সত্য অস্বীকার করা মস্ত বড় বোকামি

Print Friendly, PDF & Email

১৭ এপ্রিল মুজিব নগর দিবসে সকালে দীপ্ত প্রভাতে সৈয়দ আবদুল হাদীর অসাধারণ দেশাত্মবোধক শুনছিলাম। স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পীদের গান শুনলে এখনো শিহরণ জাগে, মুক্তিযুদ্ধের আনন্দ-বেদনার দিনগুলো মনে পড়ে। সেদিন সৈয়দ আবদুল হাদীর গানগুলো আমাকে মুজিব নগরের বৈদ্যনাথ তলায় নিয়ে গিয়েছিল। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে শত আনন্দের মধ্যেও অনেকের জন্য বড় কষ্ট হয়। তার মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতারের কলা-কুশলী শিল্পীদের জন্য অসম্ভব কষ্ট হয়, খারাপ লাগে। আমরা স্বাধীনতার কথা বলি, চেতনার কথা বলি, কিন্তু স্বাধীনতাকে মূল্য দেই না। যাদের নিয়ে বাংলাদেশ, যাদের নিয়ে স্বাধীনতা তাদের স্বীকার করতে কৃপণতা করি। তাদের নিয়ে কথা বলতে মুখে লাগাম টানি না। যখন যা মুখে আসে তাই বলি। বরং অনেক ক্ষেত্রে অন্যদের চাইতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় করতে তাচ্ছিল্য করতে গর্ববোধ করি। হাদীর গান শুনে মনে পড়ছিল এখন যারা প্রতিষ্ঠিত তখন তারা কোথায় ছিল? স্নেহের মমতাজ গান গাইতে গেলে সাড়া পড়ে যায়। জেমস, আয়ুব বাচ্চু যখন গান গায় কেমন এক অসাধারণ আলোড়ন সৃষ্টি হয়। নিশ্চয়ই আরও সাড়া জাগা অনেক শিল্পী আসবে যাবে। কিন্তু যারা দেশ জন্ম দিয়েছে তাদের সঙ্গে তুলনা হবে না। আবদুল জব্বার, আপেল মাহমুদ, রথীন্দ্র নাথ রায় আরও আরও স্বাধীন বাংলার গায়ক-গায়িকাদের কোনো তুলনা নেই। যখন শুনতাম সরদার আলাউদ্দিনের ‘পাখি যাবে রে উড়ে শূন্য খাঁচা ছেড়ে পাখি যাবে রে’ পাকিস্তানের পদানত বাংলাদেশ সবকিছু ফেলে তখন জেগে উঠত। স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী মান্না হক, তার নাকি এখনো মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম নেই। তার ছেলে-মেয়েরা চান মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় বাবার নাম তুলতে। যিনি স্বাধীন বাংলা বেতার পরিচালনা করতেন সেই জননেতা আবদুল মান্নান, তাকে তো সবাই ভুলে যেতেই বসেছে। এই হলো আমাদের অবস্থা। আমরা বড় বেশি বর্তমান নির্ভর। অতীতকে অস্বীকার বা অবহেলা করে যে বর্তমান দাঁড়াতে পারে না বা শক্ত হয় না সে জ্ঞানও আমাদের নেই। একটা দেশের স্বাধীনতায় বিশেষ করে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনে যেমনি অস্ত্রের প্রয়োজন, তেমনি জনসাধারণের সমর্থন প্রয়োজন। আমি আমার অল্প বুদ্ধিতে একটা বেতার যন্ত্র যে অমন বিধ্বংসী যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে কাজ করতে পারে মুক্তিযুদ্ধের আগে জানতাম না, আকাশে বিমান, জমিনে কামান কোনোটাই স্বাধীন বাংলা বেতারের চরমপত্র, জল্লাদের দরবার বা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি এসবের চাইতে শক্তিশালী ছিল। একজন প্রত্যক্ষ যোদ্ধা হিসেবে বলছি। আজকাল সেই সব কলাকুশলী শিল্পীদের কোনো খবর নেই, মর্যাদা নেই। প্রতিযোগিতার জামানায় তাদের টিকে থাকাই দায়, তাদের অপমান অবহেলা সহ্য করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। রাষ্ট্রের হর্তা-কর্তরা সমাজপতিরা অনেকেই পূর্ণ নয়, সুযোগে বা স্রোতে উচ্চাসনে বসেছেন। তাই আসল যাদের নেই নকলই তাদের ভরসা। সেই জন্যে অতীতকে স্বীকার নয়, অস্বীকারের এক মহা প্রতিযোগিতা চলেছে সেই প্রতিযোগিতায় আমরা সবাই অসহায় দিশাহারা।

