল বেজায় ঘাবড়ে। কী ভয়ানক কথা; তুফান যদি উঠে তো তার ছোট্ট বাসাটুকু কোথায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে বাতাসের তোড়ে, তার পাত্তাই থাকবে না। কী করে এখন প্রাণটা বাঁচে …………? পাগলের মত টুনটুনিটা এক ছুটে বেরিয়ে পড়ল, কোথায় একটুখানি মাথা গোঁজার ঠাই মিলবে, …… তারি খোঁজে।

টুনটুনিটা হন্যে হয়ে ছুটছে তো ছুটছেই। এদিকে তখন মস্তবড় এক ‘রংরাং’ পাখি ইয়া উঁচু এক চিবিদ গাছের মগডালে বসে তার মেঘের মত পাখনা দু’টো মেলে, মনের সুখে হাওয়া খাচ্ছিল………… বিরাট হা করে। টুনটুনি তাই-ই গর্ত মনে করে তাড়াতাড়ি ওটার হা-করা মুখের ভেতরে ‘ফুড়ুৎ’ করে ঢুকে গেল, প্রাণ বাঁচাবার তাগিদে।

কী-না-কী? রংরাং পাখিটা হঠাৎ ভয় পেয়ে টুনটুনিটাকে উগড়ে দিয়েই বুকফাটা এক বিকট ডাক ছাড়ল, …… “রংরাং”।

ঠিক এ সময়টায় এক বাঁদর, কার জুম থেকে না জানি, একটা মিষ্টি কুমড়ো চুরি করে কাছাকাছি এক গাছের ডালে নিয়ে সব আরামসে বসে খেতে যাচ্ছে,……… আচমকা ওই বিকট আওয়াজটা তার কানে যেতেই কুমড়োটা তার হাত ফসকে পড়ে গেল নীচে। আর পড়বি ত পড় ………… নীচের জমিতে তখন একটা নধর হরিণ কচি ঘাস খাচ্ছিল এক মনে, …… কুমড়োটা সোজা গিয়ে পড়ল ওটার পিঠের উপরে।

আর যায় কোথায়। যেই– না –পড়া, হরিণটা বিষম ভয় পেয়ে “তিড়িং……” করে লাফিয়ে উঠেই দে ছুট্‌, দে ছুট্‌।

বেদম ছুট্‌তে ছুট্‌তে,…… বনের মধ্যে ইয়া বড় একটা গোসাপ শুয়ে আরাম করছিল খেয়ে দেয়ে পেট মোটা করে।— হরিণটা বে-খেয়ালে মাড়িয়ে গেল ওটার কাঁকালে।

গোসাপটা তো যন্ত্রণায় আর রাগে অস্থির; বেদম খেপে গিয়ে সে রাগে ফোঁস্‌ ফোঁস্‌ করতে লাগল আর ভীষণভাবে তার লেজ আছড়াতে লাগল মাটিতে। কিন্তু সে সামলে উঠ্‌তে উঠ্‌তেই হরিণটা তখন চলে গেছে বহুদুরে। এখন আর কার উপর সে গায়ের ঝাল ঝাড়ে? সামনেই ছিল এক মুরগির বাসা। মেলাই ডিম পেড়ে রেখেছে মুরগিটা তাতে। হাতের কাছে আর কিছু না পেয়ে গোসাপটা তার সব কটা ডিম গিলে সাবাড় করে দিল গপা……গপ্‌।

সব দেখে শুনে হায়’ হায়’ করে উঠ্‌ল মুরগিটা। তার সাধের ডিমগুলো, আর কিছু দিন গেলেই ফুটে বাচ্চা বেরোত। কিন্তু তার আর করবার আছেই বা কী? গোসাপের সঙ্গে সে পারবে ক্যামনে? গায়ের জ্বালায় থাক্‌তে না পেড়ে এক ছুটে সে গেল পিঁপড়ের বাসায়, আর তার ডিমগুলো সব খেয়ে দিল ঠুক্‌রে ঠুক্‌রে।

বেচারী পিঁপড়ে আর করবে কী? মুরগির সঙ্গে তো তার পার্‌বার জো নেই। ঝোপের ভেতর একটা শুয়োর শুয়েছিল কাত হয়ে,…… ডিমের শোকে পিপড়েটা তাকেই গিয়ে কামড়ে দিল, ‘কুটুস’ ‘কুটুস’।

শুয়োরটা তো একেবারে লাফিয়ে উঠে কামড় খেয়ে। ঘাড়ের লোম খাড়া করে ‘ঘোঁৎ ঘোঁৎ’ করতে লাগল রাগে। পিঁপড়েটা ততক্ষণে বেমালুম গা ঢাকা দিয়েছে…………’সুড়্‌ সুড়্‌’ করে ঘাসের বনে ঢুকে। এদিক ওদিক হম্বি তম্বি করে কাউকে না পেয়ে শুয়োরটা কাছের এক জুমে গিয়ে ধান খেয়ে প্রায় সাবার করে দিল বেজায় রাগে।

