ভাড়া ‘বাণিজ্য’ নিয়ন্ত্রণ করবে কে?

Print Friendly, PDF & Email

বাণিজ্য তো বহুবিধ হয়। তবে চলমান এইচএসসি পরীক্ষার পরের প্রস্তুতি হিসেবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শুরু হবে ভিন্ন এক বাণিজ্য। এ বাণিজ্যের বণিক শ্রেণী কিছুসংখ্যক বাড়িওয়ালা এবং সর্বোপরি হোস্টেল মালিক। যারা এইচএসসি পরীক্ষার শিক্ষার্থীদের ঘিরে এরই মধ্যে এক ধরনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। প্রস্তুতির প্রথম পর্যায় হিসেবে অনেকেই ভাড়াটিয়াকে বাড়ি ছেড়ে দেয়ার নোটিস দিয়েছেন। আর বিভিন্ন হোস্টেলগুলোয় এখন সিট ভাড়া নিতে গেলে শুরুতেই বলে দিচ্ছে, কোচিংয়ের শিক্ষার্থী ছাড়া এখন তারা অন্যদের (চাকরিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া) সিট ভাড়া দিচ্ছেন না।

২৩ মে এইচএসসি পরীক্ষার শেষে জুন-জুলাই থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে শত শত শিক্ষার্থী পাড়ি জমাবে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে; যেখানে শিক্ষার সুযোগ, কোচিংয়ে ভর্তির সুযোগ অনেক বেশি। একটি পরীক্ষার চাপমুক্ত হতে না হতেই তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার অনিবার্য এক চাপ নিতে হবে। এ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তারা খানিকটা ভাগ্যবান, যারা শহরে মা-বাবা পরিবারের সঙ্গে থাকেন। কিন্তু যারা শহর থেকে দূরে গ্রাম বা মফস্বল এলাকার বাসিন্দা, তাদের অবস্থাটা ইঁদুর কপালে। এসব শিক্ষার্থীর মা-বাবার অবস্থাটাও নেহাত সঙ্গিন। ছেলেমেয়ের সঙ্গে তাদেরও যুদ্ধে টিকে থাকার এক নিদারুণ অভিযানে নামতে হয়। এখানেও শ্রেণী বিভাজন রয়েছে। একটু বেশি সচ্ছল পরিবারের ছেলেমেয়েরা তাদের মা-বাবার সাহচার্য পাবেন। ঢাকার মোটামুটি গোছের একটি বাসা নিয়ে সন্তানের সঙ্গে মা, বোন কিংবা কোনো অভিভাবক আসবেন। কিন্তু নিম্নবিত্ত ও হিসাব করে চলতে হয়, এমন পরিবারের ছেলেমেয়েদের ওই হোস্টেল কিংবা মেস ছাড়া গতি নেই।

হোস্টেলগুলোর বাইরের চেহারা যতই পরিপাটি হোক না কেন ভেতরে ভিন্ন চিত্র। সাধারণত ভবিষ্যতে হোস্টেল হিসেবে ব্যবহার করা হবে, এমন পরিকল্পনা করে বিল্ডিংগুলোর নকশা করা হয় না। ডেভেলপার ফ্ল্যাট বাড়ি হিসেবে তৈরি করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন কাজে তা ব্যবহার করা হয় (রাজধানীর ফার্মগেট, মণিপুরীপাড়া, গ্রীন রোড়, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর এলাকার বেশ কয়েকটি হোস্টেলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বলা)। তাই পরবর্তীতে যারা এ ভবনগুলোকে হোস্টেলের মতো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের জন্য ভাড়া নেন (কিংবা অনেকেই হয়তো ভবনগুলোর মালিক) তিন বেড রুম ও একটি ড্রইং ও খাবার রুমের ইউনিটকে হার্ডবোর্ডের মাধ্যমে ব্যবচ্ছেদ করে মোটামুটি ২০-২২ জনের থাকার ব্যবস্থা করেন। সিঙ্গেল বা একক রুমের আসবাব বলতে আড়াই হাত চওড়া ও আট-দশ হাত লম্বা কাঠের চৌকি ও কোনোমতে বই-খাতা রাখা যায় কিন্তু পড়তে বসা যায় না এমন আকারের একটি টেবিল। আর মাথার কাছে ছোট টেবিল ফ্যান ঝুলিয়ে রাখা বা দেয়ালে লাগানো। প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের কণামাত্র প্রবেশের বন্দোবস্ত নেই এসব জায়গায়। বিদ্যুৎ চলে গেলে আবছায়া অন্ধকারই সই। আর এ ধরনের এক রুমের সিট ভাড়ার পরিমাণ ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা। ক্ষেত্র বিশেষে ভিআইপি ট্যাগ লাগানো হোস্টেলগুলোয় ভাড়া বাড়ানো হয় আরো একধাপ উপরে গিয়ে। এছাড়া আছে দুই বেড, তিন বেড, চার-পাঁচ বা ছয় বেডের কক্ষ। যেখানে দোতলা খাটের উপর-নিচে থাকা যায়। এর কোনোটির ভাড়া ৩ হাজারের নিচে নয়। অনেক হোস্টেলে আবার আরো বেশি বাণিজ্যিকীকরণের সূত্র ধরে কোনো রান্নাঘরের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। যদিও ভবন নির্মাণের সময় ডেভেলপাররা প্রতিটি ফ্ল্যাটে স্বাভাবিকভাবেই একটি করে রান্নাঘর রেখেছেন। কিন্তু হোস্টেল কর্তৃপক্ষের হাতে পড়ে তা নেহাতই একটি সিঙ্গেল রুমের পরিণতি পেয়েছে। অবাক করা ব্যাপার, রান্নার চুলা, থালাবাটি রাখা ও ধোয়ার জায়গাটি বই-খাতা রাখার কাজে লাগাছে। আর ছোট যে পরিসরে দাঁড়িয়ে রান্না করা যেত, সেখানে দিব্যি একটি খাট (পড়ুন চৌকি) রেখে সিঙ্গেল রুম হিসেবে ৬-৮ হাজার টাকা ভাড়া ধার্য করা হয়েছে। প্রথম শহরে আসা ছেলে কিংবা মেয়েটিকে নিতান্তই উপায়-অন্তহীন হয়ে এসব জায়গাতেই মাথাগুঁজতে হয়। থাকার সঙ্গে খাবারের ব্যবস্থা হোস্টেল থেকেই হয়। এক্ষেত্রেও খাবারের গুণগতমান নিয়ে হাজারখানেক প্রশ্ন রয়েছে।