খ্যাত আইনবিদ অন্যতম সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনের গত শুক্রবার ছিল ৮১তম জন্মদিন। জনাব মোস্তফা আমিন জাতীয় ঐক্য প্রচেষ্টার পক্ষে তার জন্মদিনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ড. কামাল হোসেনের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সকালে টাঙ্গাইল থেকে রওনা হয়ে শ্যামলী শিশু পল্লী জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করে বাড়ি ফিরেছিলাম। সবার জানা, উত্তরবঙ্গের মানুষের যাতায়াতে কী যে দুর্বিষহ কষ্ট। রংপুর-দিনাজপুর থেকে যারা ৪-৫ ঘণ্টায় কালিয়াকৈর-চন্দ্রা আসে, সেখান থেকে ঢাকা আসতে আরও ৪-৫ ঘণ্টা তাদের ব্যয় করতে হয়। আমরা টাঙ্গাইলের মানুষ। সপ্তাহে ২-৩ বার যাতায়াত করি। আমাদের জীবন শেষ। আরও ২-৪ বছর আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখবেন কিনা জানি না, কিন্তু রাস্তার কল্যাণে আমাদের জীবন আয়ু স্বাভাবিকভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে। কাকে বলব? সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জননেতা হিসেবে বড় ভালো ছিলেন। কোনো কিছু বললে হৃদয় দিয়ে শোনার চেষ্টা করতেন। মন্ত্রী হওয়ার পর ছোটাছুটি করছেন অনেক। রাস্তা-ঘাট সচল রাখার চেষ্টা করছেন অবিরাম। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। অল্প কিছুদিন ঢাকা-মানিকগঞ্জ রাস্তায় কালামপুর-নবগ্রাম-ওয়ার্শি হয়ে মির্জাপুরের পোস্টকামারীতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে উঠেছে। সেদিন সে রাস্তা দিয়ে এসেছি। সেতুমন্ত্রীর উদ্বোধনের ব্যানার পোস্টার গেট এখনো রয়েছে। যা প্রমাণ করে রাস্তাটি অতি সম্প্রতি জনগণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। পুলের রেলিংগুলোর রং এখনো ঝলমল করছে। কিন্তু রাস্তার দুরবস্থা দেখলে উম্মাদেরও কান্না পাবে। ৩০-৪০ হাত পর পর স্পিড ব্রেকার। তাতেই হয়তো কয়েক কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কাঁচামাটি ধসে যাচ্ছে এর মধ্যেই রাস্তা এবড়ো থেবড়ো হয়ে গেছে। মাটি ধরে রাখতে দুই পাশে ইটের দেয়াল হচ্ছে যা এই বন্যা পর্যন্ত টিকবে কিনা সন্দেহ। রাস্তার পাশে ইটের গাঁথুনি তেমন কার্যকর নয়, ভাইব্রেশনে গাঁথুনি খুলে যায়—এটা সবার জানা। তারপরও ইঞ্জিনিয়াররা কেন ইটের গাঁথুনির প্রাক্কলন করেন সেটা তারাই জানেন। কিন্তু ব্যাপারটা বিজ্ঞানসম্মত নয়। কথাটা মাননীয় মন্ত্রীর উদ্দেশে এ জন্য বলছি, মন্ত্রীরা জাতির, রাষ্ট্রের জিম্মাদার। এভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় হলে নৈতিকতায় বাধে। সরকার আওয়ামী লীগের, ঠিকাদার আওয়ামী লীগের, ইঞ্জিনিয়ারও যদি আওয়ামী লীগের হয় তাহলে আর আত্মসাৎ করার জন্য রাস্তায় টাকা ঢালার মানে কী? কাগজপত্রে প্রজেক্ট দেখিয়ে কাজকর্ম ছাড়া তুলে নিলেই হয়। লোকের চোখে পড়বে না, আলোচনাও হবে না। সেটাই তো ভালো। মাননীয় সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মেহেরবানী করে কালামপুর থেকে মির্জাপুর তার উদ্বোধন করা রাস্তাটি যদি এখনই একবার দেখে আসতেন বড় ভালো হতো।

