পার্বত্যাঞ্চল উৎসবমুখর

Print Friendly, PDF & Email

খাগড়াছড়ি : পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী উৎসব বৈসাবি। বাংলা পঞ্জিকায় একে চৈত্রসংক্রান্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পুরনো বছরকে বিদায় এবং নববর্ষকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব পাহাড়ি জাতিসত্তাসমূহের পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের হাজার বছরের ঐতিহ্য বৈসাবি। একে ঘিরে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে গোটা পার্বত্যাঞ্চল।

চৈত্রের শেষ ও তার আগের দিন এবং নববর্ষের দিন নিয়ে মোট তিন দিন পাহাড়িদের ঘরে ঘরে এ উৎসব চলে। বৈসাবিকে কেন্দ্র করে ফুটে ওঠে এ জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যমণ্ডিত সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিভিন্ন ভাষায় এ উৎসবের ধরন ভিন্ন ভিন্ন হলেও লক্ষ্য ও রীতি প্রায় এক। বৈসাবিতে এ অঞ্চলের তেরোটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ভেদাভেদ ভুলে সম্প্রীতি ও ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। চাকমা সম্প্রদায় এ উৎসবকে বলে ‘বিজু’, ত্রিপুরারা বলে ‘বৈসু’ আর মারমারা অভিহিত করে ‘সাংগ্রাই’ নামে। ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু মিলে সংক্ষেপে উৎসবটির নামকরণ করা হয়েছে বৈসাবি।

সামাজিক প্রেক্ষিতে বর্ষবরণ উৎসব পার্বত্য অঞ্চলে উদযাপিত হলেও বৈসাবির মধ্যে এক আলাদা আবেদন রয়েছে। ধর্মীয় কিছু প্রভাব ভিন্ন ভিন্নভাবে এসব পালাপার্বণে লক্ষ্য করা গেলেও এটা সামাজিক উৎসব হিসেবেই অধিক সমাদৃত।

চাকমাদের মতে, বিজু সবার মনে বয়ে আনে অপূর্ব সম্প্রীতি। এ দিনকে বলা হয় ‘দোর খেলা’ দিন। শুধু এই দিনটি নয়, আগে ও পরের দুটি দিনও পবিত্র এই সামাজিক উৎসবের সঙ্গে যুক্ত। ‘বিজু’র আগের দিনকে বলে ‘ফুল বিজু’। বিজুর দিনটিকে ‘মূল বিজু’ এবং পরের দিনকে বলে ‘গয্যা পয্যা দিন’ অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ।

ফুল বিজু : চৈত্র মাস শেষের আগের দিন এটি পালন করা হয়। এদিন ছোট শিশুরা খুব ভোরে হইচই করে ফুল তুলতে যায়। এ ছাড়া সারা দিন খেলা ও নাচগান হয়।

মূল বিজু : ৩০ চৈত্র এই উৎসবটি পালিত হয়। চৈত্রসংক্রান্তির এ দিনটিকে পার্বত্যাঞ্চলের চাকমা সম্প্রদায় মূল বিজু বলে থাকে। এই দিনে পাহাড়িদের ঘরে ঘরে বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করা হয়। যে খাবারটি প্রায় ঘরেই তৈরি করা হয় তা হলো অতি পরিচিত ‘পাচন’। বিশটির বেশি তরকারি দিয়ে পাচন রান্না করা হয়।

গয্যা পয্যা দিন : এ দিনটি হলো মূল বিজুর পরের দিন। অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে এটি পালিত হয়। এই দিনে ভালো ভালো খাবার তৈরি করে বয়োজ্যেষ্ঠদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো হয়- যাতে গুরুজনদের আশীর্বাদ পেয়ে সুখী, সুন্দর ও সমৃদ্ধিশালী জীবনযাপন করা যায়।
মারমা সম্প্রদায়ও বৈসাবি উৎসবকে তিনভাগে পালন করে। যেমন প্যেইং ছায়াই, আক্যা বা আক্যাই এবং আতাদা বা আপ্যাইং।

প্যেইং ছায়াই : মারমারা চাকমাদের মতো ফুল বিজুর মতোই দিনটি পালন করে। চাকমা সম্প্রদায়ের মতো মারমারাও এই দিনে গৃহপালিত পশু গরু-মহিষের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দেয়। দুপুরে গ্রামের পুরুষ-মহিলা সবাই মিলে বনে যায় নানান ধরনের তরিতরকারি, ফলমূল সংগ্রহ করতে। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে সাংগ্রাইকে আনন্দবহ করতে পরিচ্ছন্ন ও নতুন পোশাক পরিধান করে।

আক্যা : মূল সাংগ্রাইকে মারমা সম্প্রদায় আক্যা বা আক্যাই বলে। এদিন সকালে তরুণ-তরুণীরা পরস্পরকে পানি ছিটিয়ে আনন্দ উপভোগ করে এবং গ্রামে ঘুরে বুড়াবুড়ি এবং ক্যাং অর্থাৎ বৌদ্ধমন্দিরের উপাসককে গায়ে সাবান মাখিয়ে স্নান করিয়ে দেয়।

আপ্যাইং বা আতাদা : এদিন মারমাদের ঘরে ঘরে সাধ্যমতো বিভিন্ন ধরনের পিঠা, বিরিয়ানি, পোলাও আর অতি পরিচিত পাচন রান্না করা হয়। এই দিনে হিংসা-বিদ্বেষ-ক্লেশ, ধনী-গরিব, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলে দলে দলে একে অপরের বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। এই দিনে খাওয়ার চেয়ে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দটাই বেশি হয়ে থাকে।

ত্রিপুরারাও বৈসু উৎসব পালন করে তিনটি পর্যায়ে। হার বৈসু, বৈসুমা এবং বিসি কাতাল নামে।

হার বৈসু : চৈত্রসংক্রান্তির আগের দিনকে বলা হয় হার বৈসু। চাকমাদের ফুল বিজুর মতোই এ দিনটি পালন করা হয়। তবে ত্রিপুরা সম্প্রদায় এই দিন থেকে কীর্তন এবং কয়েকদিন আগে থেকে ‘গারয়া নাচ’ শুরু করে।

বৈসুমা : চৈত্রসংক্রান্তির দিনকে বলা হয় বৈসুমা। এদিন সকালে ত্রিপুরা সম্প্রদায় ঘুম থেকে উঠেই ‘কুচাই পানির’ ফোঁটা ফোঁটা জলে নিজেদের সিক্ত করে। অর্থাৎ সোনা, রুপা ও তুলসীপাতা মিশ্রিত পানি ছিটিয়ে শুদ্ধ করে নেয়। মূল বিজুর মতোই দিনটি পালন করা হয়।

বিসি কাতাল : পহেলা বৈশাখকে বিসি কাতাল বলা হয়। এই দিনে ত্রিপুরা সম্প্রদায় গুরুজনদের পায়ে ফুল দিয়ে প্রণাম করে গোসল করায় এবং তাদের আমন্ত্রণ করে খাওয়ায়। এই দিনেও ত্রিপুরারা বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায়।

বৈসাবিকে ঘিরে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠছে পার্বত্য এলাকার প্রতিটি জনপদ। এ উপলক্ষে খাগড়াছড়িতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইনস্টিটিউট ৮ থেকে ১০ এপ্রিল তিন দিনব্যাপী বৈসাবি মেলা, নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

এ ছাড়া পার্বত্য জেলা পরিষদ আজ বুধবার দিনব্যাপী উৎসবের আয়োজন করেছে। সকালে এক বর্ণাঢ্য র‌্যালির মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এই র‌্যালির উদ্বোধন করবেন।