লক্ষ্মীপুরে মেঘনায় অভিযানও নেই, ইলিশও নেই!

Print Friendly, PDF & Email

নিজস্ব প্রতিবেদক:
মার্চ-এপ্রিল দুই মাস জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশের উৎপাদনের লক্ষ্যে মেঘনায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। এসময় অবসরই কেটেছিল জেলেদের। নিষেধাজ্ঞার পর আবারও নদীতে মাছ শিকারে নেমেছে তারা। প্রায় দু’মাস কেটে গেলেও লক্ষ্মীপুরের মেঘনায় জেলেদের জালে ধরা পড়ছেনা রূপালী ইলিশ। জানা গেছে, ভরা মৌসুমে প্রতিদিন ১০/১২ জন জেলে মাছ ধরার নৌকা নিয়ে নদীতে গিয়ে ঘাটে ফিরছেন দু-একটি ইলিশ নিয়ে। কেউবা আবার ফিরছে শূন্য হাতে। এতে দৈনিক খরচের তুলনায় আয় না হওয়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন এখানকার জেলে পরিবারগুলো। তাছাড়া বিনিয়োগ করে এখন লোকসান গুনছেন আড়ৎদার ও দাঁদন ব্যবসায়ীসহ এর সাথে জড়িত সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উপকূলীয় এ জেলার প্রধান পেশা কৃষি। তবে এখানকার বড় একটি অংশ মৎস্য সম্পদের উপর নির্ভরশীল। সরকারি হিসাব মতে ৬২ হাজার জেলে এই পেশার সাথে জড়িত। তবে বেসরকারী হিসেবে লক্ষাধিক মানুষ এই মাছ ধরার সাথে জড়িত রয়েছেন। এছাড়াও জেলায় ৩০টি মাছঘাট এবং সরকারি ও ব্যক্তি মালিকায় অনেকগুলো বরফ কল রয়েছে, তারা সবাই এখন অবসর সময় পার করছেন।

জড়িতরা জানায়, ইলিশ মাছ নদীর গভীর এলাকায় অবস্থান করে। মেঘনা নদীর বিভিন্ন স্থানে ডুব চরের কারণেও অধিকাংশ মাছ সমুদ্রের চলে গেছে। তাই ভরা মৌসুমেও দিন-রাতে জাল ফেলেও ইলিশ না পাওয়ায় হাতশ তারা। গত বছর এই দিনে ঘাটগুলোতে ইলিশ বেচাকেনায় ব্যস্ত থাকতো। সেখানে ইলিশ শূণ্য হয়ে পড়েছে লক্ষ্মীপুরের ঘাটগুলো। এখন অনেকটা অলস সময় পার করছেন জেলে ও আড়ৎদাররা।

জেলার সবচেয়ে বড় মাছঘাট হচ্ছে কমলনগর উপজেলার মতিরহাট মাছঘাট। এখানে ৪১টি বাক্সে প্রতিবছর প্রায় দশ কোটি টাকার মাছ বেচা-বিক্রি হয়ে থাকে। দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকাররা এসে মাছ নিয়ে যায় এ ঘাট থেকে। অথচ এবার মতিরহাট মাছঘাটে গিয়ে দেখা যায়, আড়ৎদার ও দাঁদন ব্যবসায়ীরা খালি বাক্স নিয়ে বসে আছে জেলেদের অপেক্ষোয়। আবার জেলেরা শূন্য হাতে এসে বলছে জালে মাছ ধরা পড়ছে না।

এছাড়াও জেলা সদরের মজু চৌধুরীর হাট, কমলনগরের লধুয়াঘাট, রায়পুরের মোল্লারহাট, রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার মাছঘাট, বড়খেরী ও চেয়ারম্যানঘাটসহ বিভিন্ন হাটে ঘুরে একই চিত্র দেখা যায়।
চর কাছিয়া এলাকার জেলে আবদুস সালাম বলেন, ‘মেঘনা নদীতে এখন অভিযান নেই, ইলিশও নেই! গতবছর এসময় নদীতে দৈনিক ৮-১০ হাজার টাকার মাছ ধরা পড়তো। নৌকার খরচ আর দাঁদনের টাকা দিয়েও পকেটে টাকাও থাকতো। অথচ এখন তার উল্টো টা। কয়েকজন জেলে মিলে নদীতে গেলে নৌকার ইঞ্জিনের তেল ও খাবারে সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত উল্টো খরচ যাচ্ছে। কিন্তু মাছ মিলছে না।

সাহেবের হাট এলাকার জেলে মুক্তার মাঝি ও রতন জানান,এক-একজন জেলে দাঁদন ব্যবসায়দের কাছ থেকে অগ্রিম এক-দেড় লাখ টাকা করে নিয়েছেন। মেঘনায় আশানুরূপ মাছ ধরা না পড়ায় তাদের মাঝে দেখা দিয়েছে এক ধরনের হাহাকার। দাঁদনের দেনা পরিশোধ না করতে পেরে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন তারা।