বৃহস্পতিবার গিয়েছিলাম বীর মুক্তিযোদ্ধা হামিদুল হক বীরপ্রতীকের কুলখানিতে। কালিহাতী-বহেরাতৈল হয়ে কচুয়ায় তার বাড়ি। বহেরাতৈল মুক্তিযুদ্ধের এক অবিস্মরণীয় জায়গা। যেখানে স্বাধীনতার জন্যে শপথ নেওয়া হয়েছিল। রতনগঞ্জ থেকে বহেরাতৈল বেশ কয়েক কোটি টাকা খরচে একটি নতুন রাস্তা করা হয়েছে। দুই মাসও হয়নি এখনই সে রাস্তায় চলা যায় না। ছোটখাটো পুরনো কালভার্ট তো ভাঙছেই, অন্যদিকে রাস্তার ছালবাকল সব উঠে যাচ্ছে। বহেরাতৈল রাস্তা নিয়ে কয়েক মাস আগে এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার, সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার এমনকি চিফ ইঞ্জিনিয়ার পর্যন্ত জানানো হয়েছিল কোনো ফল হয়নি। তাই মাননীয় মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে বিনীতভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি আর কোথাও সশরীরে গিয়ে দেখতে না পারেন, না গেলেন। দয়া করে কালামপুর থেকে মির্জাপুর এবং কালিহাতী রতনগঞ্জ থেকে বহেরাতৈল একটু যান দেখুন বিচার করুন।

বুধবার গিয়েছিলাম জেনারেল মাহবুবুর রহমানের মা লতিফা বেগমকে দেখতে। আমার মা লতিফা সিদ্দিকী, জেনারেলের মা লতিফা বেগম। মনে হয় এটাই শেষ দেখা। ৫-৬ বছর আগে তার গ্রামের বাড়ি বিরলের জগত্পুরে গিয়েছিলাম। তখন মায়ের মতো মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে দোয়া করছিলেন। হাঁটা চলাও করছিলেন মার মতো। তার এবং আমার মায়ের বয়স ছিল একই সমান। মাকে হারিয়েছি ১৪ বছর আগে। কিন্তু তিনি এখনো বেঁচে আছেন। হঠাৎই কেন যেন মনে হয়েছিল একবার দেখে আসি। টাঙ্গাইল থেকে পৌনে ৩০০ কিলোমিটার জেনারেল মাহবুবের বাড়ি। বগুড়ার অংশ ছাড়া রাস্তাঘাট মোটামুটি ভালো। কিন্তু গাড়ি চালাবার জো নেই। ভ্যান-রিকশা-ট্রাক্টর-সিএনজি-ব্যাটারি, বাস-ট্রাক তো আছেই। ঘণ্টায় ৪০-৫০ কিলোমিটারের বেশি পাড়ি দেওয়া যায় না। রাস্তায় কোথাও নিয়ন্ত্রণ নেই। যে যেভাবে পারে চলে। ট্রাফিক আছে হাত পেতে। গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে, রাস্তাঘাটে শৃঙ্খলা রাখতে নয়। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘রাস্তাঘাটের অবস্থা সব থেকে খারাপ।’ সার্বিক দৃষ্টিতে বিচার করলে কথাটা মোটেই মিথ্যা নয়। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় তার কাছে থাকা উচিত ছিল না? এটা ২৪ ঘণ্টার মন্ত্রণালয়। রাস্তাঘাটের দুরবস্থার জন্যে দ্বিগুণ জ্বালানি পুড়ছে। পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে তার চাইতে বেশি। এসব নিয়ে যদি কিছুটা যত্নবান হওয়া যেত তাহলে মানুষের জীবন বেঁচে যেত। বায়ু দূষণের চাইতে ক্ষতিকর আর কিছু নেই? অথচ আমরা রাতদিন বায়ু দূষণ করে চলেছি। দূষণ মুক্ত বা কমিয়ে আনার কোনো চেষ্টা করছি না।

