পাহাড় থমথমে

Print Friendly, PDF & Email
পাহাড় থমথমে

নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমার পর গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ প্রধান তপনজ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাসহ ছয়জন নিহতের ঘটনায় এখনও পার্বত্য চট্টগ্রামে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মানুষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না। বন্ধ রয়েছে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে যাত্রীবাহী বাস চলাচলও।

শনিবার নানিয়ারচরের বেতছড়িতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ড. মনিরুজ্জামান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দুই ঘটনার হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা যতদিন পর্যন্ত গ্রেফতার না হবে, ততদিন সাঁড়াশি অভিযান চলবে।

শুক্রবার দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেএসএস এমএন লারমা গ্রুপের সহসভাপতি শক্তিমান চাকমার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রওনা হন তপনজ্যোতি চাকমা ও এমএন লারমা গ্রুপের নেতাকর্মীরা। রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কের বেতছড়ি এলাকায় তাদের ব্রাশফায়ার করা হয়। এতে ঘটনাস্থলে নিহত হন তপনজ্যোতি চাকমা, সুজন চাকমা ও টনক চাকমা। হাসপাতালে মারা যান দু’জন।

এ হত্যাকাণ্ডের পর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নানিয়ারচরের বিভিন্ন এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর ডিআইজি মনিরুজ্জামান নানিয়ারচর বাজারে বিশেষ আইন-শৃঙ্খলা সভায় যোগ দেন। নানিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুনের সভাপতিত্বে এতে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ, জেলা পুলিশ সুপার আলমগীর কবির, খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার মো. মনির, নানিয়ারচর সেনা জোনের লে. কর্নেল বাহালুল আলম এবং রাঙামাটি সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর।

বিশেষ সভায় ডিআইজি বলেন, হত্যায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করা হবে। এ ছাড়া সামনে নির্বাচনকে ঘিরে কিছু অসাধু ব্যক্তি বা মহল পাহাড়ের পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চাইলেও তা করতে দেওয়া হবে না। অস্ত্র উদ্ধার ও চাঁদাবাজদের ধরতে প্রশাসনের পাশাপাশি পাহাড়ি-বাঙালিদের এগিয়ে এসে সহায়তার আহ্বান জানান ডিআইজি। তিনি বলেন, প্রয়োজনে তথ্যদাতাদের নাম গোপন রাখা হবে।

দুটি ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি : নানিয়ারচর থানার ওসি আবদুল লতিফ জানান, পৃথক হত্যাকাণ্ডে এখনও কেউ মামলা করেনি। নিহতের পরিবার এলে মামলা নেওয়া হবে। পরিবার যদি মামলা করতে না চায়, তাহলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। তবে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকলেও এসব ঘটনায় এখনও কেউ গ্রেফতার হয়নি।

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, তপনজ্যোতি চাকমার শেষকৃত্য শনিবার কড়া নিরাপত্তায় সম্পন্ন হয়েছে। দুপুরে খাগড়াছড়ি সদর থানা থেকে তপন ও তার সহযোগী টনক চাকমার মরদেহ শেষকৃত্যের জন্য সদরের তেঁতুলতলা এলাকায় নেওয়া হয়। নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক ও জনসংহতি সমিতি এমএন লারমার পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়। এর আগে সমাবেশে এমএন লারমা গ্রুপের নেতা বিভুরঞ্জন চাকমা ইউপিডিএফ প্রসিত গ্রুপকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করে তপন হত্যাকাণ্ডসহ পাহাড়ে সংঘটিত সব হত্যার সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানান।

খাগড়াছড়িতে ৭২ ঘণ্টার হরতালের ডাক: খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, নানিয়ারচরে হামলায় নিহত মাইক্রোবাসের চালক মো. সজীব হত্যার প্রতিবাদ, খুনিদের গ্রেফতার এবং ১৬ এপ্রিল মাইসছড়ি থেকে নিখোঁজ তিন বাঙালি কাঠ ব্যবসায়ীর সন্ধান দাবিতে বাঙালি ছাত্র পরিষদের দুই পক্ষ পৃথকভাবে তিন দিনের হরতাল ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে বৃহত্তর পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ গতকাল খাগড়াছড়ি শহরে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে রোববার জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালনের ঘোষণা দিয়েছে। সংগঠনের সভাপতি মো. মাঈনুদ্দিন ও সম্পাদক এস এম মাসুম রানা যৌথ বিবৃতিতে জানান, রোববারের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে ৭২ ঘণ্টা টানা হরতাল পালন করা হবে।

অপরদিকে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল মজিদ এবং সম্পাদক শাহাদাৎ ফরাজী সাকিব শনিবার আরেক বিবৃতিতে একই দাবিতে আগামীকাল এবং পরদিন মঙ্গলবার খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য জেলায় টানা ৪৮ ঘণ্টার হরতালের ডাক দিয়েছে। এ ছাড়া খাগড়াছড়ি ভাড়ায় চালিত মাইক্রোবাস ও কার চালক সমিতি সজীব হত্যার প্রতিবাদে আগামীকাল পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দিয়েছে।

সজীবের লাশ দাফন: মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি জানান, মাইক্রোবাসের চালক সজীবের লাশ শনিবার উপজেলার গুলিশাখালীর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। মঠবাড়িয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মাজাহারুল আমীন লাশ দাফনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।