১৫ বছর পরে বৃদ্ধ আবুল খায়ের নিজ বাড়িতে

Print Friendly, PDF & Email
চাঁদপুর  : পনের বছর পর মতলবের বৃদ্ধ আবুল খায়ের বাড়ি ফিরলেন। আজ ৯ জুলাই মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ শাহিদুল ইসলাম দেখতে যান বৃদ্ধ আবুল খায়েরকে। খোঁজ খবর নেন পুরো পরিবারের। তাৎক্ষণিক তিনি বৃদ্ধ আবুল খায়েরকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের আশ্বাস প্রদান করেন। এদিকে আবুল খায়ের পরিবারের সদস্যদেরকে পেয়ে অবাক। ঘরে স্ত্রী আয়াতুন নেছাকে না দেখে ভেঙ্গে পড়েন আবুল খায়ের।

বাড়ি থেকে বের হওয়ার দু’বছরের মাথায় স্ত্রী আয়াতুন নেছা মৃত্যুবরণ করেন। বাড়ির লোকজন ও পরিবারের সদস্যরা আবুল খায়েরকে পেয়ে আনন্দে উল্লাসিত। পুত্রবধু, নাতি-নাতনী ও স্বজনরা জড়িয়ে ধরেন আবুল খায়েরকে। বৃদ্ধ আবুল খায়ের গোসল ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে খাবার দেন। খাবার খেয়ে আবুল খায়ের আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন। পনের বছর বাড়িতে এসেছি। এ অবদান সাংবাদিকদের। সাংবাদিক আবুল কাসেম স্যার আমার গ্রামের বাড়ির খোঁজ খবর নিয়ে আমাকে চাঁদপুরের সাংবাদিক শাহ মোঃ মাকসুদ ও মতলব প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রোটা. শ্যামল চন্দ্র দাসের সহযোগিতায় আমার ছেলে নওগাঁও গ্রামের রতন পাঠানের মাধ্যমে আমার ছেলেদেরকে খবর দেন। আমার ছেলেরা খবর পেয়ে সাতক্ষীরায় গিয়ে আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি, আমি বাড়িতে ফিরে এসেছি।

আত্মীয়-স্বজন, ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনীকে পেয়ে আমি অনেক আনন্দিত। কোন দিন ভাবিনী বাড়িতে ফিরে আসবো। ঘরে বসে ভাত খাবো। সবই আল্লাহর রহমত। ছেলে শাজাহান সরকার বৃদ্ধ বাবাকে পেয়ে আত্মহারা। এদিকে পত্র-পত্রিকায় এ সংবাদটি প্রকাশিত হলে মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ শাহিদুল ইসলামের নজরে পড়ে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বৃদ্ধ আবুল খায়ের এর জন্য আর্থিক সহায়তার আশ্বাস প্রদান করেন। উল্লেখ্য, সাতক্ষীরা ত্রিশমাইলে গত ৮ জুলাই রোববার সকালে অঝোরে কাঁদছিলেন চাঁদপুর জেলার মতলব দক্ষিণ উপজেলার উপাদী উত্তর ইউনিয়নের নওগাঁও সরকার বাড়ি পাঁচকিপাড়া গ্রামের মোঃ শাজাহান সরকার।

পনের বছর আগের কথা। পড়ন্ত বিকেলে চা পানের কথা বলে হুট করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান ৫৫ বছর বয়স্ক আবুল খায়ের। স্থানীয়ভাবে তাকে সবাই লনু মিঞা বলে চেনেন। ২ ছেলে ও ৫ মেয়ে সন্তানের জনক লনু মিঞা মানসিকভাবে কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ ছিলেন। তবে তার আচরণের মধ্যে পাগলামির তেমন নমুনা ছিলনা। লনু মিঞা চা পানের কথা বলে সেইযে বেরিয়ে গেলেন আর বাড়ি ফেরেননি। এরপর তিনি কোথায় ছিলেন তা কারো জানা নেই। পাটকেলঘাটা থানার ত্রিশমাইল এলাকার চা বিক্রেতা নুর ইসলাম জানান, মাস তিনেক আগে স্থানীয় সাইকেল মিস্ত্রি গাউসের দোকানের সামনে বৃদ্ধ লোকটাকে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তিনি তাকে তুলে মসজিদের পাশে থাকতে দেন। স্থানীয়দের সহায়তায় তিনি অপিরিচিত এই লোকটাকে খাইয়েছেন। এমনকি তার চিকিৎসাসেবাও দিয়েছেন। পরে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তার থাকার জন্য একটা জায়গাও করে দেন। এভাবেই চলছিল।

তবে তার শারিরীক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তারা চিন্তায় পড়ে যান। বয়স্ক লোকটা কোন কথা না বলায় তার পরিচয় জানা সম্ভব হচ্ছিলনা। বহুচেষ্টার একপর্যায়ে তার পরিচয় জানা সম্ভব হয়। পরে তার ঠিকানা সংগ্রহ করে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে সরবরাহ করেন। গণমাধ্যমকর্মী আবুল কাসেম বলেন, নুর ইসলামের কাছ থেকে ঠিকানা সংগ্রহ করে তিনি সংবাদের চাঁদপুর প্রতিনিধি শাহ মাকসুদের সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি মতলব প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল চন্দ্র দাসের ফোন নাম্বার দিলে তার মাধ্যমেই খোঁজ মেলে লনু মিঞার পরিবারের। তাঁর একটি কান বোচা দেখেই নিশ্চিত হওয়া যায়, ইনিই সেই হারিয়ে যাওয়া লনু মিঞা। লনু মিঞার ছোট ভাই শাহ আলম বলেন, সাংবাদিক শ্যামল চন্দ্র দাসের কাছ থেকে ভাইয়ের খবর জানতে পেরে তাৎক্ষনিকভাবে স্বল্প প্রস্তুতি নিয়েই তারা বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়েন। ভাইকে খুঁজে পাওয়ার আনন্দে রাতে গাড়ির মধ্যে এতটুকু ঘুমাতে পারেননি তারা কেউই।

নাতি ফারুক হোসেন বলেন, নানার চেহারা কেমন, আমার মায়ের কাছ থেকে শুনে মনের মধ্যে একটা ছবি এঁকে রেখেছিলাম। নানির আদর পাইনি। নানাকে পেয়ে তার দীর্ঘদিনের একটি মনোবসনা পূর্ণ হল। ত্রিশমাইলে যে ছোট্ট কাঠের ঘরটিতে লনু মিজ্ঞা থাকতেন, সেই ঘরের মধ্যে বসেই ছেলে-নাতি আর ভাইকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাদছিলেন তিনি। কথা বলতে পারছিলেননা। চোখের নোনা জ¦লে শুধুই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিলেন নীরবে।