ড. কামাল হোসেনকে নিয়ে শুরু করেছিলাম। ড. কামাল হোসেন একজন প্রবীণ মানুষ, ভাগ্যবানও বটে। সারা দুনিয়াজোড়া তার নাম। জীবনে কোনোদিন আমাদের মতো রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক দুরবস্থায় পড়েননি। কষ্ট যে করেননি তা বলব না। কম বেশি সবার কষ্ট থাকে। তারও হয়তো আছে। কিন্তু তারপরও বলছি, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় তিনি একজন ভাগ্যবান মানুষ। শুক্রবার ছিল তার ৮১তম জন্মদিন। ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চে কোনো জৌলুস ছিল না। যারা আয়োজন করেছিলেন তাদের আন্তরিকতা কতটা ছিল তা তারা জানেন। কিন্তু বাইরে একটা দায়সাড়া ভাব দেখা গেছে। আমরা কজন বক্তৃতার মঞ্চে ছিলাম আর কিছু মানুষ সামনে। কেউ এলেন কেউ গেলেন। নাড়ির টান খুব একটা দেখা যায়নি। তবু একটা অনুষ্ঠান হয়েছে সেটাই-বা কম কী। ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুর গভীর সান্নিধ্য পেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন পাকিস্তানে। কেউ বলেন কারাগারে, কেউ বলেন দিব্যি কোর্ট কাচারিতে ঘুরে বেরিয়েছেন, সে যাই হোক। অনেকে তার শততম জন্মদিন পালন করতে চেয়েছেন। আমারও তার শতবর্ষ কেন আরও বেশি জন্মদিন পালনে আপত্তি নেই। কিন্তু আমি চাই যতদিন সুস্বাস্থ্যে সচল থাকেন ততদিনই হাসি-খুশি আনন্দের মাঝে বেঁচে থাকুন।

সেদিন দিনাজপুর সার্কিট হাউসে বলেছিলাম, যদি আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়, বিচার ব্যবস্থা প্রভাবমুক্ত হয় তাহলে ভাবীকালে হয়তো খালেদা জিয়ার মামলার মাননীয় বিচারকও অভিযুক্ত হতে পারেন। কারণ যে ঘটনার জন্য শাস্তি দিয়েছেন সে ঘটনাই এখনো ঘটেনি। পদ্মা সেতু নিয়েও ঘটনার আগেই মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এখানেও ব্যাপারটা সেই একই রকম হয়েছে। অন্যদিকে কোটাবিরোধী আন্দোলন নিয়ে পবিত্র সংসদে মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বিরাগের পরিচয় দিয়ে শপথ ভঙ্গ করেছেন। বেগম মতিয়া চৌধুরী আগাগোড়াই মানুষের মধ্যে পড়েন না। তার মধ্যে মানবিক গুণাগুণ ও মনুষ্যত্ব কাজ করে না। যখন যার তখন তার। যাদের সঙ্গে রাজনীতি করতেন তাদের সঙ্গেই বিরোধ করে একের পর এক ঠিকানা বদল করেছেন। সব সময় প্রাণপ্রিয় বন্ধু বা সহকর্মীদের বিরোধিতা করতে গিয়ে যেসব জঘন্য ভাষা ব্যবহার করেছেন যা ভালো মানুষরা স্বাভাবিক ভাবে মুখে আনতেও লজ্জাবোধ করেন। অথচ সব সময় তিনি অবলীলায় তা প্রয়োগ করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে কি জঘন্য ভাষায়ই না গালাগাল করেছেন। তারপরও তিনি আজ মন্ত্রী। এটা তার কপাল। এটাকে দক্ষতা যোগ্যতা বলে না। কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের সংসদে ওভাবে ‘রাজাকারের বাচ্চারা’ বলে সারা জাতিকে গালি দিয়েছেন। ছেলেমেয়েরা এর প্রতিবাদে রাস্তায় বেরিয়ে তবু কিছুটা তাদের ইজ্জত রক্ষা করেছে। কিন্তু আমরা কী করেছি? আমরা আমাদের ইজ্জত রক্ষা করতে পারিনি অথবা করিনি কিংবা মতিয়া চৌধুরীর কথায় আমাদের সম্মান আমাদের ইজ্জত যেতে পারে সেটাই ভাবী না। আমাদের অনুভূতি অনেকটাই পরনির্ভর ভোঁতা হয়ে গেছে। গণতান্ত্রিক দেশে সংবিধানের শর্ত অনুসারে শপথ নেওয়ার সময় অনুরাগ বিরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো মন্ত্রী কাজ করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। এর চাইতে বড় বিরাগ কী হতে পারে? তাই মতিয়া চৌধুরীর বরখাস্তের দাবি করেছি। জানি না, ভগ্নি মতিয়া চৌধুরীকে বরখাস্তের ক্ষমতা রাখেন কিনা। যদি রাখেন তাহলে তাকে অনতিবিলম্বে বরখাস্ত করুন। তা না হলে এই ঔদ্ধত্যের অনেকটাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ওপরে গিয়ে পড়ে। দেখাই যাক কতটা কী হয়।