এত সব কান্ড, শুধু বলতেই যা’ ……… ঘটে গেল কিন্তু কয়েক পলকে। এখন হয়েছে কী…………? ঐ জুমটা হল গিয়ে এক রাড়ী মেয়ের। নাম তার ধনপতি। স্বামী মারা যেতে পরের দোরে দোরে হাত পেতে খুব কষ্টই করেছে জুমটা এবার। সেই দুঃখের ধন কিনা শুয়োরে খেয়ে যায়। রাজ্যে কী আর বিচার আচার নেই, মনের দুঃখে বেচারী নালিশ জানাল রাজার কাছে গিয়ে।

আর কী………? তক্ষুনি শুয়োরের তলব হল বিচারের জন্য। ভরপেট ধান খেয়ে একটুখানি সবে গড়াগড়ি খাচ্ছিল শুয়োরটা, জলার ধারে নরম কাদায়, রাজার সেপাই এসে তলব দিতে ভেসে গেল তার আরাম করা। ধড়মড়িয়ে উঠে এসে রাজ দরবারে গিয়ে হাজির হল সে হন্তদন্ত হয়ে। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল রাজাকে, “দোহাই ধর্ম্মাবতার। কসুর মাপ হয়। আমি মিছেমিছি ধান খাইনি। পিঁপড়েটা কেন আমাকে কামড়ে দিল আগে? তাতেই না আমার রাগ ধরে যায় আর আমিও এর ধান খেয়েছি।”

রাজা দেখলেন, …………তাই তো, দোষ তো তাহলে পিঁপড়েটারই, খামোকা চটিয়ে দিল কেন সে শুয়োরটাকে?

কাজেই তলব গেল আবার পিঁপড়ের কাছে।

পিঁপড়ে এসে বল্‌ল………”হুজুর” আমার দোষ কী? মুরগিটাই তো আগে আমার ডিমগুলো খেয়ে দিল। তাতেই না আমরাও রাগ হয়েছিল, আর শুয়োরটাকে কামড়ে দিয়েছি।”

রাজা দেখলেন, দোষ তো তাহলে পিঁপড়েরও নয়, সুতরাং তলব করা হল এবার মুরগিকে। সে এসে বলল, “মহারাজ; গোসাপটা কেন আগে খেয়ে দিল আমার ডিমগুলো? তাতেই না আমিও পিঁপড়ের ডিমগুলো খেয়ে তার শোধ নিয়েছি।”

এমনি করে একে একে রাজ সভায় ডাক পড়ল………… সবার।

গোসাপ এসে কাঁকাঁলের দগদগে ঘা দেখিয়ে বলল রাজাকে, ……… “এই দেখুন হুজুর”। হরিণটা মাড়িয়ে দিয়ে কী হাল করে দিয়েছে আমার পিঠখানার। এতে কার না রাগ হয় বলুন? আমি সামলাতে না পেড়ে খেয়ে দিয়েছি মুরগির ডিমগুলো”।

হরিণ বলল, ……”মহারাজ, বাঁদরটা কেন অত বড় কুমড়োটা ফেলে দিল আমার পিঠে? তাইতো আমি বেহুঁশ হয়ে ছুটছিলাম ভয়ে, আর অমনি গোসাপটাকে মাড়িয়ে গেছি হঠাৎ।”

বাঁদর বলল, …… “দোহাই ধর্ম্মাবতার! আমি ইচ্ছে করে ফেলে দেইনি কুমড়োটা। রংরাং পাখিটা আচমকা বিশ্রীভাবে ডেকে উঠতেই ভয়ে ওটা আমার হাত ফস্‌কে নীচে পড়ে গেছে।”

রংরাং বলল, …… “মহারাজ! ডাক দিয়েছে কী সাধে? বলা নেই, কওয়া নেই, টুনটুনিটা কেন ঢুকতে গেল আমার মুখে? এতে জাতের ডাক না ছেড়ে কেই বা থাকতে পারবে হুজুর। “

টুনটুনি বলল, ………… “হুজুর, কুনোব্যাঙটা কেন মিছেমিছি ভয় ধরিয়ে দিল,……… তুফান হবে বলে? তাই তো আমি বেহুঁশ হয়ে ঢুকে পড়েছিলাম ওটার মুখে, ……… গর্ত মনে করে। যা করেছি হুজুর, ভয়েই করেছি। এতে আর আমার অপরাধ কী?”