এদিকে এ খাতে বিনিয়োগ করে এখন লোকসান গুনছেন আড়ৎদার ও দাঁদন ব্যবসায়ীরা। এসব আড়ৎদাররা ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর, মতলব শরীয়তপুর, ঢায়মুড়িয়া, ইজলা, ভৈরব, কালীগঞ্জ, শ্রীপুর ও ভোলাসহ বিভিন্ন স্থানের জেলেদেরকে অগ্রিম টাকা দিয়ে রেখেছে চলতি মৌসুমে ইলিশে ভালো লাভের আশায়। কিন্তু মেঘনা নদীতে মাছ না পাওয়ায় তারাও এখন কোটি টাকা বিনিয়োগ করে হতাশায় রয়েছেন।

মতিরহাট মাছঘাটের আড়ৎদার সায়েদুল হক বলি জানান, গত বছরও মেঘনা নদীতে ইলিশ মাছ বেচা-বিক্রিতে ৬০ লাখ টাকার ব্যবসা হয়েছিল। এবারও নদীতে ইলিশ ধরাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানের জেলে ও নৌকার মালিকদের ২-৩ লাখ টাকা করে অগ্রিম টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ ভরা মৌসুমেও নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। জেলেরা মাছ না ধরলে টাকা পরিশোধ করবে কিভাবে? এতে ব্যবসায় চরম ভাবে ক্ষতি হচ্ছে।

ওই ঘাটের আড়ৎদার হাজী আমজাদ হোসেন হান্নান জানান, নদীতে তার ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। এমনিতেই সরকার মার্চ-এপ্রিল দু মাস মাছ ধরা বন্ধ রেখেছে। তারপরও নদীতে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকদিন পর আবার ২২ দিনের অভিযান চালানো হবে। এর মধ্যে মাছ ধরা না পড়লে পুরো বছর ইলিশের আকাল থাকবে। এতে ব্যবসায় লোকসান হলে ব্যাংকসহ বিভিন্ন ঋনের টাকা পরিশোধ নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে। আড়ৎদার ইসাফিল হাওলাদার বলেন, এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এখন লোকসান। আগে দৈনিক ৭-১০হাজার টাকা লাভ থাকলেও এখন ২-৩ হাজারের বেশি হয় না। এ টাকা অন্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করলে এর দিগুন লাভ করা যেতো।

অপরদিকে নদীতে মাছ না পাওয়ায় ক্ষতির শিকার হচ্ছে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত পাইকাররা। আলাপ কালে ঢাকা কেরানীগঞ্জ থেকে আগত পাইকারকারি মো. মোস্তফা জানান, নিষেধাজ্ঞার পর প্রতিদিন মাছের জন্য আসায় হয়। ৪/৫দিন পর ৭/৮ কেজি মাছ পাওয়া যায়। তাও দাম ছড়া। এতে এক একবার যাতায়াত, ও খাবার খরচসহ ২৫ হাজার টাকা খরচ গুনতে হয়। কিন্তু মাছ মিলে না।

পাইকারকারী কাজী মাজহারুল ইসলাম, সিদ্দীক ব্যাপারী, নাছির ও ফারুক মাঝি জানান, গতবছরের ৪ ভাগের ১ ভাগ মাছও পাওয়া যায় না মেঘনা নদীতে। যে কয়টি পাওয়া যায় তারও দাম চড়া। এক কেজি পরিমাণের ইলিশ পাকারি ২ হাজার থেকে ২২শত টাকা, এক কেজির বেশি হলে ২৫শ থেকে ৩ হাজার টাকা, আবার ২ কেজির বেশি হলে ঘাটেই ৫ হাজার টাকা দিয়ে কিনতে হয়। এতে তারাও ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।

এ ব্যাপারে মতিরহাট মাছঘাটের সভাপতি মেহেদী হাসান লিটন মেম্বার বলেন, ৪৫ বছর পূর্বের পুরোন ও জেলার সবচেয়ে বড় এ মাছঘাট। প্রতিবছর ১১৫০ টাকা হারে ৪১টি মাছবক্স ৪১হাজার ১৫০ টাকা সরকারী ভ্যাট কৃষি বিপনী কেন্দ্রে জমা দিয়ে থাকে। তাছাড়া প্রতিবছর এঘাটে ইলিশের প্রায় ১০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়। অথচ এবার নদীতে মাছের না থাকায় এক লাখ টাকাও ব্যবসা হচ্ছে না। সব ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করে এখন হতায় আছেন।

জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম মহিব উল্যা জানান, একদিকে ডুব চরের কারণে নদীর ঘনত্ব কমে গেছে। অন্যদিকে এখনো পুরোপুরি ভরা মৌসুম হয়নি। অভয়াশ্রমের পর সব ইলিশ মাছ সমুদ্রের দিকে চলে গেছে। সে কারণে নদীতে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। আশা করছি সেপ্টম্বর-অক্টোবর মাসে আন্ধার মানিকের সময় নদীতে প্রচুর পরিমানে ইলিশ পাওয়া যাবে।