স্বেচ্ছাসেবীদের রক্তদানে লক্ষ্মীপুরে কমেছে দালালের দৌরাত্ম্য

Print Friendly, PDF & Email

নিজস্ব প্রতিবেদক: কয়েকজন বন্ধু মিলে লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ মাঠে গল্প করছি। হঠাৎ দেখছি! বন্ধু ফয়সালের মন খারাফ। কিছু হয়েছে কিনা? এমন প্রশ্ন করলে সে উত্তর দেয়, নিকট আত্মীয়ের অপারেশনের জন্য “ও পজেটিভ” রক্তের প্রয়োজন। কিন্তু কোনভাবেই ব্যবস্থা হচ্ছে না। ফয়সাল আমাকে বলল, ওনার সাথে তোর রক্তের গ্রুপের মিল রয়েছে। তুই কি রক্ত দিতে পারবি? বন্ধুকে খুশি করার জন্য রক্ত দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলাম সাথে সাথেই। এরপর যখন বন্ধু ফোন করে জানালো আগামীকাল রক্ত দিতে হবে। তখন থেকেই মনের মধ্যে নানা রকম ভয় কাজ করতে থাকে। তারপরেও রক্ত দিতে যে হবেই, কারন বন্ধুকে কথা দিয়েছি।

রক্ত দেওয়ার জন্য যখন হাসপাতালে গিয়েছি, তখনো ভয় করছে। কি যেন কি হয়ে যায়। কিন্তু না, রক্ত দেওয়ার পর মনের ভাবনার তেমন কিছুই হলো না। এরপর থেকেই প্রতিজ্ঞা করি, আমার রক্তে যদি বাঁচে প্রাণ, তাহলে করবো না কেন রক্ত দান। নিজের রক্তদানের উৎসাহের কথা এভাবেই বললেন মানুষ মানুষের জন্য (মামাজ) এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আবুল হাসান সহেল।

বিচ্ছিন্ন ভাবে স্বেচ্ছায় রক্তদান বহুআগ থেকেই চলে আসছে এই জেলায়। তবে সর্বপ্রথম ‘সেইভ আওয়ার লাইভ (সোল)’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ২০০৬ সালে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে রক্তদানে কাজ শুরু করে। তারপর থেকেই জেলার প্রত্যেকটি উপজেলায়, পাড়া, মহল্লায় বিভিন্ন নামে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো স্বেচ্ছায় রক্তদান করছে। বর্তমানে এই জেলায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সংখ্যা প্রায় দুইশত। এসব সংগঠনে রয়েছে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক। যারা বিভিন্ন সময় জেলায় ও জেলার বাহিরে মুমূর্ষু রোগীদের স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন।

নন্দন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রাজু আহম্মেদ বলেন, রক্ত মানবদেহের একটি গুরুত্বপূর্ন উপাদান। পূর্ণমাত্রায় রক্ত থাকলে মানবদেহ সক্রিয় থাকে, না থাকলে অকেজো হয়ে পড়ে। এই অতি প্রয়োজনীয় জিনিসটির বিকল্প এখনো পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞানী তৈরি করতে পারেনি। তাই একজন মানুষের রক্তের প্রয়োজনে অন্যজনকেই দিতে হয়।

রায়পুর ক্লাবের রক্তদাতা তানিয়া ফেরদৌসি শম্পি বলেন, রক্তদানে একজন মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচে, তাই রক্তদান করছি। বর্তমানে রক্তদানে মেয়েরা অনেক পিছিয়ে রয়েছে, তাই বিভিন্নভাবে তাদের উৎসাহিত করছি স্বেচ্ছায় রক্তদান করতে।

ত্বকি উদ্দিন আকরাম বলেন, কোন সুস্থ মানুষ রক্ত দান করলে স্বাস্থ্যের কোন ক্ষতি হয় না। এমনিতেই রক্তের লোহিত কণিকাগুলো তিন মাস পর পর নষ্ট হয়ে যায়। তাই নষ্ট করার চেয়ে স্বেচ্ছায় অন্যের জীবন বাঁচাতে দান করাই উত্তম।

স্বেচ্ছায় রক্তদাতা ইয়েস রিয়াদ হোসেন বলেন, পূর্বে রক্তের অভাবে অনেক রোগীর অকালে মৃত্যু হয়েছে। দালাল ও পেশাদার রক্তদাতাদের কারণে হয়রানির ও প্রতারণার শিকার হতে হয়েছে রোগীর স্বজনদের। বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবীদের স্বেচ্ছায় রক্ত দানের ফলে তা অনেকটা দুর হয়েছে। অন্যদিকে নিয়মিত রক্ত দানের কারণে স্বেচ্ছাসেবীরাও অনেক রোগমুক্ত থাকছে।

ব্লাড ফর বাংলাদেশের রক্তদাতা পরান হোসেন বলেন, মানব দেহের সুরক্ষায় রক্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য তরল উপাদান। মানবদেহে রক্তশূন্যতার জন্য রক্ত গ্রহণের যেমন বিকল্প নেই, তেমনি রক্তের চাহিদা পূরণের জন্য রক্ত বিক্রয়ও বৈধ নয়।

পরিবার পরিকল্পনা জেলা উপ-পরিচালক ডা. আশফাকুর রহমান মামুন বলেন, নিয়মিত রক্ত দান করলে ‘রক্ত তৈরির অস্থিমজ্জা সক্রিয় থাকে, উচ্চরক্তচাপের ঝুঁকি কমায়, হৃদরোগ, স্ট্রোক’ ইত্যাদি মারাত্মক রোগের সম্ভাবনা হ্রাস পায়।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোস্তফা খালেদ বলেন, স্বেচ্ছাসেবীরা স্বেচ্ছায় রক্ত দান করায়, কমেছে দালাল ও পেশাদার রক্তদাতাদের দৌরাত্ম্য। অন্যদিকে বর্তমানে রক্তের অভাবে মারা যাচ্ছে না কোন রোগী। তবে রক্তদানের সময় রক্তদাতার শারীরিকভাবে রক্তদানে উপযুক্ত কিনা, শরীরের ওজন, রক্তল্পতা ইত্যাদি পরীক্ষা করে দেখতে হবে। সুস্থ থাকলে একজন রক্তদাতা প্রতি তিন মাস পর পর রক্তদান করতে পারবে।