কুনোব্যাঙ কিন্তু বেজায় ধড়িবাজ। তাকে পাওয়া গেলনা অত সহজে। হয়েছে কী? সারাদিন বনে ধরপাকড় চলছে…… রাজার সেপাই এসে হামেশা একে তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে…………এসব খবর অনেক আগেই পৌঁছে গেছে কুনোব্যাঙের কাছে। তাই আগেভাগে অনেকটা বিপদের আঁচ পেয়ে সে বেলাবেলি গিয়ে ঢুকে পড়েছে নিজের গর্তে। মাথাটা একবারে নীচের দিকে, পা দুটো খালি দেখা যায় অল্প……… একটুখানি।

অনেক খুঁজে খুঁজে রাজার সেপাই এসে গর্তের মুখে ডাকাডাকি শুরু করে দিল, ……… “কুনোব্যাঙ! হেই কুনোব্যাঙ !……… ” নীচের থেকে ভারি গলায় সাড়া দিল কুনোব্যাঙ, ………… “হজৌর!”

বেরিয়ে আয় ব্যাটা! তোর নামে ওয়ারেন্ট আছে।”

তেমনি ভারি গলায় জবাব দিল কুনোব্যাং,…………”হুজুর! আমার ভারি সাংঘাতিক অসুখ করেছে। উঃ ……হু………হু………… একদম মাথাটা তুলতে পারছি না।”

রাজার সেপাই অধৈর্য্য হয়ে বলল, …………”সে সব চলবে না। রাজার হুকুম, এক্ষুনি যেতে হবে। বেরিয়ে আয় জলদি।”

কিন্তু অনেক হাঁকাহাঁকি আর ডাকাডাকিতেও কুনোব্যাঙ আর বেরোয় না ভয়ে। তখন সবাই মিলে তার পায়ে রশি বেঁধে…………… ‘হেঁই-ও’ হেঁই-ও’ করে টানতে টানতে গর্ত থেকে বাইরে নিয়ে এল তাঁকে, আর টেনে হিঁচড়ে হাজির করল রাজার দরবারে।

কুনোব্যাঙের অবস্থা কাহিল। সাফাই গাইবার মত তার তো আর কিস্‌সু নেই। প্রাণের ভয়ে সে একেবারে রাজার পায়ে আছড়ে পড়ে হাউ মাউ করে কেঁদে কেঁদে বলল, ………… “দোহাই মহারাজ! ঘাট হয়েছে, প্রাণে মারবেন না। আমি আর কোনদিন কাউকে অমন উড়ো খবর বলবো না। এবারটির মত কসুর মাফ করুন হুজুর।”

সদয় হয়ে রাজা বললেন, ………  “যা ব্যাটা, এবারের মত প্রাণে বেঁচে গেলি। কিন্তু তোর একটা উড়ো কথায় রাজ্যের এতগুলো লোকের হয়রানি হয়েছে, …… কিছুটা সাজা পাওয়া তোর নেহাৎ দরকার, যাতে চিরকাল মনে থাকে। এই! নিয়ে যা একে, গুনে গুনে পঁচিশ ঘা বেত লাগাবি, তারপর যেতে দিবি যেখানে খুশি।”

তারপর আর কী …………? টানতে টানতে জল্লাদ নিয়ে গেল কুনোব্যাঙকে আর সবাই মজা করে ছুটল পিছু পিছু, কুনোব্যাঙের সাজা দেখতে।

রাজবাড়ির উঠোনে ছিল আদ্যিকালের মস্ত বড় এক কাঁঠাল গাছ। কুনোব্যাঙকে তার সঙ্গে পেঁচিয়ে বেঁধে জল্লাদ তার পিঠে বেত মারতে লাগল গুনে গুনে, ……… ” এক, ……………, দুই, ………, তিন, ……”

জল্লাদ এক বেত লাগায় আর কুনোব্যাঙটা তত ফুলতে থাকে, আর সঙ্গে সঙ্গে ফিনকি দিয়ে তার গা বেয়ে আঠার মত সাদা সাদা এক রকমের ক্ষীর বেরোতে লাগল। এমনি করে পঁচিশ ঘা বেত লাগাতে কুনোব্যাঙের সারা গা ক্ষীরে জবজবে হয়ে গেল, আর তাই লেগে লেগে যে কাঁঠাল গাছটার সঙ্গে কুনোব্যাঙকে বাঁধা হয়েছিল, তারো গুড়িটা সাদা হয়ে উঠল।

সেই থেকে কুনোব্যাঙের সারা গা উঁচু নীচু ঢিবি ভরা খসখসে হয়ে গেল আর তখন থেকে কাঁঠাল গাছের গায়েও আঘাত দিলে তারো গা বেয়ে সাদা সাদা ক্ষীর বেরোতে থাকে।

-সমাপ্ত-