সিংহ, শিয়াল ও গাধার গল্প

Print Friendly, PDF & Email

অনেক দিন আগের কথা। বনের রাজা সিংহ, শিয়াল পণ্ডিত আর এক গেরস্তের পোষা গাধা একটা চুক্তি করল। চুক্তিটা হলো, জঙ্গলে শিকারের সময় তারা একে অন্যকে সাহায্য করবে। এতে শিকার ধরতে সুবিধা হবে। গাধা অবশ্য এসব জন্তু-জানোয়ারের মাংস নিজে খাবে না। মনিবের বাড়িতে নিয়ে যাবে। মাংস পেয়ে মনিব ভারি খুশি হবেন। তাকে অলস আর বোকা গাধা বলে গালি দেবেন না। লাঠি দিয়ে যখন-তখন পেটাবেন না।
চুক্তি অনুযায়ী, তিনজনের কাজ ভাগ করা হলো। গাধা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে ঘাড় উঁচিয়ে দেখবে কোথায় হরিণ, খরগোশ, বনগরু এসব আছে। যখনই একটাকে দেখতে পাবে, অমনি সে তার সঙ্গে খোশগল্প জুড়ে দেবে। আর তা শুনে সিংহ ও শিয়াল বুঝে যাবে শিকার হাতের কাছেই। তখন শিয়াল হাজির হবে সেখানে। ধারালো দাঁত বের করে, লেজ ফুলিয়ে তর্জন-গর্জন শুরু করে দেবে এবং সেই পশুকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে। ভীত পশুটি এদিক-ওদিক না গিয়ে সোজা পথ দিয়ে পালাতে চাইবে। তখন সেই পথের পাশে লুকিয়ে থাকা সিংহ থাবায় থাবায় শেষ করে দেবে তাকে। এভাবে শিকার করা পশুর মাংস তিনজনের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে নেওয়া হবে বলেও চুক্তিতে উল্লেখ করা হলো।
নির্দিষ্ট দিনে শিকারের খোঁজে জঙ্গলে বেরিয়ে পড়ে তারা। গাধা তার ‘বোকা’ দুর্নাম ঘুচিয়ে দারুণ বুদ্ধির পরিচয় দিল। প্রথমেই সে দেখে একটি হরিণকে। তাকে দেখেই গাধা বলে, ‘হরিণ ভাইয়া, হরিণ ভাইয়া, তোমার চোখ দুটোতে ভারি মায়া। সারা গায়ে কী সুন্দর নকশা আঁকা! শিং দুটো কেমন বাঁকা। যেন ঈদের নতুন চাঁদ। দেখতে তোমায় বড় সাধ।’
গাধার এমন প্রশংসা শুনে হরিণ থমকে দাঁড়ায়। সে বুঝতেই পারে না এটা একটা ফাঁদ। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিয়াল হাজির। সে লেজ ফুলিয়ে হম্বিতম্বি করে হরিণকে এমন ভয় দেখাল, হরিণ তো বটেই, গাধাও ভয় পেয়ে খানিকটা পিছু হটে গেল। বেচারা হরিণ দিশেহারা হয়ে ছুট দিল সোজা পথে। এ পথে গাছগাছালি কম, জন্তু-জানোয়ারের সহজ চলার পথ এটা। আর সেই পথেরই এক পাশে বসে ছিল সিংহ। সে আর দেরি না করে ঝপাৎ করে লাফিয়ে পড়ে মড়াৎ করে ভেঙে ফেলল হরিণের ঘাড়।
এভাবে সারা দিন শিকার চলল। নিখুঁত পরিকল্পনা, নিপুণ টার্গেট। দিন শেষে হিসাব করে দেখা গেল, মোট আটটি হরিণ, একটি বনগরু আর সাতটি বুনো ছাগল মারা পড়েছে। সিংহের তো মাথা খারাপ হওয়ার মতো অবস্থা। এত্ত এত্ত মাংস! পরমুহূর্তে ভাবে, কিন্তু তা তো আবার তিন ভাগ হয়ে যাবে। সে কথা ভেবে তার মনে শয়তানি বুদ্ধি জেগে ওঠে।