দুই.

একটি ফ্যামেলি বাসা ভাড়া নিতে গেলে ভাড়ার সঙ্গে আরো যে বিষয়টি আসে, তা হলো অগ্রিম জামানত। চলতি মাসের বাড়ি ভাড়ার সঙ্গে সমপরিমাণ এক মাসের অগ্রিম টাকা দিয়ে বাসাবাড়িতে ভাড়াটিয়াদের উঠতে হয়, যা আইন সম্মত। ধরা যাক, দুটি বেড ও একটি ছোট ড্রইংরুমের বাসার ভাড়া ২০-২২ হাজার টাকা। এ ধরনের একটি বাসা ভাড়া নিতে দু-তিন মাসের অগ্রিম ভাড়া দেয়ার আইনবহির্ভূত রেওয়াজ চলে আসছে। আইনে কেবল এক মাসের অগ্রিম ভাড়া দেয়ার বিষয়ে বলা আছে। যদি একটি ফ্ল্যাটের ভাড়া মাসে ৫০ হাজার টাকা হয়, সেক্ষেত্রে অনেক এলাকায় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা বাড়ির মালিকের কাছে জামানত রেখে তবেই বাসা ভাড়া নেয়া যায়। উত্তরা, ধানমন্ডি, মহাখালী, মিরপুর— এলাকাভেদে অগ্রিম জামানতের এ অর্থ কমবেশি। এরপর তো তিন-ছয় মাস পরপর বাসা ভাড়া বাড়ানোর ঐতিহ্য রয়েছে। চাল-ডাল-তেল-নুনের দাম বাড়লে ভাড়া বাড়বে— এটা অলিখিত সত্য।

সম্প্রতি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) আয়োজিত ‘নগর পরিস্থিতি ২০১৭: ঢাকা মহানগরীর আবাসন’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকায় বসবাসরত ভাড়াটিয়াদের ৮২ শতাংশের আয়ের এক-তৃতীয়াংশ বাড়ি ভাড়া বাবদ ব্যয় হয়। এটাই একমাত্র শঙ্কাজনক তথ্য নয়, আরো আশঙ্কাজনক তথ্যটি হচ্ছে, ৪৪ শতাংশ মানুষকে নিজেদের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে বাড়ি ভাড়া দিতে হয়।

বসবাস ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার দিক দিয়ে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ শহরগুলোর একটি। জীবনযাত্রার মানের দিক দিয়েও এর অবস্থান নিচের সারিতে। অথচ আমাদের তথাকথিত উন্নয়নের সূত্র ধরে ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার অন্য যেকোনো শহরের চেয়ে বেশি। আর এ শহরে একটু আরামে মাথাগুঁজে থাকতে হলে ভাড়াটিয়াদের আয়ের এক-তৃতীয়াংশ অর্থই দিয়ে দিতে হয় বাড়ির মালিকদের। তাতেও স্বস্তি কিংবা শান্তি কোনোটিই নেই। বাড়ির মালিক চাইলে এক মাসের নোটিসে বাসা বদল করতে বলতে পারেন। মালিকপক্ষ চাইলেই নানা অজুহাতে বাসা ভাড়া বাড়াতে পারেন। বাড়ির মালিকদের নানা অজুহাতের আশঙ্কায় ভাড়াটিয়ার স্বস্তি, শান্তি দুটোরই রুগ্ণ দশা।

তিন.

বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ নামে একটি আইন আছে। সেখানে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধিসংক্রান্ত বিধি-নিষেধে বলা হয়েছে, ‘কোনো বাড়ির ভাড়া মানসম্মত ভাড়ার অধিক বৃদ্ধি করা হইলে উক্ত অধিক ভাড়া, কোন চুক্তিতে ভিন্নরূপ কিছু থাকা সত্ত্বেও, আদায়যোগ্য হবে না।’ যদিও ‘মানসম্মত ভাড়া’ বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি। পুরনো এ কাঁসুন্দি ঘাঁটতে গিয়ে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে এ আইনটিতে একটি বাড়ির নির্মাণমূল্য ও বাজারমূল্যের সঙ্গে বর্তমানের নির্মাণ ও বাজারমূল্যের যোজন যোজন ফারাক। ঘনবসতিপূর্ণ এ নগরে আকাশছোঁয়া ফ্ল্যাটমূল্যের সঙ্গে ১৯৯১ সালের নির্ধারিত মানসম্মত(!) ভাড়ার পরিমাণটি মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আইনের ১৫(১) ধারায় রয়েছে, ‘ভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ সংশ্লিষ্ট বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি হবে না।’ এ হিসাবে ধরা যাক, একটি ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজার মূল্য ১ কোটি টাকা। তাহলে ১৫ শতাংশ হিসেবে বছরে আসে ১৫ লাখ টাকা। প্রতি মাসে এর ভাড়া বাবদ প্রদান করতে হয় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা! এমন একটি ফ্ল্যাটে থাকা বাবদ তিন বছরে একজন ভাড়াটিয়াকে ৪৫ লাখ এবং ছয় বছরে ৯০ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়। অথচ ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়ে সাত বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এর বাজারমূল্যের সমপরিমাণ টাকা মালিকপক্ষ উঠিয়ে নিতে পারেন! প্রশ্ন আসছে, বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় ওই আইনটি কতটা সময়োপযোগী?

আইনে যেমন উল্লেখ আছে, ‘বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রকের লিখিত আদেশ ছাড়া অন্য কোনোভাবেই বাড়ির মালিক তার ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে অগ্রিম এক মাসের বাড়ি ভাড়ার অধিক কোনো প্রকার ভাড়া, জামানত, প্রিমিয়াম বা সেলামি গ্রহণ করতে পারবেন না। গ্রহণ করলে দণ্ডবিধি ২৩ ধারা মোতাবেক তিনি দণ্ডিত হবেন।’ কিন্তু যারা নিয়মিত ভাড়া বাড়িতে থাকেন তারা জানেন, অনেকেই আছেন. যারা ‘এক মাসের ভাড়ার অধিক’ অর্থ অগ্রিম দিয়েই তবে বাসা ভাড়া পেয়েছেন। আর বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রক শব্দটির সঙ্গে ভাড়াটিয়ারা আদৌ কতটা পরিচিত, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। আইনে যদিও বাড়ি ভাড়া পরিশোধের রসিদটি বুঝে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিক বা তার প্রতিনিধি আইন অনুযায়ী এ রসিদ দিতে বাধ্য। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাড়িওয়ালারা ভাড়া পরিশোধের রসিদ দেন না।

আইনে সুস্পষ্টভাবে বসবাসের উপযোগী বাড়ি সম্পর্কে বলা হয়েছে। যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, বাড়ির মালিক ইচ্ছা করলেই ভাড়াটিয়াকে বসবাসের অনুপযোগী বা অযোগ্য অবস্থায় রাখতে পারেন না। কিন্তু রাজধানীবাসীর ভাড়াটিয়াদের দুর্ভাগ্য, এ নগরে বাসা ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। থাকলেও তারা কাগজে-কলমে; কাজের ক্ষেত্রে নয়। বড় সমস্যাটি হলো, ঢাকার প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাসায় থাকলেও আইনটি সম্পর্কে বেশির ভাগই অবহিত নন। সব মিলিয়ে পরীক্ষা শেষে কোচিংয়ের উদ্দেশ্যে ঢাকায় পাড়ি জমানো শিক্ষার্থীরা কিংবা শহরের ভাড়া বাড়িতে থাকা অসহায় ভাড়াটিয়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ যথারীতি উদ্বেগহীন। অন্য অনেক আপসের মতো এ পরিস্থিতিকে নিয়তি বলেই ধরে নেয়া হয়েছে। অথচ ঢাকাজুড়ে শিক্ষার্থী-কর্মজীবী-সাধারণ হোস্টেলগুলোর একটা তালিকা থাকা উচিত। যেখানে নিয়মিত একটি পরিদর্শন কমিটি গিয়ে ন্যূনতম পরিবেশ, খাবারের খাদ্যমান পরীক্ষা এবং উপযুক্ত ভাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করবে। হোস্টেল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা হচ্ছে কিনা, তা তদারক করবে। দ্বিতীয়ত. বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনে উল্লিখিত ‘মানসম্মত ভাড়া’ নির্ধারণ করতে বাড়ির বাজারমূল্য ধরে হিসাব করার পদ্ধতির পরিবর্তন আনতে হবে। তাছাড়া এলাকাভেদে ঢাকা মহানগরীকে ১০টি রাজস্ব অঞ্চলে ভাগ করে বাড়ি ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়ার মধ্যেই ঢাকা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। (বণিক বার্তা)

লেখক : সাংবাদিক