বাঘ মামার বিয়ে

Print Friendly, PDF & Email

অনেক দিন শিয়াল পণ্ডিতের খোঁজ খবর নাই। বাঘ মামাতো শিয়ালের উপর খ্যাপা। শিয়াল পণ্ডিতও ভয়ে ভয়ে আছে। কবে যে ডাক পড়ে, এই ভয়ে আড়ালে আবডালে শিয়াল পণ্ডিত ঘুরে বেড়ায়। তবে শেষ পর্যন্ত রেহায় পেল না শিয়াল পন্ডিত। ডাক পড়ল শিয়াল পন্ডিতের।

শিয়াল পন্ডিত তো ভয়ে আধমরা। কিন্তু শিয়াল পন্ডিত তা বুঝতে না দিয়ে একদিন হাঁপাতে হাঁপাতে বাঘ মামার কাছে এসে হাজির। এসেই অনুনয় বিনয় করে বলে, ‘মামা খুব কষ্টে আছি। দিনকাল ভালো যাচ্ছে না। লোকজন মুরগীঘর এখন এমনভাবে বানাচ্ছে, আমি বুঝি শেষ। ক্ষুধার জ্বালায় মরে যাচ্ছি মামা।’

‘তোর তো এখনো কুমিরের মাংসই হজম হয় নি। আমার রাজ্যে তুই এমন বেয়াদপি করলি, তোকে কিভাবে মাফ করব বল। তোকে তো কুমিরের ডেরায় রেখে আসার হুকুম দেব ভাবছি।’

শিয়াল পণ্ডিতের তো একথা শুনে অক্কা যাবার অবস্থা। বাঘ মামাকে নানা অনুনয় বিনয় করে শিয়াল। কিন্তু কোন লাভ হয় না। বাঘ মামা বলে, ‘অনেক জ্বালিয়েছিস তুই আমাকে। কুমির হচ্ছে জলের মোড়ল। আর সেই কুমিরের সাথে বাটপারি এ আমি মেনে নেব না। আজকেই তোকে কুমিরের ডেরায় যেতে হবে।’

শিয়াল পণ্ডিত মনে মনে কল্পনা করে, সে কুমিরের ডেরায় আর কুমিরেরা তাকে ছিঁড়ে-ছুটে খাচ্ছে। ভাবতেই আতকে ওঠে শিয়াল পণ্ডিত।

শিয়াল পণ্ডিত এবার কান্না কাটি করে বলে, ‘মামা, আমি কুমিরের ডেরায় গেলেতো আমি মরেই যাব। মরার আগে আমার যে একটা শেষ ইচ্ছা আছে।’

‘হাজার হলেও তুই আমার ভাগ্নে, তোর শেষ ইচ্ছা আমি পূরণ করব। বল তোর শেষ ইচ্ছা কি?’

‘সেটাতো এখন বলা যাবে না মামা, আমাকে দুই দিন সময় দাও। আমি আমার ইচ্ছা পূরণ করে তারপর ফিরে আসব।’

‘ঠিক আছে, যা। তবে চালাকি করবি না আবার। তাহলে কিন্তু আমিই তোর ঘাড় মটকে দেব।’

‘তা আবার বলতে মামা।’

পরদিন কথা নাই বার্তা নাই, শিয়াল পণ্ডিত তার ডোল পিটিয়ে সারা রাজ্যে জানিয়ে দিল, ‘বাঘ মামার বিয়ে! বাঘ মামার বিয়ে!’

সবাই জিজ্ঞাসা করে, ‘কি পণ্ডিত সাব, কার সাথে মামার বিয়ে দিচ্ছ?’

শিয়াল পণ্ডিত বলে, ‘বিয়ের সময়ই দেখো সবাই। মামার নিষেধ আছে কণের নাম বলতে।’

এ সংবাদ বাঘ মামার কানে যেতেই রেগে অস্থির। শিয়াল পন্ডিতের ডাক পড়ল আবার। শিয়াল পণ্ডিত আসতেই বাঘ মামা তার থাবা দিয়ে শিয়ালের টুটি ধরে বলে, ‘আমি জানি না আর আমার বিয়ে। তোর ঘাড় আমি এখনি মটকে দেব।’

শিয়াল পণ্ডিত বলে, ‘দেখ মামা, আজ হোক আর কাল হোক আমি মরবই। জীবনের প্রতি আমার মায়া নেই। কিন্তু মামা, মরার আগে আমি মামীকে দেখে যেতে চাই।’