এবার মাংস ভাগ করার পালা। চুক্তিমতো সব মাংস সমান তিন ভাগ হবে। তখন সিংহ বলে, ‘ভাই গাধা, তুমি আজ জব্বর বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছ। কে তোমায় বোকা বলে। বনের পশুগুলোকেই তুমি আচ্ছা বোকা বানিয়েছ। তুমিই প্রথম দিন মাংস ভাগের কাজটা করো।’ পশুরাজ সিংহ এতটা সম্মান দিচ্ছে দেখে গাধার খুশি আর ধরে না। সে জোরে ‘হিপ হিপ হুররে’ বলে চিৎকার দিতে গিয়েও থেমে যায়। কে জানে, পশুরাজ সিংহ যদি রাগ করেন! যাহোক, গাধা অনেকক্ষণ মন দিয়ে মাংস ভাগ করে। সমান তিন ভাগ হয়েছে কি না, বারবার পরখ করে। তারপর বলে, ‘হুজুর, ভাগ হয়ে গেছে। এখন যার যার ভাগ নিয়ে চলুন বাড়ি যাওয়া যাক।’
কিন্তু সিংহ কোনো কথা বলে না। থ মেরে বসে আছে। শিয়াল আর গাধা এবার একটু ভয় পেয়ে যায়। কী ব্যাপার, পশুরাজের কি ভাগ পছন্দ হয়নি? তা-ও বা কেন হবে? চুক্তি মোতাবেক তো সমান তিন ভাগই হওয়ার কথা। হয়েছেও তা-ই। তাহলে পশুরাজের মুখ বেজার কেন? ওরা যখন এমন সব ভাবছে, সেই মুহূর্তে সিংহ গম্ভীরভাবে বলে, ‘এই গাধার বাচ্চা গাধা, সমান ভাগের মানে কি এই? সব পশুই তো মারলাম আমি। তোরা শুধু জোগাড়-যন্তর করে দিয়েছিস। তাতেই এ রকম সমান ভাগ নিবি? বোকা গাধা, তোর কি একটুও কমনসেন্স নেই? সমান ভাগের অর্থও তুই বুঝিস না? তোর মতো নিরেট গাধার বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। নির্বোধ কোথাকার।’ এ কথা বলেই সিংহ গাধার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাকে ছিঁড়ে ফালা ফালা করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাধার মাংসও জড়ো করা হয় অন্য মাংসের সঙ্গে। তা দেখে শিয়াল পণ্ডিতের কম্মকাবার। কিন্তু তার তো অনেক বুদ্ধি। তাই সে সাহস করে বসে থাকে সিংহের সামনে।
এবার সিংহ শিয়ালকে বলে মাংস ভাগ করার জন্য। শিয়াল প্রায় সব মাংস এক পাশে রাখে। অন্য পাশে রাখে অল্পকিছু মাংস। তারপর বড় ভাগ দেখিয়ে সিংহকে বলে, ‘মহারাজ, এই ভাগ আপনার, নিন। সমান দুই ভাগে ভাগ করেছি।’ ভাগ দেখে সিংহের মুখে তখন হাসির ফোয়ারা। খুশিতে দুই চোখ তার চিকচিক করে ওঠে। সে হাসতে হাসতে বলে, ‘পণ্ডিত, তোমার তো খাসা বুদ্ধি। তা, এমন সুন্দর ভাগ তুমি কোথায় শিখলে?’ শিয়াল পণ্ডিত তখন বলে, ‘মহারাজ, এমন সুন্দর ভাগ করতে শিখেছি বোকা গাধার পরিণতি দেখে। সে যদি একটু বুদ্ধি করে আমার মতো ভাগ করতে পারত, তাহলে কি তার জীবন যায়?’ এই বলে সে মহারাজকে সেলাম ঠুকে মাংস ফেলেই চম্পট দেয়। সিংহ কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিয়াল পগারপার। এই ঘটনার পর থেকে আর কোনো দিন শিয়ালকে সিংহের সঙ্গে শিকারে অংশ নিতে দেখা যায়নি।
বিদেশি রূপকথা অবলম্বনে