লক্ষ্মীপুরে ‘রশি টেনে’ নৌকায় ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার

Print Friendly, PDF & Email
লক্ষ্মীপুর সদর ও কমলনগর উপজেলার ৮ টি গ্রামের বাসিন্দারা এভাবেই রশি টেনে নৌকায় ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার করছে প্রতিদিনই। ছবি: ফরহাদ হোসেন

নিজস্ব প্রতিবেদক:

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার টুমচর ইউনিয়নের কালিরচর গ্রামের রহমত খালী খাল পারাপারে নেই কোন সেতু। ফলে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীসহ খালের দুই পাড়ের হাজার হাজার মানুষের। বাধ্য হয়ে রশি টেনে নৌকায় ঝুকিপূর্ণ পারাপার করছেন প্রতিদিনই। অথচ সেতুটি নির্মাণ হলে ভোগান্তি লাগবের পাশাপাশি যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতো বলে ধারণা স্থানীয়দের। তবে স্থানীয় চেয়ারম্যান বলছেন উদ্ধতন কর্তৃপক্ষকে বারবার অবহিত করেও একটি সেতু পাওয়া যাচ্ছে না।

জানা যায়, টুমচর ইউনিয়নে কালিরচর গুচ্ছগ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে রহমত খালী খাল। তীব্র ভাঙনের ফলে খালটি দেখে মনে হচ্ছে এটি কোন একটা নদী। খালের দুই পাশে লম্বা বাঁশের খুটির সঙ্গে বাঁধা রয়েছে একটি রশি। সেই রশি টেনে টেনে পারাপার হচ্ছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ রোগী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, কৃষক ও দিনমজুরসহ প্রায় ৮টি গ্রামের বাসিন্দারা। অনেক সময়ই নৌকা থেকে খালে পড়ে যায় অনেকেই। মেঘনা নদীর সঙ্গে খালটির সংযোগ থাকায় বর্ষাকালে জোয়ারের সময় খালটিতে কচুরিপাতা জমে যায়। ফলে কেউ সাঁতার দিয়ে কেউবা কষ্ট করে কচুরিপাতা সরিয়ে রশি টেনে টেনে নৌকায় পারাপার করে। তবে কচুরিপাতা জমে থাকা অবস্থায় বেশিরভাগ সময়ই নৌকা পারাপার বন্ধ থাকে।

খালটির দু পাড়ে অবস্থিত গ্রামগুলোতে প্রচুর পরিমানে সবজি চাষ হয়ে থাকে। কিন্তু সেতু না থাকায় সবজি সঠিক সময়ে বাজারে নেওয়া সম্ভব হয় না চাষিদের পক্ষে। ফলে অল্প দামে খাল পাড়ে পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে। তাই খরচের তুলনায় লাভ না হওয়ায়, সবজি চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষ। অন্যদিকে সেতু না থাকায় খাল পাড়ে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় পারাপারের জন্য, যার কারণে সঠিক সময়ে কেউ গন্তব্য স্থানে পৌছাতে পারে না।

টুমচর আসাদ একাডেমীর অষ্টম শ্রেনীর শিক্ষার্থী আছমা আক্তার বলেন, খালটি পারাপারের জন্য পাড়ে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থকতে হয়, তাই সঠিক সময়ে স্কুলে যেতে পারি না। অন্যদিকে খালে কচুরিপাতা জমে থাকার কারনে যেদিন নৌকা চলে না, সেদিন আর স্কুলে যাওয়া হয় না। কিন্তু সেতুটি থাকলে নিয়মিত সঠিক সময়ে স্কুলে যেতে পারতাম।

অন্য এক কলেজ শিক্ষার্থী আল ফয়েজ হোসেন রাকিব বলেন, খাল পারাপারের সময় কয়েকদিন নৌকা থেকে পড়ে গিয়েছি, এতে জামা-কাপড়সহ বই-কাগজ সব ভিজে গিয়েছে। আমাদের এত কষ্ট দেখেও কেউ কোন ব্যবস্থা গ্রহন করছে না। খালের দুই পাড়ের বাসিন্দারা অধিকাংশ দরিদ্র হওয়ায় নিজেদের উদ্যোগেও সেতুর বিকল্প কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না।

পল্লী চিকিৎসক সাইফুল ইসলাম জানান, সেতু না থাকায় খাল পারাপারে নানা সমস্যায় পড়তে হয়, তাই সঠিক সময়ে অসুস্থ রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানও করতে পারি না। তাই সেতুর অভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে এ অঞ্চলের বাসিন্দারা।