এ কথা শুনে বাঘ মামার মন গলে গেল। ভাবল, ভাগ্নে তাহলে মনে মনে আমাকে এত ভালোবাসে। ভাগ্নে তো ঠিকই বলেছে, বয়স তো কম হল না, রাজ্য চালানোর ঝামেলা টানতে টানতে বিয়ে করার কথা তো ভুলেই গেছি।

বাঘ মামা এবার নরম সুরে বলে, ‘বিয়ে তো বুঝলাম, কিন্তু কণে কে? রাজ্যের সবাইতো আমাকে ভয় পায়। আমাকে বিয়ে করবে কে বল?’

শিয়াল পণ্ডিত বলে, ‘মামা ভয় দিয়েই তো সব জয় করতে হয়। কণের চিন্তা তোমার করা লাগবে না। কালকেই বিয়ে, তুমি বিয়ের ব্যবস্থা করো। পরশুতো আবার আমাকে কুমিরের ডেরায় পাঠাবে।’

এদিকে শিয়াল পণ্ডিত সবাইকে যেয়ে বলে দিল, বাঘ মামার কণে পছন্দ হয়ে গেছে। যাকেই পছন্দ হোক না কেন, তাকে বিয়ে করতেই হবে, তা না হলে সবার কপালে কষ্ট আছে। কণের বাড়িতে গিয়ে কণেকে বিষয়টা জানানো হবে।

বনের রাজার বিয়ে আর দাওয়াত হবে না। তা কি হয়! বাঘ মামা রাজ্যের সবাইকে দাওয়াত করল। সবাই নাচতে নাচতে বাঘ মামার বিয়েতে চলে আসল। কিন্তু কণের খোঁজ নেই। শিয়াল পণ্ডিতেরও খোঁজ নেই। বাঘ মামা পড়ল বিপাকে। শিয়াল পণ্ডিত কি এবারও তাকে ধোকা দিল!

বাঘ মামা চিন্তায় পড়ে গেল। তবে সূর্য ডোবার ঠিক আগেই শিয়াল পণ্ডিতের দেখা মিলল। তার সাথে একটা হরিণী। শিয়াল পণ্ডিত এসেই বাঘ মামাকে আড়ালে ডেকে বলে, ‘মামা কণের বড় অভাব। তারপর আবার কণেকে হতে হবে সুন্দরী। হাজার হলেও আমার মামী হবে। খুব কষ্টে রাজী করিয়ে তারপর নিয়ে আসতে হল। তাই দেরী হয়ে গেল।’

বাঘ মামা বাইরে বেরিয়ে নাদুস-নুদুস হরিণীটির দিকে তাকাতেই জিভে জল চলে আসে। তারপর শিয়াল পণ্ডিতকে বলে, ‘ভাগ্নে, তোর পছন্দের তারিফ করতে হয়।’

বাঘ করছে হরিণীকে বিয়ে। বিষয়টা মানায় না। তবু সবাই আনন্দ-উল্লাস করে, কারণ পাছে আবার যদি বাঘ ঘাড় মটকে দেয় এই ভয়ে।

পরদিন সকালে সেজে-গুঁজে চোখে-মুখে কান্না নিয়ে শিয়াল পণ্ডিত হাজির বাঘ মামার কাছে। কারণ আজকেই কুমিরের ডেরায় যেতে হবে তাকে। শিয়াল পণ্ডিত যেয়ে দেখে, বাঘ আছে ফুরফুরে মেজাজে। শিয়ালকে দেখেই বাঘ তার ধারলো দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলে, ‘ভাগ্নে আয়। তোর অপেক্ষাই করছিলাম। পারলে আরেকটা বিয়ে দিয়ে দে না আমায়। জানিস তো আগের মত দৌড়াতে পারি না এখন।’

ফুরফুরে মেজাজে এসব নানান কথা বলতে বলতে বাঘ ভুলেই যায় শিয়াল পণ্ডিতকে কুমিরের ডেরায় পাঠানোর কথা। শিয়াল পণ্ডিতও বুঝল টোপে কাজ হয়েছে। এ যাত্রায় রক্ষা পেল শিয়াল পণ্ডিত।

বাঘ মামার কাছ থেকে ফেরার পথে শিয়াল পণ্ডিত ভাবল, কিছুদিন শান্তিতে থাকা যাবে তাহলে।

—-সমাপ্ত—