তবে এ কথা সত্য, যুক্তিসঙ্গত কোটা যেমন থাকা উচিত ঠিক তেমনি কোটাবিরোধী আন্দোলন যারা করেছে বা করছে তারা সবাই রাজাকারের সন্তান নয়। তারা ভালো মানুষের সন্তান, স্বাধীনতার সন্তান, মুক্তিযুদ্ধের সন্তান। রাজাকারের আত্মীয়স্বজন, নাতি-নাতকুর ২-৪ জন থাকলেও তারা বাংলাদেশে জন্মেছে, বাংলাদেশের আলো-বাতাসে বড় হচ্ছে। তাদের এই আলো বাতাস থেকে বঞ্চিত করা যাবে না, কোনো উপায়ও নেই। তাই আন্দোলনটিকে হেলাফেলা না করে আন্দোলনকারী নিরীহ নেতাদের জোরজুলুম করে ভয় পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করে সমস্যার সমাধান করা উচিত। যে কোনো অসুখ জিইয়ে রাখলে তা বড় এবং কঠিন হয়। সমস্যা জিইয়ে রাখলে সেটা বৃদ্ধি ছাড়া কমে না। তাই এ ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। বেঁচে থাকলে বা জীবন থাকলে জীবনের অবশ্যম্ভাবী যেসব আনন্দ-বেদনা-দুঃখ-কষ্ট ছায়াসঙ্গীর মতো থাকে সেসব কোনো ভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার পথ নেই। তাই সবকিছু সরকারকে বিব্রত করার জন্যে করা হচ্ছে এসব না ভেবে প্রয়োজনের তাগিদেই হয় বা হতে পারে এমনটা ভাবাই ভালো। চিলে কান নিয়েছে কানে হাত না দিয়ে চিলের পেছনে ছোটা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। যারা অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজেরা ভালো থাকতে চান বা নিরাপদ থাকতে চান তারা ঠিক নন। এই কদিন আগে রংপুরের সরকারি উকিল রথীশ চন্দ্র ভৌমিক নিহত হলে জঙ্গিরা করেছে বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু লাশটি বেরিয়ে পড়ায় সেটা পারিবারিক কলহ হিসেবে বেরিয়ে এসেছে। যদি এই পারিবারিক হত্যার ঘটনা প্রথম প্রথম না বেরিয়ে জঙ্গিদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হতো এবং অনেক দূর অগ্রসর হওয়ার পর বাস্তব সত্য উদঘাটিত হতো তখন প্রশাসন পুলিশ কী জবাব দিত। এক্ষেত্রেও অনেকটাই তাই। ছেলেমেয়েগুলো আন্দোলন করেছে তাদের আন্দোলনের শুভ শক্তি দেশের কাজে লাগাতে পারলে সেটাই ভালো হতো। তা না করে তাদের চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যাওয়া কোনো সমস্যার সমাধান তো নয়ই বরং আইয়ুব-ইয়াহিয়া-এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের রূপ নিতে পারে। তাই সরকারের প্রতি অনুরোধ অন্ধকার ঘরে সাপ খুঁজতে না গিয়ে একটু চেষ্টা করে আলো জ্বালিয়ে দেখে নেওয়া ভালো নয় কি? আশা করি, সরকারের এবং সংশ্লিষ্ট সবার শুভ বুদ্ধির উদয় হবে।

লেখক : রাজনীতিক।

www.ksjleague.com