সবজি চাষি আক্তার হোসেন বলেন, সেতু না থাকায় ও খাল পারাপারে নানা সমস্যা থাকায় যথাসময়ে বাজারে সবজি নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে খাল পাড়েই খদ্দেরের কাছে বিক্রি করতে হয় সবজি, তাই সঠিক দাম পাওয়া যায় না। এতে লাভের চেয়ে লোকশানই বেশি হয়। যার কারণে এ অঞ্চলের অনেক চাষি সবজি চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে।

কমলনগর উপজেলার চরমার্টিন এলাকার বাসিন্দা নুর ইসলাম খাল পাড়ে দীর্ঘসময় দাড়িয়ে রয়েছেন অসুস্থ নাতি জাহিদকে নিয়ে। গন্তব্য লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ডাক্তার দেখাবেন। তাঁর সাথে কথা হলে তিনি জানান, জেলা শহরে যাওয়ার সহজ পথ এটি, তাই এ পথেই যাতায়াত করেন । সবসময় খালটি পার হওয়ায় জন্য দীর্ঘসময় দাড়িয়ে থাকতে হয়, অনেক সময় নৌকা পেলেও লোকজন বেশির কারনে নৌকায় উঠতে পারেন না। যার জন্য গন্তব্য স্থানে যেতে পারেন না ঠিক সময়ে। হাজার মানুষের কষ্টের কথা ভেবে খালটির উপর দ্রুত সরকার একটি সেতু নির্মাণ করবে এমনটি প্রত্যাশা তাঁর।

খালপাড়ে পুরুষদের সাথে দাড়িয়ে আছে আছমা, রহিমা, শিউলি, ফাতেমা ও ময়না আক্তার নামে কয়েকজন মহিলা। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা সবাই খালের ঐ পাড়ের পন্ডিত বাড়িতে একটি বেসরকারি এনজিও সংস্থার থেকে নেওয়া ঋনের টাকার কিস্তি পরিশোধ করতে যাচ্ছেন। দূর্ভোগের কথা তারা বলেন, সেতু না থাকায় অনেক সময় ঝড়বৃষ্টির মধ্যে ঝুকি নিয়ে বিভিন্ন প্রয়োজনে খালটি পারাপার করেন। কিন্তু তাদের এই দূর্ভোগের আর কষ্ট সংশ্লিষ্ট কারোই দৃষ্টিতে পড়েনি। পড়লে হয়তো এতোদিনে তাদের জন্য একটি সেতু নির্মান হতো। তাতেই যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হতো, অর্থনৈতিক দ্বার উন্মোচিত হতো। তাই তারা দ্রুত একটি সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের সুদৃষ্টি কামনা করেন।

নৌকার মাঝি জামাল মিয়া জানান, রশি টেনে টেনে খাল পার করতে খুব কষ্ট হয়। স্থানীয়দের কষ্টের কথা চিন্তা করেই এ কাজ করি। বর্ষাকালে খালে অনেক পানি ও ঢেউ থাকে, তখন রশি টানতে খুব কষ্ট হয়। এখানে খাল পারাপারে নির্দিষ্ট কোন ভাড়া নেই, লোকজন যত টাকা দেয় তাই নেই। তবে কচুরিপাতা খালে ভরে গেলে নৌকা চালানো বন্ধ থাকে। কারণ কচুরিপাতার মধ্যে রশি টানতে পারবো না।

স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সৈয়দ নুরুল আমিন লোলা বলেন, রহমত খালী খালের উপর একটি সেতুর অভাবে এখানকার মানুষের দূর্ভোগের কথা উদ্ধতন কর্মকর্তাদের কয়েকবারই অবহিত করেছি। কিন্তু এখনো পর্যন্ত ভালো ফলাফল পাইনি। দ্রুত একটি সেতু নির্মাণ করে দিলে এ অঞ্চলের মানুষ বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার প্রতি চির কৃতজ্ঞ থাকবে।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাজাহান আলী বলেন, সেতু সংকটের কারনে মানুষের দুর্ভোগের কথা জানা নেই। তবে কেউ লিখিতভাবে জানালে, উদ্ধতন কর্মকর্তাদের অবহিত করবেন এবং কিছুসময়ের জন্য পারাপারে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহন করবেন বলেও জানান।